Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ , সময়- ২:০৬ পূর্বাহ্ন
Total Visitor: Projonmo Kantho Media Ltd.
শিরোনাম
বিএনপির নির্বাচনে আসার পিছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে : মেনন  ডিসেম্বরের পরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অসম্ভব নির্বাচন বানচাল করার জন্য বিনা উস্কানিতে এই নাশকতা : ওবায়দুল কাদের কী ঘটেছে রাজধানী ঢাকার নয়াপল্টনে ? দেশকে এগিয়ে নিতে বিশ্বাসঘাতকদের প্রয়োজন নেই : শেখ হাসিনা রাজধানীর নয়াপল্টনে পুলিশ-বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হেভিওয়েট প্রার্থীরা কে লড়বেন কার বিপক্ষে ভোটের মাঠে  নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে হয়রানি ও গায়েবি মামলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে : মির্জা ফখরুল সপ্তাহব্যাপী জাতীয় আয়কর মেলার দ্বিতীয় দিন শেষ হলো সপ্তাহব্যাপী জাতীয় আয়কর মেলার দ্বিতীয় দিন শেষ হলো

কবির পুরস্কার


চন্দন চক্রবর্তী

আপডেট সময়: ৩১ অক্টোবর ২০১৭ ২:১৮ এএম:
কবির পুরস্কার

‘কি হল! সকালবেলাতেই বিছানায় বসে কবিতার জাবর কাটছ!’ দুখিরাম তখন কবিতার ডায়েরিটা খুলে সবে বসেছে। গতকাল রাতে একটু বৈশাখী ঝড়, টুপুর টুপুর বৃষ্টি হয়েছে। সকালের মেঘেও নরম খবর। দুখিরামের স্ত্রী সতী রকম সকম দেখে কথাটা বলে দাঁড়ায়। গলায় শ্লেষ এনে বলে!

‘কি ছাই পাশ কবিতা লেখো? কোনও দিন তো দেখলাম না একটা মিষ্টির প্যাকেট, মেমেন্টো নিয়ে ঘরে ঢুকেছ? বা দশটা টাকা হাতে দিয়ে বলেছ ‘এই দেখ, কবিতা লিখে পেয়েছি।’ ওই তো পাড়ার পতিতপাবনবাবু— কত বড় কবি, লেখক। ওর বউ প্রায়ই শুকনো ফুলের তোড়া আর মিষ্টির খালি প্যাকেট ময়লার গাড়িতে ফেলে। বলে, ‘বলিস না কবি হওয়ার এই জ্বালা! রোজ অনুষ্ঠান। রোজ গুচ্ছ ফল মিষ্টি মেমেন্টো। নেহাৎ ব্লাড সুগার নেই, আমাদের। তখনই বলে ছিল, তোমার দুখিবাবুও তো লেখে শুনেছি...’ কথা শেষ করতে না দিয়ে একদিন আমিও বলেছিলাম ‘ও রকম দুখি দুখি কবিতা কেউ শুনতে চায় না গো’।
দুখিরাম দলুই ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, ‘আজ কলেজের অডিটোরিয়ামে ‘সংরাব’ পত্রিকার বার্ষিক অনুষ্ঠান আছে। ওখানে আমার কবিতা পাঠ আছে।’ সতী বলল, ‘বুঝলাম। সে তো সন্ধেতে হবে নিশ্চয়ই, তা এখন থেকে কি করছ তুমি? একটু দোকানে যেতে হবে। চাল বাড়ন্ত। অফিসের ভাত দিতে পারব না।’
—‘আজ আর অফিস যাব না, সকালের দিকে কলেজে গিয়ে একটু তদারকি করতে হবে।’
অফিস বলতে একটা রিয়েল এস্টেট কোম্পানির কেরানি। কেরানি কেন? পিওনগিরি, সুপারভাইজারি সব কাজ করতে হয়। টালিগঞ্জে ওর অফিস। দশটায় হাজিরা।

