Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮ , সময়- ১১:২১ অপরাহ্ন
Total Visitor: Projonmo Kantho Media Ltd.
শিরোনাম
বিভ্রান্ত করতে বিএনপি নেতাকর্মী ও শয়তানের মধ্যে তফাৎ নাই : যুবলীগ চেয়ারম্যান এত বেশী কেন, বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেটের দাম ? মামলার তারিখ এলেই খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে পড়েন : শেখ হাসিনা মামলার তারিখ এলেই খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে পড়েন : শেখ হাসিনা মামলার তারিখ এলেই খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে পড়েন : শেখ হাসিনা তালিকাচ্যুতির পাইপ লাইনে আরও ২৫ কোম্পানি বেগম খালেদা জিয়ার জামিন না মঞ্জুর, ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ কুষ্টিয়ার ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক, খুঁজে বের করা হবে : ওবায়দুল কাদের লাল ফিতা, সাদা ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান : প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ

জাতিসংঘের স্বীকৃতি, উন্নয়নের সমালোচনা এবং আগামির করণীয়


গোলাম সারোয়ার

আপডেট সময়: ২৯ মার্চ ২০১৮ ২:০৯ পিএম:
জাতিসংঘের স্বীকৃতি, উন্নয়নের সমালোচনা এবং আগামির করণীয়

উপ-সম্পাদকীয় : বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠার যোগ্যতা অর্জন করলো। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে বাংলাদশের প্রোফাইলে এই স্বীকৃতি উৎকীর্ণ করে দেওয়া হয়েছে। কালের বিস্তৃত ইতিহাসে এটিও আমাদের একটি মাহেন্দ্রক্ষণ, আমাদের জাতীয় সম্মিলিত প্রয়াস প্রচেষ্ঠার ফল। এই সময়ে আমাদেরকে পিছনের ইতিহাস মনে রেখে দৃষ্টি রাখতে হবে সুদূরে; মানব সভ্যতার আলোক উজ্জল সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে ।

পৃথিবীর কতজাতি ভাগ্যের অন্বেষণে আমাদের এই দেশে এসেছিলো সেই স্মরণাতীত কালে থেকে। আর্য, লুটেরা, দস্যু, হার্মাদ; পৃথিবীর কত জনপদের কত কত সভ্য-অসভ্য জাতি। সর্বশেষ গত শতাব্দীতে ইংরেজরা চলে গেলে প্রায় বারশ মাইল দূরত্বের যে কিম্ভুতকিমাকার রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিলো মানব সভ্যতার সব অর্জন বাদি দিয়ে স্রেফ ধর্মের উপর ভর করে, মাত্র চব্বিশ বছর পরে তার বুক চিরে জন্ম হয় আমাদের এই দেশটির। জন্ম হয় যখন আমাদের উপর উৎপীড়ন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিলো । আমরা স্বাধীন হলাম ১৯৭১ সালে । আমরা ভূমি উদ্ধার করলাম কিন্তু আমাদের সমুদয় সম্পদের বড় অংশ রয়ে গেলো পশ্চিম পাকিস্তানে। আমরা ব্যাংকগুলোর পেলাম শুধু কাঠামো আর আমানতের হিসাব, সম্পদ আর দায়ের সঞ্চিত অর্থ সবই রয়ে গেলো পশ্চিম পাকিস্তানে, যেহেতু সবকিছুর হেড অফিস ওখানেই ছিলো। সেই সম্পদের হিসাব ও হিস্যা আমরা এখনও পাইনি। যুদ্ধের নয় মাসেও  আমাদের অনেক সম্পদ পাচার করেছে পাকিস্তানীরা। আমরা পেলাম বিধ্বস্ত অর্থনীতি, রাস্তাঘাট, অবকাঠামো এবং বিধ্বস্ত সংসার। বিধ্বস্ত অবস্থার উপর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার একটি বাজেট দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম। সেই আমরা বর্তমানে বাস্তবায়ন করছি ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট ! জাতিসংঘতো আর কারো মুখ দেখে রাষ্ট্রীয় মান মর্যাদা নির্ধারণ করেনা! এই বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান কাজ করে সূচক দেখে। 
বিশ্বে এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশের  ধারণাটি প্রথম আলোচনায় আসে ১৯৬০ সালে।  তবে এলডিসির প্রথম  তালিকা করা হয় ১৯৭১ সালের ১৮ নভেম্বর। তখন বিশ্বে স্বল্পোন্নত দেশ ছিলো ২৫ টি। ২০১১ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে হয় দ্বিগুণ। বাংলাদেশ বের হয়ে যাওয়ার পর এলডিসির সংখ্যা এখন হবে ৪৭টি । আমরা মনে রাখবো, বাংলাদেশকে এলডিসিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ১৯৭৫ সালে। 

