Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, বুধবার, ২৪ জানুয়ারী ২০১৮ , সময়- ৯:২৫ পূর্বাহ্ন
Total Visitor:
শিরোনাম
ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য হুমকি স্বরূপ শীর্ষস্থান ধরে রাখলো স্বাগতিক বাংলাদেশ বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ ৩০ হাজার বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ  ৬০০০ রানের মাইলস্টোন ছুঁলেন তামিম ইকবাল কে হচ্ছেন দেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি ?  বাংলাদেশি নারীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে সেই বিএসএফ সদস্য আটক ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় পদক পেলেন সাবের হোসেন চৌধুরী জাতীয় পরিচয়পত্রে যুক্ত হচ্ছে শিক্ষাগত যোগ্যতা বঙ্গবন্ধুর রক্তের দাগ শুকানোর আগেই অনেকে মন্ত্রী হয়েছেন

বাংলাদেশে ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর আবর্তন বিবর্তন, অন্তর্ধান


ড. সা’দত হুসাইন

আপডেট সময়: ৫ নভেম্বর ২০১৭ ১:৪৬ এএম:
বাংলাদেশে ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর আবর্তন বিবর্তন, অন্তর্ধান

আমার স্কুলজীবন কেটেছে নোয়াখালী জেলা সদরে, শহরের নাম মাইজদী কোর্ট। গ্রাম্য শহর মাইজদী কোর্টের অভিজাত পাড়া লইয়ার্স কলোনিতে নিজস্ব বাসায় আমরা বাস করতাম।

জেলা সদরের আইনজীবী তথা উকিল-মোক্তারদের বসবাসের জন্য এলাকা গড়ে তোলা হয়েছিল। পর্যাপ্তসংখ্যক আইনজীবী না পাওয়ার কারণে জেলা প্রশাসক, জেলা জজ ও অন্যান্য জেলা অফিসের অফিস সুপার, হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট, পেশকার, নাজির, সেরেস্তাদারদের বাড়ি বানানোর জন্য প্লট বরাদ্দ করা হয়। তাঁরাই ছিলেন শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তি। কোনো ব্যবসায়ী বা ঠিকাদার এ শ্রেণিভুক্ত ছিলেন না। শহরের লোকজন তাঁদের খুব একটা চিনত না। মাইল দুয়েক উত্তরে এসবেসটোজ বা টিনের ছোট ছোট বাংলোতে ম্যাজিস্ট্রেট বা হাকিমরা বাস করতেন। জেলা প্রশাসক, জেলা জজ, পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন মাইল তিনেক দক্ষিণে সোনাপুর নামে একটি ভিন্ন এলাকায় বাস করতেন। লইয়ার্স কলোনিতে মাত্র একজন হিন্দু আইনজীবী বাস করতেন। আর একজন হিন্দু আইনজীবী তাঁর প্লটে কাছারিঘর তৈরি করেছিলেন। সেখানে তিনি মাঝেমধ্যে বন্ধুবান্ধব ও মক্কেলদের নিয়ে বসতেন। হিন্দু আইনজীবী, ব্যবসায়ী ও সম্ভ্রান্ত পেশাজীবীরা শহরের অন্য অংশে ‘গুপ্তাংক’ নামক পাড়ায় বসবাস করতেন। প্রায় বছরই শোনা যেত, তাঁদের মধ্য থেকে দু-এক পরিবার বাড়িঘর বিক্রি করে ভারতে চলে গেছে।

শহরের লোকজন নির্ঝঞ্ঝাট, নিরুত্তাপ, সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। আইনজীবী হিসেবে কয়েকজনের ভালো প্রসার ছিল, সুখ্যাতি ছিল। বোধ করি, আয়-রোজগারও একটু বেশি ছিল। কিন্তু তাঁদের প্রতাপ-প্রতিপত্তি চোখে পড়ার মতো বেশি ছিল এমনটি বলা যাবে না। তাঁদের ছেলে-মেয়েদেরও আলাদা কোনো পরিচয় বা স্বাতন্ত্র্য ছিল না। ছেলেদের কথা বলছি। সবাই আমরা এক কাতারে চলাফেরা করতাম, এক মাঠে খেলাধুলা করতাম। এর মধ্যে কোনো প্রভাবশালীর ছেলে রয়েছে, এটি আমরা কখনো অনুভব করিনি। আমাদের পাড়ায়, লইয়ার্স কলোনিতে সবার বাবা আমাদের অভিভাবক ছিলেন। চলাফেরায় ভুলভ্রান্তি হলে আমাদের হালকা শাসন করতেন। শহরে ফুটবল খেলা খুব জনপ্রিয় ছিল। প্রদেশের শীর্ষ পর্যায়ের খেলোয়াড়রাও ফাইনাল খেলায় বিভিন্ন টিমে ‘হায়ারে’ খেলতে আসত। ভালো খেলোয়াড়দের শহরে খুব কদর ছিল, তাদের এক ডাকে সবাই চিনত। তবে সমাজে বা শহরে তাদের অন্য কোনো প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল না। বিষয়টির প্রাসঙ্গিকতাও ছিল না।