ওর কবি হতে চাওয়ার ব্যাপারটা বড় অদ্ভুত। ওদের কোম্পানির একজন ভালো রাজমিস্ত্রি আছে। মুর্শিদাবাদে বাড়ি। নাম বশির আলি। সে একদিন একটা সূক্ষ্ম কাজ করছিল। সঙ্গে তাঁর কর্নিক অসংখ্য যন্ত্রপাতি। দুখি গিয়েছিল কাজের তদারকি করতে। কিন্তু বশিরের সূক্ষ্ম কাজের জাদুতে ওর চোখ আটকে গিয়েছিল। ইঁটগুলো, বিভিন্ন সাইজে টুকরো করে সুতো মেপে গেঁথে চলেছিল। ঠিক মালা গাঁথার মতো। মুখে বিড়ি নিয়ে হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘দুখিবাবু ইটাও এক শিল্পকম্ম। ছবি আঁকা বা ধরো না কেনে ডোমেদের কাঠের চুল্লি সাজানো, সবই কিন্তু ওই শিল্পকম্ম।’
দুম করে দুখি বলে বসেছিল, ‘আর কবিতা লেখা?’
—‘উটাও তাই গো। শব্দ সাজিয়ে সাজিয়ে কবিতা কি সবাই লিখতে পারে?’
—‘তুমি কতদূর পড়াশুনা করেছ?’
‘তা একটু জানি বইকি?’ ...শ্বাস ছাড়ে বশির।
সেই থেকে কবিতা লেখার ভূত চাপে। ভাবে, তাই তো গ্রামে থাকতে দেখেছে কালীনগর শ্মশানের পবন ডোমকে। প্রথমে মাটি কাটে কিছুটা মাপ করে। তারপর তিনফুটের চ্যালা কাঠ দিয়ে চুল্লি সাজায়। চাদ্দিকটা মোটা কাঠ বা কলাগাছ দিয়ে বেঁধে দেয়। বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে সে ও বলেছিল, ‘হু হু খোকা অত সোজা কাজ নয় গো, বুদ্ধি লাগে।’

হ্যাঁ তখন তো দুখিরাম খোকাই ছিল। ওর মা যখন মারা যায় তখন ও গ্রামের ইস্কুলে ক্লাস এইটে পড়ত। পরে এক সময় শহরে আসা। বাবার সঙ্গে ও, দিদি, দাদা সব্বাই। বাবা পোস্ট অফিসের পিওন হল। তারপর যা হয়। দিদির বিয়ে, দাদা আলাদা, বাবার মৃত্যু এবং শেষে ওর এক চিলতে বাড়িতে বউ নিয়ে ঘর সংসার করা। কিন্তু পবন ডোম আর বশির আলি ওকে কবিতার দিকে ঠেলে দিয়েছিল, এটা সত্যি।
কিন্তু কবিতা আর লেখা হচ্ছে কই? কেউ তো ওর কবিতা ছাপায় না। তবুও লিখে যায়। মনের ভেতর ইচ্ছে পাখিটাকে লালন পালন করে। একদিন কবিতা ছাপা হবে। মঞ্চে পাঠ করবে। হাততালি পড়বে। ফুল মেমেন্টো পাবে। বউকে এনে দেখাবে ...এই দেখো আমি পুরস্কার পেয়েছি।
দুখিরামের কবিতা পাঠের ইচ্ছের কথা শুনেই লালু মিত্তির বলে, ‘কবিতা! তুই পাঠ করবি?’ মুখে যেন কে লালচে আবির ছড়িয়ে দিল। সারাদিনের রোদ খাওয়া মিইয়ে যাওয়া কৃষ্ণচূড়ার পাতার মতো কিছুটা মিইয়ে গেল দুখিরাম। 
—‘হ্যাঁ আমি বেশ কিছুদিন কবিতা-চর্চা করছি লালুদা। তুমি তো এই অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়েছ। একটা ছোট্ট কবিতা পড়ার সুযোগ করে দাও।’
—‘তা তুই সম্পাদক কমলবাবুকে বল’
—‘ওঁরা সব বড় কবি। আমাকে পাত্তাই দেবেন না।’
মুচকি হাসে লালু মিত্তির।
—‘হ্যারে তোর টাইটেল যেন কী?’
—‘দলুই। দুখিরাম দলুই।’