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসোক) উন্নয়ন নীতিমালাবিষয়ক কমিটি বা কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) তিনটি সূচকের ভিত্তিতে তিন বছর পর পর এলডিসির তালিকা তৈরি করে থাকেন। গত ত্রিশ বছরে মাত্র পাঁচটি দেশ এই তালিকা থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে। ঐ দেশগুলো হলো বতসোয়ানা(১৯৯৪), কেপভার্দি(২০০৭), মালদ্বীপ(২০১১), সামোয়া(২০১৪) এবং গিনি(২০১৭) । এই তথ্য থেকেই অনুমান করা যায় স্বল্পোন্নত দেশের বেড়াজাল ছিন্ন করে বের হওয়া অতো সোজা কর্ম নয়।  বিশ্বের এখনকার যে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি তাতে সামনের দিনগুলোও এই তালিকা থেকে বের হওয়া আরো কঠিন হবে।

জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকের ভিত্তিতে বিশ্বের দেশগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করে থাকে। এই তিনটি ভাগে পড়া দেশগুলো হলো, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি), উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশ। যেকোন রাষ্ট্র চাইলেই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হতে পরেনা । স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠতে জাতিসংঘের ডিজাইন করা কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। শুধু উন্নয়ন নয়, আজকের যুগের ধারণা হলো টেকসই উন্নয়ন। উন্নয়নকে টেকসই করতে মাথাপিছু আয়ের পাশাপাশি সামাজিক বিষয়গুলো বিবেচনা করে সূচক তৈরি করে থাকে (সিডিপি)। সে হিসেবে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে তিনটি বিষয় বিবেচনা করা হয়। এগুলো হলো মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি। এসব সূচকে আগের তিন বছরের গড় পয়েন্ট হিসাব করা হয়। বাংলাদেশ এবার সেই সূচকে ‘গ্র্যাজুয়েট’ হয়েছে। এখন বাংলাদেশ বাছাই হলো। এর পরের ধাপ হলো আমাদেরকে ২০২১ সালের পরবর্তী মূল্যায়ন পর্যন্ত এই অবস্থা ধরে রাখতে হবে। তখন উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সুপারিশ করবে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল (ইকোসোক)। সেই সুপারিশ জাতিসংঘের সাধারণ সভায় অনুমোদনের পর উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা কার্যকর হবে ২০২৪ সালে । 
বাংলাদেশ এই পর্যন্ত আসলো স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর। মহাকালের তুলনায় এটি অত্যন্ত কম সময়, তবে ত্রিশ লক্ষ নরনারীর আত্মত্যাগে স্বাধীন হওয়ার একটি জাতির জন্যে একেবারে কম সময়ওনা । এই মর্যাদা আমাদের বহু আগেই অর্জন করার কথা ছিলো। তবুও আমাদের দেরি হলো । তার কারণ আছে । যুদ্ধক্লান্ত বিধ্বস্ত দেশে আমরা পদচলা শুরু করলাম এক জাতি, একভাষা, এককেন্দ্রীভূত স্বপ্ন আর একজন নেতা নিয়ে যাত্রা। নেতার কথা যখন আসলো তখন একটু বলে নিতে হয় । পৃথিবীতে এখনো বহুজাতি স্বাধীনতার স্পৃহায় যুদ্ধরত, বহু দশকেও কারো কারো বিজয় আজো অধরা। কারণ ভূরাজনীতির এই বিশ্বে স্বাধীনতা অর্জন করতে অনেকগুলো উপসঙ্গ লাগে । তার ভিতরে প্রথমেই যেটা লাগে একটি জাতির তা হলো, তাদের একজন নেতা লাগে। বাংলাদেশ হাজার বছর পরে তেমনি একজন নেতা পেয়েছিলো গত শতাব্দীতে। একটি জাতিতে একজন মহান নেতা ধুম করে জন্ম নিয়ে নেন না, যিনি মহাকালে আঁচড় দিয়ে যাবেন। পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং পরিপার্শ্ব যখন পরিপক্ক হয় তখন সময়ই তেমন নেতার জন্ম দেন। তেমন নেতা যিনি হন ইস্পাতদৃঢ়। যাঁর আঙ্গুলের ইশারায় একটি বৃক্ষসমজাতি জেগে উঠে আকাশের উচ্চতায়, দুর্বল ভীরু বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়। যাঁর সঠিক দিকনির্দেশনায় জাতি অতিক্রম করে যায় এক একটি সোপান। 