আমাদের পাড়া বা শহরে কোনো রাজনীতিবিদকে দৃশ্যমানভাবে প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটাতে দেখিনি। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে আমাদের পাড়ার মুজিবুর রহমান মোক্তার যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে এমএলএ নির্বাচিত হয়েছিলেন। নির্বাচনের পর আমরা তাঁর কোনো পরিবর্তন দেখতে পাইনি। তিনি ছিলেন নিখুঁত ভদ্রলোক; সৌম্য-শান্ত সজ্জন ব্যক্তি। নোয়াখালী শহরে কারো ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল না, তাঁরও ছিল না। রিকশায় ও হেঁটে চলাফেরা করতেন। তাঁর বাড়িঘরের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন করার মতো ইচ্ছা বা সংগতি বোধ হয় তাঁর ছিল না। তাঁর ছেলেরা, বদু ভাই, শফিক ভাই বা রফিক ভাইয়ের মধ্যেও কোনো পরিবর্তন দেখিনি। শহরের অপর প্রসিদ্ধ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী। আমাদের পড়শি, দুই বাসার একই সীমানা। তাঁর নির্বাচনী এলাকা ছিল বেগমগঞ্জের গোপালপুর। তিনি জমিদার বংশের লোক। একেবারে নিরহংকার ভদ্রলোক।   জীবনে কেউ তাঁকে খারাপ শব্দ উচ্চারণ করতে শোনেনি। তিনি দু-একবার জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। শহরের মধ্যে নিরিবিলি শান্তিপ্রিয় জীবন যাপন করতেন। পাড়া-মহল্লার কর্মকাণ্ডে খুব একটা জড়িত হতেন না। আমার হাতে পাকিস্তানি খবর ম্যাগাজিনটি দেখলে মাঝেমধ্যে চেয়ে নিয়ে পড়তেন; আবার ফেরত দিতেন।

১৯৫৭ সালে মুজিবুর রহমান মোক্তার মৃত্যুবরণ করলে উপনির্বাচনে মালেক উকিল এমএলএ নির্বাচিত হন। তাঁর কিছুকাল পর দেশে সামরিক শাসন জারি করা হয়। মেজর পায়েন্দা খান নোয়াখালী জেলার সাব জোনাল মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখন থেকে তিনি আবির্ভূত হন জেলার ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে। তাঁর ক্ষমতা ছিল মূলত প্রশাসনিক। সামাজিক অঙ্গনে সে ক্ষমতা দৃশ্যমান হয়নি বা তীব্রভাবে অনুভূত হয়নি। সমাজ ও সার্বিক প্রশাসন আগের মতো চলতে থাকে। তবে পায়েন্দা খান ও তাঁর টিমকে মানুষ ক্ষমতার কেন্দ্র বলে মনে করত। জেলার লোক স্থানীয় কোনো লোককে পায়েন্দা খানের সমকক্ষ মনে করত না। স্থানীয় গণ্যমান্য লোকজনের ক্ষমতাবান হওয়ার তেমন আগ্রহ ছিল না। তারা শহরের চলমান অবস্থাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছিল। শাসনক্ষমতার পালাবদল সম্পর্কে সাধারণ মানুষের বড় একটা উৎসাহ ছিল না।     

এমন অবস্থার মধ্যে আমি স্কুলজীবন শেষ করে ঢাকায় আসি এবং ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হই। কলেজজীবনের প্রথম বর্ষে আমি পড়ালেখা নিয়ে সম্পূর্ণ ব্যস্ত ছিলাম। হোস্টেল ও কলেজের শ্রেণিকক্ষ ছাড়া অন্য সব কিছু আমার জগতের বাইরে ছিল। প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটার জন্য বড়জোর কলেজসংলগ্ন নিউ মার্কেটে যেতাম। তখন উচ্চ মাধ্যমিকে প্রতিবছর ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে যেত। প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় আমার ফল খুব ভালো হলো। এ ফলকে পুঁজি করে দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা একটু কমিয়ে বাইরের জগতের সঙ্গে সংযোগ বাড়িয়ে দিলাম। তখন জোরেশোরে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন (Education Movement) চলছিল। আমরা কজন আমাদের এক বয়সী সতীর্থের সঙ্গে মিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রনেতাদের বক্তৃতা শুনতে যেতাম। তাঁদের নির্দেশনায় মাঝেমধ্যে মিছিলে যোগ দিয়ে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক, ইসলামপুর, মিটফোর্ড ঘুরে নাজিমউদ্দিন রোড হয়ে মধুর ক্যান্টিনে ফিরে আসতাম। ছাত্রনেতাদের আকর্ষণ ও প্রভাবে পরবর্তীকালে আইএসসি (উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান শাখায়) পাস করে ছাত্ররাজনীতি করার মানসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হলাম। বামঘেঁষা ছাত্রসংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপসু) যোগ দিলাম। অচিরে হয়ে উঠলাম মাঝারি মানের ছাত্রনেতা।