—‘এবার বুঝেছি রহস্যটা কী! তুই ওই নাম আর টাইটেলে ঝাড় খাচ্ছিস। কোথায় মিত্র, চ্যাটার্জি, মুখার্জি... আর কোথায় দলুই। আর নামটাও তেমন। ...আচ্ছা কখনও ‘দুখিরাম’ বলে কোন কবির নাম শুনেছিস? দুখিরাম ঘাড় নাড়ে, ‘উঁহু’।

—‘তবে আগে নাম, টাইটেল পালটা। দেখবি লাউডগার মত তরতর করে উঠে পড়বি। তখন তোর কবিতা আঁকশি দিয়ে পাড়তে হবে।’
চোখের সামনে ভেসে উঠল গ্রামের বাড়ির খড়ের ছাউনিতে বেড়ে ওঠা লাউগাছ। কোন এঁদো গোবর মাটিতে হয়েছিল। ওর মা গাছটা যত্ন করে কঞ্চি দিয়ে সোজা করে দিয়েছিল। গাছটা সত্যিই যেন ফনা তুলে ফনফনিয়ে বড় হয়েছিল। কত কত লাউ এর জন্ম দিয়েছিল। পাড়ার লোককে মা বিলিয়ে দিত। ম্রিয়মান দুখিরামকে দেখে লালু মিত্তিরের মনটা যেন কঁকিয়ে উঠল। ওর টুকটাক ফাই ফরমাস বা পার্টির মিটিং টিটিং হলে একটু আধটু খেটে দেয়। খুব সরল, ভালো ছেলে একটা। সামনের বছর আবার কর্পোরেশন ইলেকশন। এবারে ওর দাঁড়াবার একটা চান্স আছে। অতএব... ‘আচ্ছা দেখব খন। সকালবেলায় মঞ্চটা একটু সাজিয়ে টাজিয়ে দিবি। আর সামনের চায়ের দোকানে বলে দিবি শ’তিনেক কাপ চা। আমার নাম করে বলবি।’ দুখিরাম তাতেই খুশি। একটা কবিতা পাঠ করতে পারবে। ঘাড় নেড়ে হাঁটা লাগায়।

লালু ওর হাতে পাঁচশো টাকা দিয়ে বলে ‘এই নে অ্যাডভান্স করে দিবি।’
পতিতপাবনবাবুর বাড়িতে একদিন গিয়েছিল সতী, ওর বউয়ের চায়ের আমন্ত্রণে। দেখে হাঁ। থরে থরে সাজানো স্মারক, মেমেন্টো, পুরস্কার কত কি! চায়ে চুমুক মারতে মারতে বউদি বলেছিল, ‘জানিস তো তার দাদা নির্লজ্জের মতো মিষ্টির প্যাকেটটা ঝোলায় ভরে আনে। বলে, এক সঙ্গে বসে মিষ্টি শেয়ার না করলে মন খুঁতখুঁত করে। সেই থেকে মিষ্টি খাওয়াও বেড়ে গেছে। আর মুটোচ্ছি। ভাগ্যিস সুগার ফুগার নেই।’