শুরুর পরেই কিন্তু সঙ্কট আসতে থাকলো। অর্থনীতি প্রায় শূন্য, হেনরি কিসিঞ্জার যাকে বলেছিলো, তলা বিহীন ঝুড়ি! রাস্তাঘাট অবকাঠামো বিধ্বস্ত। তার উপরে স্বাধীনতার পরপর এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। তারপরও খুব দ্রুতই রাষ্ট্র ঘুরে দাঁড়াতে লাগলো। কিন্তু মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায়ই রাষ্ট্র পড়লো মহাসঙ্কটে! ১৯৭৫ সালের পনের আগস্ট! একটি মহাবৃক্ষ ভূমিতে পড়লে যেমন ভূমি থরথর করে কেঁপে উঠে রাষ্ট্রের ভূমিও তেমনি কেঁপে উঠলো। রাষ্ট্র গন্তব্যের ঠিকানা হারিয়ে ফেললো। সেই থেকে রাষ্ট্রের পদে পদে ওতপেতে রইলো অপছায়া। তিনটি সফল সামরিক অভ্যুত্থান, প্রায় ত্রিশটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান, সান্ধ্য আইন, সেনা শাসন এবং চারটি ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে দেশটির কোমর ভেঙ্গে গেলো। রাষ্ট্রে চলতে থাকলো ভুল মানুষদের শাসনে। বিশ্ব অর্থনীতি আর রাজনীতির বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করেছিলো, দেশটি টিকবে তো, নাকি ভেঙ্গে পড়বে! সেই ‘তলা বিহীন ঝুড়ি’ আজ বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি মিরাকল। সবচেয়ে বড় শত্রু অর্থনীতিবিশারদও আজ বলছে বাংলাদেশের আগামি ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ইউরোপ আমেরিকার সমকক্ষ একটি দেশ হয়ে উঠার সম্ভাবনার প্রবল। 