ইপসু ও এসএল (ছাত্রলীগ) ছিল সরকারবিরোধী ছাত্রসংগঠন। রাজনৈতিক স্তরে তাদের অভিভাবক যথাক্রমে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ও আওয়ামী লীগ। সরকারে রয়েছে মুসলিম লীগ। তাদের ছাত্রসংগঠনের নাম ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফেডারেশন (এনএসএফ)। পূর্ব পাকিস্তানে সরকারি দলের নেতা গভর্নর মোনেম খাঁ। ক্ষমতার কলকাঠি তাঁর হাতে। এ সময় ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্য ও দোসরদের কথা আমাদের কানে আসতে লাগল। জানলাম, মোনেম খাঁর ছেলেদের নাম, তাঁর জামাতার নাম, আরো জানলাম, ক্ষমতাধর কয়েক ব্যক্তি ও পরিবার সম্পর্কে; যেমন—ফজলুল কাদের চৌধুরী, সবুর খান, কাজী কাদের, খাজা খয়ের উদ্দিন, ময়মনসিংহের ফখরুদ্দিন, সিলেটের দেওয়ান বাসেত, কুমিল্লার দারোগাবাড়ি, বগুড়ার নবাববাড়ি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজবাড়ির নেতৃস্থানীয় সদস্যরা। রাজনৈতিক নেতাদের সমতুল্য কিংবা তাঁদের চেয়ে অধিকতর ক্ষমতাধর ছিলেন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তা। এই শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত কয়েকজন সিনিয়র ও মধ্যপর্যায়ের সিএসপি, পিএসপি অফিসার, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপক, কলেজের অধ্যক্ষ, বিভাগ-অধিদপ্তরের প্রধান। তাঁদের নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের ক্ষমতা প্রয়োগের কেচ্ছা-কাহিনি আমরা তখন প্রায়ই শুনতে পেতাম। মজার ব্যাপার, বিরোধী দলভুক্ত কতিপয় ‘নন-রুলিং এলিট’ (Non-ruling Elite) ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিকরা, আইনজীবী, ব্যবসায়ী ও বনেদি জোতদার। সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে তাঁদের প্রভাব বেশি অনুভূত হতো। গভর্নরের সমর্থন, সান্নিধ্য ও আশকারা পেয়েও তাঁবেদার শিল্পী-সাহিত্যিকরা বেশি দূর এগোতে পারেননি। এ অঙ্গনে বিরোধী ঘরানার নেতাদের প্রভাব শেষ পর্যন্ত অটুট ছিল।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দেশের অভ্যন্তরে নানা রকম ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতাধর গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তবে কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁদের অন্তর্ধান ঘটে। গভর্নর মোনেমসহ আরো কয়েকজন মারা পড়েন। বেশ কয়েকজন পালিয়ে যান। স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর অভ্যুদয় ঘটে। তবে বারবার ক্ষমতার পালাবদলের কারণে কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া একই রাজনৈতিক পরিবার একনাগাড়ে দীর্ঘ সময় নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি। আবার এ কথাও সত্য যে পালাবদলের খেলায় কয়েকটি পরিবার একাধিকবার ক্ষমতাধর হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এ ছাড়া একবার ক্ষমতাধর থাকার সময়ে এ পরিবারের সদস্যরা যে অর্থবিত্ত, ধন-সম্পদের অধিকারী হয়েছে তা দিয়ে ক্ষমতাবৃত্তের বাইরে থেকেও তারা ক্ষমতার বলয়ে হাত রাখতে পেরেছে। এ সম্পদ তাদের আবার ক্ষমতায় আসতে ও বর্ধিত প্রভাব নিয়ে ক্ষমতাধর হতে সাহায্য করেছে। বড় দলের সিনিয়র রাজনীতিবিদদের অনেকের ক্ষেত্রে এ কথা প্রযোজ্য। নিজ নির্বাচনী এলাকা ও রাজধানীতে তাঁদের নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ক্ষমতার দাপট ভাবলেশহীন প্রতিবন্ধীরও গায়ে লাগে। প্রশাসন ও রাজনীতির বর্তমান সংস্কৃতি চলমান থাকলে এসব পরিবারের ক্ষমতার ধারা দীর্ঘদিন অপ্রতিরোধ্য থাকবে।

