Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ , সময়- ২:৫৪ অপরাহ্ন
Total Visitor: Projonmo Kantho Media Ltd.
শিরোনাম
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় গণসংযোগে মির্জা ফখরুল  বিতর্কিত সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ ও তাঁর রাজনীতি  প্রমাণিত হলো বিএনপি সন্ত্রাসী দল : কাদের  বিবাহবার্ষিকীতে দোয়া চাইলেন ক্রিকেট সুপারস্টার সাকিব টুঙ্গিপাড়া থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করলেন সভানেত্রী শেখ হাসিনা  খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা নিয়ে রিটের আদেশ আগামীকাল  মনোনয়নপত্র ফিরে পাচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিরো আলম নির্বাচনী প্রচার শুরু করবেন শেখ হাসিনা, ১২ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর যাচ্ছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য ২০১৫ থেকে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ২০৩০

পার্বত্য শান্তিচুক্তি শেখ হাসিনার এক অসাধারণ অর্জন


প্রজন্মকণ্ঠ অনলাইন রিপোর্ট

আপডেট সময়: ২ ডিসেম্বর ২০১৮ ৭:১৫ পিএম:
পার্বত্য শান্তিচুক্তি শেখ হাসিনার এক অসাধারণ অর্জন

আবদুল মান্নান, উপ-সম্পাদকীয় : ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর শেখ হাসিনা প্রথমেই  দীর্ঘদিনের তিনটি অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানে হাত দেন। এই তিনটি সমস্যা ছিল বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার বিচার রহিত করার জন্য সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা এবং ১৫ই আগস্টের ঘাতকদের বিচার করা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপরই এই আইনটি অধ্যাদেশ আকারে খন্দকার মোশতাক জারি করেন। জিয়া মোশতাককে ক্ষমতাচ্যুত করে বিলটি পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সূর্যসন্তান হিসেবে ডাকা হয়। দ্বিতীয় যে সমস্যাটি বঙ্গবন্ধুকন্যা উত্তরাধিকার সূত্রে পান তা হচ্ছে গঙ্গার পানিবণ্টন সমস্যা। ভারত গঙ্গার উজানে ১৯৬১ সালে মুর্শিদাবাদ জেলায় ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। গঙ্গা নদী বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পদ্মা নামে প্রবাহিত হয়। 

বাংলাদেশের সেচব্যবস্থা, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও নদীপথে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের জন্য পদ্মা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদী। উজানে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের কারণে ভাটি অঞ্চলে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭২ সালের জুন মাসে মুজিব-ইন্দিরা মৈত্রী চুক্তির মাধ্যমে গঙ্গার পানিবণ্টন সুষম করার জন্য একটি যৌথ নদী কমিশন গঠনের সিদ্ধান্তসহ শুকনো মৌসুমে পদ্মায় প্রয়োজনীয় পানি প্রবাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এটি ছিল একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। 

এই সমস্যাটি স্থায়ীভাবে সমাধানের আগেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তৃতীয় সমস্যাটি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের নৃতাত্ত্বিক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জমির মালিকানা, শান্তিপূর্ণ বসবাস আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার সমস্যা এবং চলমান এই সমস্যাটি প্রায় দুই দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে কয়েক হাজার মানুষের রক্তপাতের কারণ হয়েছে। ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল প্রায় এক লাখ স্থানীয় অধিবাসী, আর দেশ ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। স্বার্থ রক্ষার নামে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর সমন্বয়ে এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নামের একটি রাজনৈতিক সংগঠন ও তাদের সশস্ত্র অঙ্গসংগঠন ‘শান্তিবাহিনী’।

পাবর্ত্য চট্টগ্রামে মানবিক বিপর্যয় শুরু হয় ১৯৫৭ সাল থেকে, যখন পার্বত্য অঞ্চলে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ শুরু হয়। এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ উত্পাদন ও ভাটি অঞ্চলে সেচব্যবস্থা এবং চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে প্রথমে ১৯০৬ সালে কাপ্তাই পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক একটি ধারণাপত্র প্রস্তুত করা হয়। বাঁধ নির্মাণের মূল কাজ শুরু হয় ১৯৫৭ সালে এবং শেষ হয় ১৯৬২ সালে। বাঁধের কারণে যে স্থানে পানি ধারণ করার কথা, সে স্থানেই ছিল আদি রাঙামাটি শহর আর রাজবাড়ি। স্থানীয় অধিবাসীদের যা কিছু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, তা অনেকটা এই এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। বাঁধের কারণে এই পুরো শহরটিই পানির নিচে তলিয়ে যায়। যার ফলে প্রায় এক লাখ স্থানীয় অধিবাসী রাতারাতি ছিন্নমূল, উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। শুরুতে বলা হয়েছিল, এসব মানুষকে অন্য জায়গায় পুনর্বাসন করা হবে, তাদের জুম চাষের জন্য জমি দেওয়া হবে এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। কিন্তু তার কিছুই হয়নি। যার ফলে একসময় একটি জনপদে বংশপরম্পরায় বসবাস করা পরিবারগুলো রাতারাতি উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। বিশ্বের যেকোনো স্থানেই স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মানুষ সাধারণত স্বাধীনচেতা  হয় এবং নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখতে চায়। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের এই ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষগুলো তা করতে ব্যর্থ হয়। পাকিস্তান আমলের ষাটের দশকে ভারতের মিজোরামে শুরু হয় মিজো লিবারেশন ফ্রন্ট নামের এক সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতৃত্বে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এবং তাতে পূর্ণ সর্মথন জোগায় পাকিস্তান সরকার। মিজোদের নিয়ে গঠিত মিজো লিবারেশন ফ্রন্টের নেতা লালডেঙ্গাকে পাকিস্তান সরকার অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সহায়তা করে এবং তার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নির্বিঘ্নে পরিচালনা করার জন্য ঢাকার মতিঝিলে একটি অফিস পর্যন্ত খুলে দেয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে লালডেঙ্গার বাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তা করে এবং স্থানীয় কিছু অধিবাসীকে তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়। শান্তিপ্রিয় স্থানীয় অধিবাসীরা তখন কিছুটা হলেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার স্বাদ পায়, যা পরবর্তী সময় শান্তিবাহিনী নামের সশস্ত্র বাহিনী গঠনে সহায়তা করে। 