এই অর্জনে আমরা বিস্মিত, আমরা অভাবিত। আমরা রাষ্ট্রের চালকদের বলবো, উন্নয়নের এই যাত্রা যেকোনভাবে অক্ষত রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলের শত্রু-মিত্র থাকতে পারে কিন্তু রাষ্ট্রের যেন তা না থাকে এটি আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম, একশ্রেণির লোক এই অর্জনকে বিভিন্ন তকমা দিয়ে নিপ্রভ করার কাজে নিয়োজিত । এটিও আমাদের দেশের একটি ঐতিহাসিক নিয়তি। প্রথমত, আমাদের স্বাধীনতায় এদেশেরই একটি ক্ষুদ্র অংশ প্রত্যক্ষভাবে বিরোধীতা করেছিলো। মুক্তিযুদ্ধে অপমানজনকভাবে পরাজিত পাকিস্তানী ভাবধারার এই অংশটি স্বাধীন দেশেও নিজেদের নিয়োজিত রাখলো রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার-প্রচারণায়। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক সেক্যুলার দলটি যখনই ক্ষমতায় গিয়েছে এরা নানান অপপ্রচারে লিপ্ত ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের পরপর এরা ছিলো চরম কোনঠাসা। সেই সময় এরা হাইবারনেশনে চলে যায়। কিন্তু তারা হাইবারনেশনে নিষ্ক্রিয় রইলো না। রাষ্ট্রের ভিতরে তারা মসজিদ, মাদ্রাসা, মোক্তব. খানকাশরীফসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আড়ালে নিজেদের ঢাকা দিলো। সহজ, সরল মানুষদের ধর্মীয় অনুভূতিকে তারা আস্তে আস্তে কুমন্ত্রণা দিয়ে বিভ্রান্ত করতে লাগলো। মানুষের দেশপ্রেমকে ধর্মের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে তারা সুক্ষ্ন কৌশল অবলম্বন করলো। আর রাখলো আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। সাড়ে তিন বছরের মাথায় রাষ্ট্র যখন দিকভ্রান্ত হলো তারা বের হতে শুরু করলো সামরিক উর্দির ছায়ায় মায়ায়। তারপর একুশ বছর মানুষকে বুঝালো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অসাম্প্রদায়িক দলটি ক্ষমতায় আসলে এদেশ আর মুসলিম দেশ থাকবেনা, ভারত হয়ে যাবে, মসজিদে উলু ধ্বনি শোনা যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। মানুষ ধর্মপ্রাণ, ধর্মকে ব্যবহার করে কোন কথা বললে সাধারণ মানুষের মন নরম হয় । একুশটি বছর রাষ্ট্র পড়ে রইলো পাকিস্তানী ভাবধারার মানুষদের হাতে। অবস্থা এমন হলো যে, রাষ্ট্রই বাঁধা দিতো প্রগতিতে, উন্নয়নে। স্বাধীনতাবিরোধী ধারাটি এই সময়ে ধনে মানে জনে বিকশিত হতে থাকলো । স্বাধীনতাবিরোধী সেই ধারাটি এলডিসি বেড়াজাল ছিন্নকরা এই অর্জনকে কখনোই অভিনন্দিত করবেনা।  

আরেকটি ধারা, যাঁরা এই অর্জনকে সহজে অভিনন্দিত করতে পারছে না, তারা হলো বাংলাদেশের বিভিন্ন তরিকার বামদলগুলো। এটিও একটি ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার। শুরুতে বামদলগুলো স্বপ্নের পথেই ছিলো, শিক্ষিত তরুণ যুবাদের আকৃষ্টও তাঁরা করতে পেরেছিলো। কিন্তু পলিমাটির এই দেশের মাটির ধারা তাঁরা বুঝতে পারলোনা। তাঁরা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলো প্রতিটি দেশেরই একটি জাতীয় আবেগ, অনুভূতি আর মেজাজ থাকে। অতীত আন্তর্জাতিক সফল বামবিপ্লবগুলোতে আচ্ছন্ন হয়ে তত্ত্বীয় রাজনীতিতেই তাঁরা বেশিরভাগ সময় ব্যয় করলো, ফলিত রাজনীতিতে তাঁরা হলো ব্যর্থ। এক তত্ত্বে একবিশ্ব চলতে পারলেও কৌশল এবং প্রয়োগ ভিন্ন হতে হবে; এটুকু বুঝতেও তাঁরা ব্যর্থ হলো। সেজন্যে তাঁরা রাজনীতিতে পরিপক্ক, দক্ষ হয়েও মানুষের নিকট হয়ে রইলো দুর্বোধ্য। পরিণামে জনগণ বামদের বুঝলোনা। তাছাড়া পাকিস্তানী ভাধারার রাজনৈতিকদলগুলো বামদেরকেও আক্রমনের বাইরে রাখলোনা। এদেরকে ধর্মহীন আখ্যা দিয়ে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের কাছে অশ্রদ্ধার পাত্র করে রাখলো । আর আন্তর্জাতিকভাবে কমিউনিস্ট দুর্গগুলোর পতন তাঁদের রাজনৈতিক স্বপ্নকে করলো স্তিমিত, স্তব্ধ, আশাহীন । 