এর মধ্যেই একটি নতুন স্রোত জোরেশোরে বইতে শুরু করেছে। স্বাধীনতার পর সরকারি সেক্টরে সমাজতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ শক্তভাবে প্রয়োগ করা হলেও বেসরকারি খাত, বিশেষ করে কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্য মোটামুটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে যায়। বড় কৃষক, জোতদার ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অলক্ষ্যে ধীরে ধীরে অর্থ-সম্পদের মালিক হতে থাকে। সত্তরের শেষ দিকে, বলা যায় আশির প্রথম থেকে, বিরাষ্ট্রীকরণসহ নানা ধরনের সহায়ক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য বহু ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। বলা যায়, দেশে সাংগাত পুঁজির (Crony Capitalisn) নাচন শুরু হয়। যখন যে দল বা গোষ্ঠী মূল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে তাদের সাহায্য-সমর্থন, আশ্রয়-প্রশ্রয় ও আনুকূল্য নিয়ে নতুন শ্রেণির ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা শিল্পপতি সম্প্রদায় গড়ে ওঠে। চার দশক ধরে সরকারি সমর্থনে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালিয়ে তারা শত শত, কেউ মনে করে, হাজার হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। তাদের অর্থবিত্ত, ধন-সম্পদের সীমা-পরিসীমা নেই। এই সম্পদের বদৌলতে তারা ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সমিতি থেকে শুরু করে প্রায় সব আঞ্চলিক ও শাখা সমিতি দখল করে ফেলেছে। সরকার ও মন্ত্রণালয়ের ওপর এই সমিতিগুলোর প্রভাব অপরিসীম। ব্যবসায়িক বৃত্তের বাইরে গিয়ে তারা পাড়া-মহল্লার ক্লাব, খেলার টিম, পেশাজীবী সংগঠনে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। সুধীজনের অনেকের মন্তব্য হচ্ছে, তারা পার্লামেন্টও দখল করেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের হাতের মুঠোয়। একে অপরের পরিপূরক।

পরিবারের একাধিক সদস্য সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সংস্থার উচ্চপদে অধিষ্ঠিত থাকার কারণে কিছু পরিবার প্রচণ্ড ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিল। সে সময় মনে করা হতো দেশের সব কিছুতে এসব পরিবারের হাত রয়েছে, তাদের বিপক্ষে গেলে কারো নিস্তার নেই। তারা যা চাইবে তা নিয়ে নেবেই, তাদের ক্ষেত্রে আইন-কানুনের বালাই নেই। নানা ধরনের বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা একেবারে তুঙ্গে উঠেছিল। কিন্তু সরকারি চাকরিতে অবসরগ্রহণের বয়সসীমা নির্দিষ্ট থাকায় একসময় একে একে তাঁদের অবসরগ্রহণ করতে হয়েছে। ছেলে-মেয়েরা সরকারি চাকরিতে আসেনি। ফলে তারা সাধারণ সচ্ছল নাগরিকের জীবন যাপন করছে। সরকার বা দেশের বিভিন্ন অঙ্গনে তাদের সেই প্রভাব-প্রতিপ্রত্তি আর নেই। টাকা-পয়সার জোরে তারা ব্যক্তিক পর্যায়ে প্রচুর আরাম-আয়েশ করছে। বছরে কয়েকবার বিদেশ ভ্রমণ করছে। দুই হাতে টাকা খরচ করছে। তবে পরিবারের কর্ম সম্পাদনে আগের মতো প্রভাব খাটাতে পারছে না বলে মাঝেমধ্যে বিরক্তি প্রকাশ করছে। যারা চালাক-চতুর তারা ব্যবসা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে নতুন ধারায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। অনেকে সফল হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানে অভিজাত শ্রেণির আবর্তন, বিবর্তন ও অন্তর্ধানের কথা পড়েছি। Circulation of Elite-এর মূল বার্তা হচ্ছে, অভিজাত শ্রেণি স্থায়ীভাবে টিকে থাকে না। এক অভিজাত শ্রেণি ক্ষয়ে যায়, পরিশেষে বিলীন হয়। অন্য অভিজাত শ্রেণি তার স্থান দখল করে নেয়। নগণ্যসংখ্যক ব্যতিক্রমী পরিবার ছাড়া এতদঞ্চলের (বর্তমান বাংলাদেশ) অনেক অভিজাত শ্রেণি ক্ষয়ে ক্ষয়ে হারিয়ে গেছে। নতুন মানদণ্ডে ভর করে নতুন অভিজাত শ্রেণি দাবড়ে বেড়াচ্ছে। একসময় হয়তো এরাও চুপসে যাবে। হারিয়ে য়াবে। রংবেরঙের পাখা মেলে নতুন শ্রেণি আবির্ভূত হবে।

লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ও পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top