Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮ , সময়- ২:০৮ পূর্বাহ্ন
Total Visitor: Projonmo Kantho Media Ltd.
শিরোনাম
বিএনপির নির্বাচনে আসার পিছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে : মেনন  ডিসেম্বরের পরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অসম্ভব নির্বাচন বানচাল করার জন্য বিনা উস্কানিতে এই নাশকতা : ওবায়দুল কাদের কী ঘটেছে রাজধানী ঢাকার নয়াপল্টনে ? দেশকে এগিয়ে নিতে বিশ্বাসঘাতকদের প্রয়োজন নেই : শেখ হাসিনা রাজধানীর নয়াপল্টনে পুলিশ-বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হেভিওয়েট প্রার্থীরা কে লড়বেন কার বিপক্ষে ভোটের মাঠে  নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে হয়রানি ও গায়েবি মামলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে : মির্জা ফখরুল সপ্তাহব্যাপী জাতীয় আয়কর মেলার দ্বিতীয় দিন শেষ হলো সপ্তাহব্যাপী জাতীয় আয়কর মেলার দ্বিতীয় দিন শেষ হলো

আগামীর পথ চলায় কাজী আরেফ আহমদ আমাদের প্রেরণার উৎস 


শরীফ নূরুল আম্বিয়া

আপডেট সময়: ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ ১২:৫৩ পিএম:
আগামীর পথ চলায় কাজী আরেফ আহমদ আমাদের প্রেরণার উৎস 

কাজী আরেফ একজন অসাধারন নেতা ছিলেন, সাধারন মানুষের মাধ্যে খুব বেশী পরিচিতি না থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনের মানুষ তাঁকে সম্মান করত। ছাত্র জীবন থেকে তিনি অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চিন্তার অনুসারী ছিলেন। তার সামর্থ, যোগ্যতা, ত্যাগ তিতীক্ষা ছাত্র জীবনে সুবিধিত ছিল। তিনি সিরাজুল আলম খান ও আব্দুর রাজ্জাকের সংগে মিলে নিউক্লিয়াস গঠন করেছিলেন বাঙ্গালীর জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করার জন্য। কাজী আরেফের রোমাঞ্চকর রাজনৈতিক জীবনের শুরু এখান থেকেই। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি ব্যারাকপুর সেক্টর প্রধান তোফায়েল আহমদ এর সংগে বিএলএফ এর গোয়েন্দা প্রধান হিসাবে কাজ করতেন। মৃত্যুকালে তিনি জাসদের কার্যকরি সভাপতি ছিলেন।তিনি ছিলেন স্বল্পভাষী, ধীর-স্থির ও দূরদর্শী। ব্যক্তিগত প্রচার-অভিলাষ ও আকাঙ্ক্ষা থেকেও সংগঠনের উপর বেশী গুরুত্ব দিতেন।সংগঠন আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের এক সফল সংগঠকের এই হত্যাকান্ড মেনে নেয়া যায় না। নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ গঠন করা হয়, পরে যার নাম হয় বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স(বিএলএফ), যুদ্ধকালীন নাম হয় মুজিব বাহিনী।

মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী কাজী আরেফ আহমদ কে ১৬ ফেব্রুয়ারী ১৯৯৯ সনে কুষ্টিয়াতে প্রকাশ্য জনসভায় এক সন্ত্রাসী চক্র গুলী করে হত্যা করে। জেলা জাসদের শীর্ষ কয়েকজন নেতাও এক সংগে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে, প্রকাশ্যভাবে যারা এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে তাদের বিচার হয়েছে, পলাতকরা ছাড়া সকলের দন্ড কার্যকর করা হয়েছে। তবে পেছন থেকে যারা এই হত্যাকান্ড সঙ্ঘঠনের কলকাঠি নেড়েছে, তারা ধরা ছোয়ার বাইরে রয়েছে।তারা চিহ্নিত হলে দেশবাসী হয়তো শান্তি ও সস্থি পেত।

মহান মুক্তিসংগ্রাম তিল তিল করে গড়ে তোলার জন্য কাজী আরেফ অনেক গুরুত্ব পুর্ন সিদ্ধান্তের অংশীদার ছিলেন। আমার বিবেচনায় যেসব গুরুত্ব পূর্ন সিদ্ধান্ত প্রাক সশস্ত্র সংগ্রাম পর্বে আমাদের মুক্তিসংগ্রামকে গতিদান করেছিল এবং যে সব সিদ্ধান্তে কাজী আরেফের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল, সেগুলো হল-