এদেশে বামরাজনীতি করতো শুরু থেকেই শিক্ষাদীক্ষায়, জ্ঞানে-গরিমায় প্রাগ্রসররা। তাই তাঁরা তাঁদের রাজনৈতিক ভুলগুলো এখনো স্বীকার করেননা, আলোচনা সমালোচনা করেননা। সমালোচনা তাঁরা মানেনও না। বরং তাঁরাই সবার সমালোচনা করেন। তাঁরা এখনো নিজেদের রাজনৈতিক বাহ্মণ মনে করেন। এরাই সরকারের প্রতিটি সফলতা-উন্নয়নকে বিভিন্নক্ষেত্রের ত্রুটি বিচ্যূতির বেড়াজালে বেড়িয়ে নিপ্রভ করতে চেষ্টা করেন। বামরা মাঠের রাজনীতিতে ব্যর্থ হলেও মেধাবী হওয়ার কারণে হারিয়ে গেলোনা। তাঁরা বুদ্ধিভিত্তিক আলোচনা, অধ্যাপনা, গবেষণা, মিডিয়াতে নিজেদের নিয়োজিত করলেন। সেসব ক্ষেত্রে তাঁরা সফলও হলেন । সেসব মিডিয়ার বদৌলতে আজ সরকারের প্রতিটি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সফলতা, স্বীকৃত মুখোমুখি হয় অবজ্ঞা, অবহেলা আর হীনজ্ঞানের । 

আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করে থাকি, অনেকে বলে থাকেন উন্নয়ন দিয়ে কি হবে যদি দুর্নীতি দূর না হয়, যদি আয় বৈষম্য না কমে, যদি মানুষ সুখে না থাকে, দেশে খুন খারাপি না কমে কিংবা যদি দেশে গণতন্ত্র না থাকে। এগুলো সবই সত্য এবং ন্যায্য কথা । এগুলোও আমরা অবশ্যই অর্জন করবো । কিন্তু তাই বলে যতদিন এগুলো অর্জন না হচ্ছে ততদিন উন্নয়ন করবোনা-এটি কোন কাজের কথা না। এসব কথা সিরিয়াসভাবে মানুষের মাথায় ঢুকিয়ে দিচ্ছেন তাঁরা । এটি সত্য যে মানুষ যদি গ্রহন না করে তবে অনেক মহান অর্জনও অনেক সময় কোন কাজে লাগেনা। তাই ভালো কাজ যেমন করতে হবে, তেমনি ভালো কাজের প্রচারও করতে হবে। আর্য ঋষিরা বলে গিয়েছিলেন, ক্ষত্রিয় রাজার প্রধান ধর্ম প্রজার মনোরঞ্জন। প্রজা গ্রহণ না করলে রাজার রাজাত্বের মূল্য থাকেনা। এগুলো রাজতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র, গণতন্ত্র সবক্ষেত্রেই সত্য।