সেদিনের পর থেকে সতী মনের মধ্যে ছোট্ট একটা ‘আশা’ বলে গাছ রোপন করে। কী আশা? না, তার দুখিরাম একদিন কবি হবে। বেশ ঘরের দেওয়ালে স্মারক ঝুলবে। আর উপহার হিসাবে পাওয়া মিষ্টি একসঙ্গে দু’জনে খাবে। ও অবিশ্যি হাল ছাড়েনি। তাই দুখিরাম তখন ডায়েরির পাতায় লিখতে বসে তখন খুব নিরুপায় না হলে বিব্রত করে না।

সতী আজ মনে মনে ভীষণ খুশি। কিন্তু প্রকাশ না করে দুখিরামকে বলল, ‘ঠিক আছে আমি নয় দোকানে যাচ্ছি। তুমি লেখো। ও আজ লিখছিল না। ওর লেখা কবিতা বাছছিল। কোন কবিতা পড়া যায়? তাই ভাবছিল। এই করতে করতে বেশ বেলা হয়ে গেল। ও জামা গায়ে বেরিয়ে পড়ল। কলেজ কি এখানে? সেই পর্ণশ্রীতে। বেহালা চৌরাস্তা থেকে থানা। সেখান থেকে বাস বা অটো ধরে কলেজ।

যাইহোক হন্তদন্ত হয়ে কলেজে পৌঁছে গেল। শ’দুয়েক লোক বসার জন্য কক্ষ। মঞ্চটা সাজানো শুরু হয়ে গিয়েছিল। ও গিয়ে একটু তদারকি করল। চেয়ারগুলো লাইন করে বসাবার ব্যবস্থা করল। সামনের চা-এর দোকানে লালুদার নাম করে পাঁচশো টাকা অগ্রিম দিয়ে দিল। বলল, ‘গরম ভালো চা হওয়া চাই। বড় বড় কবি সাহিত্যিকরা আসবেন। বার দুয়েক চা দিতেই হবে। হারমোনিয়াম, তবলার দায়িত্ব যার ওপর দেওয়া আছে তাকে বার বার বলেছিল ছ’টায় অনুষ্ঠান। সাড়ে পাঁচটার মধ্যে যেন তবলচি সমেত তবলা পৌঁছে যায়। এসব করে বাড়ি পৌঁছতে বেশ বেলা হলো। খেয়ে দেয়ে আবার ডায়েরি নিয়ে বসল। প্রথম থেকে কবিতাগুলো পাঠ করতে থাকে। সতী এসে দাঁড়ায়। বলে একটু জিরিয়ে নাও। ফ্রেশ লাগবে। কবিতা পাঠেও তো এনার্জির দরকার না কি? সতীর মনের ভেতরটা দেখতে পাচ্ছে। সেই ‘আশা’ নামের গাছ কেমন যেন চনমন করছে। হেমন্তের বিন্দু বিন্দু শিশির মাখা গাছের মতো। দুখিরাম বুকের ওপর ডায়েরিটা রেখে চোখ বুঝলো। তাই তো একটু জিরিয়ে নেওয়া যেতেই পারে।

ঠিক সময়ে তৈরি দুখিরাম। সতী এবার চৈত্র-সেলে একটা হাফ হাতা পাঞ্জাবি কিনে এনেছে। বেশ আঁকিবুকি কাটা, কতক কবি কবি ভাবের। সতী জোর করে সেইটাই চাপিয়ে দিল। সাদা পাজামা। কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা। দুখিরাম বাধ্য ছেলের মতো গায়ে চাপিয়ে হাসল। বলল, ‘চলি তবে।’ সতী বলে, ‘চলি না, বলো আসি।’ বেরিয়ে পড়ে দুখিরাম। ঝোলার মধ্যে সেই ‘আশা’ গাছটিও যেন চলেছে কবি দুখিরামের সঙ্গে। কবি পতিতপাবন ছাড়াও কবি শ্যামল সরকার মঞ্চে বসে। প্রধান এবং বিশেষ অতিথি হিসাবে। অতিথি বরণে ফুলের তোড়া মেমেন্টো, উত্তরীয় আর পর্ণশ্রীর মিষ্টি দোকান থেকে বড় সড় মিষ্টির প্যাকেট দেওয়া হল। প্রাথমিক কাজকর্মের পর শুরু হল কবিতা পাঠ, গানের আসর।