  • ৬দফার কর্মসূচি ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা অর্পন
  • আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তির দাবীতে অটল থাকা
  • সুসজ্জিত জয় বাংলা বাহিনী গঠন ও ৭ জুন ১৯৭০ জয় বাংলা বাহিনীর কুচকাওয়াজ
  • জয় বাংলা স্লোগানের প্রচার
  • স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা, সবুজ জমিনে লাল সূর্যের মাঝে সোনালী বাংলাদেশের মানচিত্র চূড়ান্ত করা, যা ২ মার্চ ঐতিহাসিক বটতলায় উত্তোলন করা হয় এবং ২৩ মার্চ আনুষ্ঠানিক ভাবে উত্তোলন করা হয়।
  • কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উম্মুক্ত পরিবেশে সামরিক প্রশিক্ষণ
  • ৭১ এর মার্চ জুড়েই সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি

মহান মুক্তিযুদ্ধে কাজী আরেফের অবদান যেমন উজ্জ্বল একইভাবে উজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠার রাজনীতি সচল করায়। কাজী আরেফ কখনোই বিশ্বাস করতেন না রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধারা মিলেমিশে রাজনীতি করতে পারে, তিনি মনে করতেন যারা এটা বলে তারা আসলে বাঙ্গালী জাতিকে পঙ্গু করে রাখতে চায়।তিনি মনে করতেন, যে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে তার পরিপূর্ণ বিজয় এবং পরাজিত পাকিস্তানী ধারাকে পরিপূর্ণ নির্বাসনের মাধ্যমে বাঙ্গালীর জাতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিসর্জন দিয়েছিলেন, অনেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতেও সংকোচ বোধ করতেন। গণআদালতে গোলাম আজমের বিচারের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের শক্তি সম্পর্কে আস্থা খুঁজে পায়। এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবাই জয় বাংলা স্লোগান দেয়। ১৪দলীয় জোট সরকার ক্ষ্মতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধারা আগের চাইতে স্বীকৃত ও সম্মানিত, ’৭২ এর সংবিধান প্রায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত।

১৯৯১ সনে ২৯ ডিসেম্বর গোলাম আজমকে জামাতের আমীর করার পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবার পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়, সকলের মধ্যে গভীর ক্ষভ ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম হয়। কাজী আরেফ ’৯২সনের ৯জানুয়ারী আরও অনেকের সহযোগিতা নিয়ে সকল রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন, সেক্টর কমান্ডার’স ফোরাম...সামাজিক সংগঠনের এক সভা আহ্বান করেন যেখানে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি” গঠন করা হয়। একই সময়ে কর্নেল নূরুজ্জামানের উদ্যোগে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ৭১ এর ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি গঠন করা হয়। ৯২ এর ১১ জানুয়ারী উভয় কমিটি জাহানারা ইমামের নেতৃত্ব ঐক্যবদ্ধ্ হয়ে ২৬শে মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণআদালতে গোলাম আজমের বিচার অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়া হয়।গনআদালতে গোলাম আজমের বিচারের পর এই আন্দোলনে যে গতি সঞ্চার হয় তা নবম জাতীয় সংসদে সিদ্ধান্ত প্রস্তাবে পরিণতি লাভ করে।

এক কথায় এ ঘটনার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনর্জাগরিত হয়েছিল। রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের এক কাতারে ফেলে জেনারেল জিয়া যে তথাকথিত জাতীয় সংহতির রাজনীতি করেছিলেন তা প্রতিরোধ করার শক্তি তৈরী হয়েছিলো এই আন্দোলনে। বিপরীতে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে জামাত এবং দ্বিমুখী হেফাজত সহ যে ধর্মীয় জঙ্গি গোষ্ঠী ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বিপ্লবের পথ অনুস্মরণ করেছিল, কখনো আলাদাভাবে কখনো সমন্বিত ভাবে, সে পথ উন্মুক্ত করেছিল জেনারেল জিয়া।