তাই প্রচারও লাগে । আমরা প্রায় সব বাঙালি জেনে আসছি, সুবাদার শায়েস্তা খানের শাসনামলে টাকায় আট মন চাল পাওয়া যেত। এটি যতটা না সত্য তারচেয়ে ঢ়ের বেশি প্রচার। কারণ শায়েস্তা খানের আমলে এদেশে টাকার প্রচলন খুব একটা ছিলই না। তখন সমাজের অল্প কিছু মানুষের কাছেই টাকা ছিল। বেশির ভাগ মানুষ তখন পণ্য দিয়ে পণ্য বিনিময় করতো। বিনিময় প্রথা প্রচলিত ছিল বলে টাকার কোনো প্রয়োজনও হতো না।  যে অর্থনীতিতে অধিকাংশ মানুষ মুদ্রা ব্যবস্থার বাইরে সেখানে অল্প পয়সায় অনেক জিনিষ পাওয়া যেতো এর দ্বারা কোনোভাবেই প্রমাণ হবেনা সে সময় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব ভালো ছিল। বরং সে সময় বহু মানুষ না খেয়েই থাকতো । আজকে আয় বৈষম্যের কথা বলা হয়, সে সময় ধনী এবং দরিদ্রের ব্যবধান ছিল অত্যন্ত প্রকট। ধনী গরিবের সম্পদের অসম ব্যবধান সব সমাজে, সবদেশে সবযুগেই ছিলো এবং এখনো আছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি সহায়তা সংস্থা অক্সফাম গতবছর প্রকাশিত এক সমীক্ষায় বলছে, বিশ্ব-জনসংখ্যার দরিদ্রতম অর্ধেক মানুষের সমান সম্পদ কুক্ষিগত রয়েছে মাত্র ৮ জন ধনী ব্যক্তির হাতে। এর আগে আমরা জেনেছি, বিশ্বের ১ শতাংশ মানুষের হাতে ৯৯ শতাংশ মানুষের সমান সম্পদ। অথচ বিশ্বের প্রতি ৯ জনের মধ্যে ১ জনের খালি পেটে ঘুমাতে যেতে হয়। প্রায় ১০০ কোটি মানুষ দারিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করছে। সত্য হলো এই অবস্থা আমাদের দেশেও আছে । এই অবস্থা প্রশমনের জন্যে রাষ্ট্রের কিছু করারও আছে ।

বর্তমান বিশ্বের দুই ধরণের অর্থনৈতিক দর্শন পরস্পর জিহাদরত। একটি হলো সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি। এই ব্যবস্থায় আয় বৈষম্য খুবই কম। তবে সমাজতন্ত্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, মৌলিক অধিকার থাকবেওনা, প্রতিবাদ করারও সুযোগ নেই। নিয়ন্ত্রিত বলে মুক্তজ্ঞান, সৃজনশীলতা, সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, প্রগতি হবে ধীরে ধীরে প্যারালাইজড। প্রতিযোগিতার অভাবে অর্থনীতি বিকশিত হবেনা। মানুষের ইতিহাস নিয়ম ভেঙ্গে নিয়ম গড়ার ইতিহাস, মানুষের ইতিহাস ছাড়িয়ে যাওয়ার ইতিহাস, রেকর্ডের পর রেকর্ড ভাঙ্গার ইতিহাস । সমাজতন্ত্রে এটি হয় অবরুদ্ধ । 

আবার পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মানুষ যা খুশি তা করতে পারে। অধিকার ভোগের বাড়াবাড়ি, মানবাধিকারের বাড়াবাড়ি, পুঁজিপতিদের মুনাফা বাড়ানোর বাড়াবাড়ি সমাজে বৈষম্য প্রকট থেকে প্রকটতর করে । টাকার একটি নিজস্র শক্তি আছে বলে ধনবানরা হয় নিরঙ্কুশ ক্ষমতাধর । পরিণামে সমাজে অসন্তোষ বাড়ে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রকে নীতিনির্ধারণ করতে হবে সম্পদের যথাসম্ভব সহনীয় বণ্টনে। বর্তমান বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ১৬১০ ডলার। রাষ্ট্রের সব আয়কে মানুষের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করে এটি বের করা হয়। এর অর্থ হলো, যার কাছে কানাকড়িও নেই তার মাথাপিছুও আয় ধরা হয় ১৬১০ ডলার। সব মানুষ সমানভাবে আয় করতে পারেনা। কিন্তু দেশটি সব মানুষের। তাই রাষ্ট্র ধনীদের থেকে সবচেয়ে বেশি কর আদায় করবে আর তা দিয়ে গরীবদের সহায়তা করবে। এটি হলো একটি কল্যানমুখী রাষ্ট্রের ধারণা। ইউরোপের বহুদেশ এই ধারণা মতো কাজ করছে। এই ধারণাটি আমাদের রূপকল্পে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। 