দুখিরাম উদ্বোধনী সংগীতের হারমোনিয়াম আর তবলার ঠিকঠাক ব্যবস্থা করে সামনে বসা কবিমণ্ডলীর এক পাশে বসল। বুকের মধ্যে কেমন যেন হাকুর পাকুর পাক মারছে। ছোট্ট একটা কবিতা মনে মনে ঠিক করে নিল। মাঝে মাঝে মাথার ওপরে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকায়। নাহ্‌, ঩ঠিকই চলছে। তবে ও এত ঘামছে কেন? আড়চোখে আশপাশের দু-একজনের দিকে তাকাল, নাহ্‌, অমন তো ঘামছে না। কোনও মানে হয়। বড় অদ্ভুত টানা পোড়েন। এতদিন কবিতা না পড়তে পারা আর এখন পড়তে পারার ডাক পাওয়ার মাঝে ওর ‘আশা’ গাছটা হাঁকপাঁক করছে। এক একজন কবিতা পাঠ করছে মেমেন্টো, মিষ্টি সঙ্গে কিছু হাততালি পকেটে পুরে নেমে যাচ্ছে। মঞ্চের একধারে সাজান মেমেন্টো কমতে থাকে, মিষ্টি প্যাকেটও। এর মাঝে ঢুকে পড়ল শ্রুতি নাটক। হ্যাঁ এক দুই...পাঁচজন। পাঁচটা গলে গলে। আবার গান, আবৃত্তি... ক্রমশ মিষ্টির প্যাকেট, মেমেন্টো কমছে। যেমন করে ভাটার জল ক্রমশ সরে সরে যায়, ঠিক তেমন যেন। এ কি এত প্রায় শেষ! ও উঠে গিয়ে লালুবাবুকে ধরে। লালুদা আমার নাম ডাকছে না কেন? সব কবির পাঠ তো প্রায় শেষ। মেমেন্টো, মিষ্টিও তো নিঃশেষ প্রায়। লালুদা বলে, ‘আরে ভাবিস কেন? স্টার আর্টিস্ট সব শেষেই থাকে।’
—‘যাঃ বাবা! আমি আবার স্টার হলাম কবে থেকে!’

—‘আজ থেকে তুই কবি দুখিরাম দলুই।’ লালুদা হাসছে। হাসির মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে আশা নামক গাছটা, দুখিরামের কবিতা, কবিতার পাতাগুলো কাটা ঘুঁড়ি হয়ে উড়ে যাচ্ছে। ওর বউ এর মোম আলোয় মুখটাও আবছা হয়ে যাচ্ছে। দুখিরাম লালুবাবুর হাত ধরে বলল, ‘প্লিজ লালুদা... আমি তো অনেক খেটেও দিয়েছি, যা বলেছ তাই করেছি। অন্তত তার জন্য একটা কবিতা পাঠ করতে দাও।’
হ্যাঁ, একেবারে শেষে ডাক পেল। ‘এবারে শেষ পাঠ করছেন কবি দুখিরাম দলুই।’ ‘কবি দুখিরাম’ শুনেই দুখিরামের আনন্দে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। ঝুপসি হেমন্তের কুয়াশা ভেজা সকাল। মঞ্চের সামনে বিশেষ কেউ নেই। ফাঁকা চেয়ারগুলো ওর দিকে কেমন রসিকতা করতে থাকল। গুটি কয়েক যাঁরা আছেন তারা সিট ছেড়ে দাঁড়িয়ে। ভাঙা হাটের খদ্দের সব যেন। কিন্তু কবিবর পতিত পাবনবাবু বসে তখনও। শ্যামলবাবু অন্য অনুষ্ঠানে যাবেন বলে চলে গেছেন।