স্বাভাবিকভাবে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষায় গড়ে উঠেছিল জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দল, যা অনেক বাঁধা বিপত্তির মুখেও এখনো অগ্রসর হয়ে চলেছে। ইতিমধ্যে অনেক জঙ্গি হামলা-হুমকি মোকাবেলা করা হয়েছে প্রশাসনিক ও বিচারিক ভাবে। বিএনপি সন্ত্রাসী পথে বিদ্যমান সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক ধারা নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র করেছে। তারা এই ধ্বংসাত্মক পথ থেকে সরে এসেছে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

দেশে এখন কিছুটা রাজনৈতিক উত্তেজনা রয়েছে, আসন্ন নির্বাচন, বিএনপি নেতৃত্বের পরিচালিত সন্ত্রাস ও দুর্নীতির মামলা এবং সম্প্রতি আদালত কর্তৃক বেগম খালেদা জিয়ার সাজা প্রাপ্তি নিয়ে। বিএনপির কাছে এসব বিষয়গুলো আইনগতভাবে মোকাবেলা করার বিকল্প নেই, দেশের মানুষ ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার কথা ভূলে যায় নি।

তবে ১৪ দলীয় সরকারের অধীনে দেশের সব কিছু সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে তা বলা যায় না। হেফাজতের সঙ্গে সরকার আপোষ করে চলেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলনে জয়লাভ করলেও সমাজ ও রাজনীতিতে ধর্মীয় ভাবধারা বিস্তৃত হয়েছে, জঙ্গি সন্ত্রাসীদের হুমকি এখনো রয়েছে, মাদক দ্রব্যের বাজার বিস্তৃত হয়েছে দেশব্যাপি, ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চরম বিশৃঙ্খলা ও লুটপাট, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবার বিশেষের কর্তৃতব প্রটিষ্ঠা, শিক্ষাঙ্গনে দূর্নিতি-বিশৃঙ্খলা-প্রশ্নপত্র ফাঁস, ১৪ দলে আদর্শ বিরোধীদের ব্যাপক অনুপ্রবেশ, যুব সংগঠন সমুহের আদর্শ বিরোধী কর্মকান্ড...... প্রভৃতি আমাদের অর্জন সমুহকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে পথ তৈরী করতে হবে। কোন ষড়যন্ত্র সফল হতে দেয়া যায় না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। আসন্ন নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্ধন্ধিতামুলক করতে হবে।সংসদে কার্যকরী বিরোধী দল গঠন করার সুযোগ থাকতে হবে। আমাদের যা কিছু অর্জন তা রক্ষা করতে লুঠেরা দূর্নিতিবাজ ও অনুপ্রবেশকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, তা না হলে সরকার ও সংগ্রামী জনগণের সকল অর্জন ভেস্তে যাবে। সময় থাকতে সম্বিত ফিরে পাওয়াই ভালো, সময় শেষ হওয়ার আগে মানুষের আস্থা সুদৃঢ় করার পদক্ষেপ গ্রহনই সময়ের কৌশল।

এক নৈরাস্যময় সময়ে কাজী আরেফরা জাতীয় পুনর্জাগরনের আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন, এই আন্দোলন জাতীয় ঐক্যের জন্ম দিয়েছিল।এই ঐক্যের মধ্যে লুটেরা সুযোগসন্ধানী, চাটুকার ও আদর্শবিরোধী অনুপ্রবেশকারীদের দৌরাত্ম বেড়ে চলেছে। শুধু উন্নয়ন দিয়ে ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদীদের মোকাবেলা করা যাবে না। সমমর্যাদা ভিত্তিতে সব রকম বৈষম্য দূর করার পদক্ষেপ নিতে হবে। নাহলে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক উত্থানের বিপদ রাজনীতির দ্বারপ্রান্তে হাজীর হতে পারে। সম্ভাব্য এই বিপদ বিবেচনায় নিয়ে আমাদের আগামীর পথচলা নির্ধারন করা উচিত। আমরা তা করেই শুধুমাত্র সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মান করতে পারব। কাজী আরেফ সাহস এবং আস্থার সঙ্গে আমাদের সেই পথে অগ্রসর হওয়ার অনুপ্রেরনা দান করেন।

কাজী আরেফ আহমদের স্মৃতি দীর্ঘজীবী হউক।
জয় বাংলা। জয় বাংলাদেশ।

শরীফ নুরুল আম্বিয়া
সভাপতি, বাংলাদেশ জাসদ


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top