আর একটি ব্যাপার হলো দুর্নীতি। এটিও একটি সর্বব্যাপী সর্বযুগের সমস্যা। বলা যেতে পারে, পৃথিবীতে যেখানেই মানুষ আছে সেখানেই দুর্নীতি আছে। মানুষের একটি স্বভাব হলো মানুষ অতীতকে মহান করে দেখে, মৃতদের উপর দেবত্ব আরোপ করে। প্রাচীন রাজা বাদশাদের সম্বন্ধে বহু ভালো ভালো কথা বলা আছে । কারণ হলো প্রাচীন রাজাদের ইতিহাস লিখতো তাদেরই পরমায়েশি কবি, লেখকেরা। তাই মানুষ ভাবতে পারে সেসব আমল কতইনা সুখের ছিলো। তাছাড়া সেসব সময় রাজাদের বিরুদ্ধে এখনকার মতো সমালোচনাও করা যেতনা, করলে গর্দান যেত। তবুও ইতিহাস গলে বহু সত্য চলে আসে যুগ থেকে যুগে ।

দুর্নীতি আছে বলে অর্থনীতির কর্মচঞ্চলতা বন্ধ করে দিলে চলবেনা। কিন্তু দুর্নীতি কঠিন হাতে দমন করতে হবে । সরকারী কর্মচারীদের দুর্নীতির যোগ্যতার কথা না বললে তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। তারা সবযুগেই দুর্নীতিতে দক্ষ ছিলেন। চাণক্যের অর্থশাস্ত্রে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের সামাজিক, পারিবারিক, রাষ্ট্রীয়, আমলাতন্ত্র ইত্যাদির পরিচয় পাওয়া যায়। চাণক্য লিখেছেন, সরকারী কর্মচারীরা দুইভাবে বড়লোক হয়; হয় তারা সরকারকে প্রতারনা করে, অন্যথায় প্রজাদের অত্যাচার করে । চাণক্য বা কৌটিল্য সরকারী কর্মচারীদের চল্লিশ ধরনের দুর্নীতির কথা বলেছেন তাঁর অর্থশাস্ত্রে । এখন নিশ্চয় তাঁরা আরো বহুপ্রন্থা উদ্ভাবন করেছেন। দুর্নীতির কুফল সম্পর্কে সচেতন থেকেও চাণক্য সরকারী দুর্নীতিকে অনিবার্য মনে করতেন। ষোড়শ শতকের কবি মুকুন্দরাম লিখেছেন; সরকার হইলা কাল, খিল ভূমি লিখে লাল, বিনা উপকারে খায় ধুতি’। এখানে সরকার বলতে রাজস্ব কর্মকর্তাকে বুঝিয়েছেন কবি। মানে অনাবাদী জমিকে কর্ষিত জমি হিসেবে দেখাচ্ছে এবং ধুতি ঘুষ খেয়েও কর্মকর্তা সঠিক কাজ করছেনা। 
আমাদের বলার সুযোগ নেই সব সরকারী কর্মকর্তা দুর্নীতিবাজ। আমরা বলবো বেশিরভাগই ভালো। সেজন্যেই আমরা এতদূর এগুলাম। ৪৭ বছরে আমরাতো বহু বাঁধা পেয়ে এসেছি খোদ ভুলরাজনীতি থেকেই। মাঝখানের আগুন সন্ত্রাসের একটি বছর বাদ দিলে গত নয় বছরেই মানুষ ঠিকমতো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারলেন স্বস্তিতে। এরই মধ্যেই মানুষ তাদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন রাষ্ট্রকে। রাষ্ট্রও করেছে। দাতাদের আপত্তি উপেক্ষা করে কৃষিতে ভর্তুকি দিয়েছেন অকাতরে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে দিয়েছেন  ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করে । আর সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত নি:স্ব যে সেও নিজেকে ঢেলে দিয়েছেন দেশেবিদেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে, সরকারও দিয়েছেন পৃষ্ঠপোষকতা।

আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা, অর্থ অবশ্যই একটি কার্যকরী শক্তি। এই শক্তি অর্জনে রাষ্ট্রকে বাঁধা দেওয়া চলবেনা। এমনকি যারা গণতন্ত্রের কথা বলেন তাদেরও মনে রাখতে হবে রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে এগুলে গণতন্ত্রও দীর্ঘমেয়াদে সুসংহত হবে। এগুলো আমাদের আবেগের কথা নয়। এগুলো গবেষকদেরই কথা। Adam Przeworski হলেন একজন পোলিশ-আমেরিকান যিনি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির রাজনীতি বিজ্ঞানের একজন প্রফেসর। তিনি সংখ্যাতত্ত্বের সাহায্যে সামাজিক নিরীক্ষা করে দেখান, যেসব দেশের মাথাপিছু আয় এক হাজার ডলারের কম, সেখানে গণতন্ত্রের আয়ু পাঁচ বছরের কম এবং যেসব দেশের মাথাপিছু আয় ৪ হাজার ৩৩৫ ডলার, সেখানে কখনও গণতন্ত্রের অপমৃত্যু ঘটেনি। তাঁর গবেষণার সূত্রধরে আমরা বলতে পারি, আমরা বর্তমানে যে পথে আছি, এই পথেই আমাদের ক্রমমুক্তি হবে। আমাদের ভবিষ্যত সমৃদ্ধ গণতন্ত্রের জন্যেও আমাদের অর্থনীতির গতিতে বাঁধাহীন এগিয়ে যেতে দিতে হবে । 

নরওয়ের অর্থনীতিবিদ ফালান্ড ও ব্রিটিস অর্থনীতিবিদ পারকিনসন বলেছেন বাংলাদেশ একটি উন্নয়নের পরীক্ষাগার। তাঁরা তাঁদের, ‘বাংলাদেশ টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট’ নিবন্ধে লিখেছেন, এ রকম পরিস্থিতিতে যদি বাংলাদেশের উন্নয়নের উদ্যোগ সফল হয়, তবে পৃথিবীর যেকোন দেশেই এ ধরনের উদ্যোগ সফল করা যাবে। তাঁরা বলেছিলেন, বাংলাদেশে টেকসই অর্থনীতি অর্জন সম্ভব। আর এবার জাতিসংঘ বললো আমরা এলডিসি অতিক্রমে গ্র্যাজুয়েট করেছি ।

সরকার একটি রূপকল্পের স্বপ্ন দেখিয়েছিলো মানুষকে ২০১০-২১ । সেটি যথাযথভাবে রাষ্ট্র বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে আজ। ২০২১-শে আমাদের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ফূর্তি হবে। মনে পড়ে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০১৪ এর জন্য তৈরি নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ বলেছিলো, ‘আলোকোজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। শুরু হয়েছে দারিদ্র্য ও পশ্চাৎপদতা হতে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের ঐতিহাসিক কালপর্ব।’

আমরা তখন শিহরিত হয়েছিলাম । আমরা আবারও শিহরিত হতে চাই । ২০৪১ সালে আমরা হবো উন্নত বিশ্ব যেখানে আয় বৈষম্য হবে সহনীয়, হবো দুর্নীতিমুক্ত কল্যানমুখী সুষম একটি রাষ্ট্র । এই দু:সাহসী স্বপ্ন আমরা দেখতে চাই। সেজন্যে রাষ্ট্রের সকল কর্মকর্তা কর্মচারী, সকল সামরিক, আধাসামরিক, বেসামরিক বাহিনী এবং জনগণের মনের ভিতরে রূপকল্প-২০৪১ গেঁথে দিতে হবে। রূপকল্পের ব্যাপক প্রচার করতে হবে। এর জন্যে সরকারের সদিচ্ছার দলিল হিসেবে দুর্নীতিতে শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি গ্রহণ করতে হবে। ইতোমধ্যে ঘটে যাওয়া ব্যাংক কেলেঙ্গারিগুলোর বিচার করে দুর্নীতিবাজদের বার্তা দিতে হবে, এই দেশে এগুলো চলবেনা। তাহলেই মানুষ সারকারের উপর আস্থা রাখবে। একটি দেশের মূল শক্তি হলো তার জনগণ । সচেতন জনগণই ভবিষ্যতের যে কোন সঙ্কট মোকাবিলা করবে ।  

- সাংবাদিক ও কলাম লেখক

 


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top