ইতস্তত করে কবিতা পাঠ করল—
‘ভয় হয় ভয়, ভীষণ ভয়/ যদি কেউ কারও দেখা না পায়/ যদি ডোবা সূর্যটা একেবারে হারিয়ে যায়। ভয় হয় ভয়, ভীষণ ভয়...’ পতিতপাবনবাবু প্রচণ্ড উচ্ছ্বাসে হাততালি দিয়ে উঠলেন। ‘বাহ্‌বা খুব সুন্দর লাইন।’

দুখির চিবুকে জল চিক চিক করে। ভ্যাবলার মত দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। না, মিষ্টি বা মেমেন্টো কিছুই এল না। সব ফুরিয়ে গেছে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে পতিতপাবনবাবু সোনালি পালকের মত ক্লিপ দেওয়া কাল সুন্দর পেনটা পকেট থেকে বার করে দুখিরামের হাতে তুলে দিলেন। ‘এটা তোমার পুরস্কার। লিখে যাও।’ এবার হঠাৎ থমকে যাওয়া কিছু হাততালি। দুখিরামের মিষ্টি বা মেমেন্টো না পাওয়ার বেদনা মুহূর্তে কর্পূরের মতো উবে গেল।’

কিন্তু সতী যে আশা করে বসে থাকবে। কী করা যায়? ও যে বলেছিল আজ একসঙ্গে বসে কবিতার-মিষ্টি খাবে! ভাবতে ভাবতে চৌরাস্তা বাজারে তখন। একগুচ্ছ লাল গোলাপ আর কচির দোকানের এক বাক্স সন্দেশ কিনে ঘুর ঢুকল। বড় ইচ্ছে আজ এই ‘কবি’ হয়ে ওঠার দিনে গিন্নির হাতে তুলে দেবে উপহার। দিলও। হাতে পেয়ে সতী গোলাপের গন্ধ শুঁকতে থাকে। আজ ও ভীষণ খুশি। ভেতরের গাছটা যেন হঠাৎ ডালপালা মেলে দিয়েছে। তারা বৃষ্টিতে ভিজতে চায়। দুখিরামের মুখেও তৃপ্তির হাসি। সতী বলে, বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এস, আমরা এক সঙ্গে মিষ্টি খাব।

প্রথম বৃষ্টিতে ভেজা দেবদারুর মত তরতাজা হয়ে বেরল বাথরুম থেকে। ইতিমধ্যে গোলাপ গোছা ফ্লাওয়ার ভাসে সাজিয়ে রেখেছে সতী। মিষ্টির প্যাকেট খুলতে গিয়ে দেখে ‘একি এ তো চৌরাস্তার কচির দোকানের বাক্স। পর্ণশ্রীর অনুষ্ঠানে চৌরাস্তার মিষ্টি কেন? তবে কি ফুলের গোছাও চৌরাস্তার থেকে কেনা! সতীর কষ্ট হয়, নিজের জন্য নয়। দুখিরামের জন্য। তবে কি ও আজও ‘কবি’ হয়ে ওঠেনি? পাঠ করতে দেয়নি?’ কিন্তু ওর মুখে এত তৃপ্তির হাসি তো কখনও দেখেনি... তবে? দুখিরাম হাসতে হাসতে বলে ‘তবে আর কিছুই না। কবিতা শুনে কবিবর পতিতপাবনবাবু তাঁর পকেট থেকে এই পেনটি পুরস্কার হিসাবে তুলে দিয়েছেন যা কেউ পাননি। বুঝেছ সতী এর থেকে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?’ বাইরে তখন অনেক জোনাকি মিট্‌ ঩মিটিয়ে নাচছিল। যত খুশি আজ যেন ঝরে পড়ছে ওদের ঘরে। সতীর আশা নামক গাছও কেমন জোনাকি হয়ে গেল।


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top