কাপ্তাই বাঁধ চালু হওয়ার পর থেকে এই এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ থেকে আরো খারাপ হতে থাকে। যদিও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে চাকমারা সংখ্যায় বেশি সেখানে আরো ১০টি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর অস্তিত্ব আছে। এই ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষগুলোর ভাগ্য পরিবর্তন করতে নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসেন তরুণ চাকমা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। তিনি পেশায় ছিলেন একজন আইনজীবী। শিক্ষকতাও করেছেন। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বিএ পাস করে চট্টগ্রাম আইন কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। চাকমাদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন সম্মানের পাত্র এবং অচিরেই স্থানীয় অধিবাসীদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। দেশ স্বাধীন হলে তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন দাবি করেন, যা সাংবিধানিকভাবে সম্ভব ছিল না। বঙ্গবন্ধু তাঁকে আশ্বস্ত করেন এই অঞ্চলের মানুষের অবস্থার পরিবর্তন করতে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন। মানবেন্দ্র লারমা এই সত্যটি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন যে একটি সদ্যঃস্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে রাতারাতি সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধুর কথায় আস্থা না রেখে মানবেন্দ্র লারমা তাঁর অনুসারীদের নিয়ে ভারতের পার্শ্ববর্তী রাজ্য মিজোরামে চলে যান এবং সেখানে ‘শান্তিবাহিনী’ নামে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তাঁকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। স্থানীয় ও মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তাও তিনি পেতে থাকেন। ১৯৭৭ সালে পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়, যখন জেনারেল জিয়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাস-ট্রাক ভর্তি করে  নদীভাঙা ছিন্নমূল মানুষকে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পুনর্বাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই মানুষগুলো পরিস্থিতির পরবর্তী ফল কী হতে পারে তা অনুধাবন না করে স্থানীয় অধিবাসীদের বাড়ি, ভিটা, চাষের জমি জোরপূর্বক দখল করা শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে এবং তাই হয়েছিল। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে জোরজবরদস্তিমূলক ব্যবস্থার আশ্রয় নেয়। রাতারাতি এই এলাকায় গড়ে ওঠে সেনানিবাস। বাড়ানো হয় বিডিআর ও আনসার-পুলিশের ছাউনি। সৃষ্টি করা হয় এক ভয়ের সংস্কৃৃতি। কয়েক পুরুষ ধরে যেসব সমতল ভূমির বাঙালি পাবর্ত্য অঞ্চলে বসবাস করছিল তারাও স্থানীয়দের কাছে সন্দেহের পাত্র হয়ে পড়ে। সবার নিরাপত্তা হয় বিঘ্নিত। রক্তপাত আর প্রাণহানি হয়ে ওঠে নিত্যদিনের ঘটনা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উত্থাপন করে। একসময় সরকার বুঝতে পারে সামরিক বা জোরপূর্বক এ ধরনের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে কর্নেল (অব.) অলির নেতৃত্বে শান্তিবাহিনীর সঙ্গে সমস্যা সমাধানের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিলেন, কিন্তু অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। কারণ উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থার ঘাটতি ছিল। এর একটি প্রধান কারণ হতে পারে এই যে খালেদা জিয়া যাঁদের সঙ্গে আলোচনা করেন, তাঁরা তো এটি জানতেন তাঁর স্বামী জেনারেল জিয়াই এ সমস্যার প্রধান কারণ। তিনিই এই অঞ্চলে সমতল ভূমির মানুষদের এনে তাদের বাড়িঘর ও জমিজমা দখল করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। 

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করে এই বাস্তবতাটি উপলব্ধি করেন যে দেশের এক-দশমাংশ এলাকা অস্থিতিশীল রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। শুরু থেকেই এ সমস্যার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান বের করার চেষ্টা করেন। শান্তিবাহিনীর সঙ্গে আলোচনার জন্য তিনি সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত আবদুল্লাহকে দিয়ে একটি কমিটি গঠন করেন। তিনি আরো একটি কাজ করেন, যা প্রশংসাযোগ্য। কিছু নাগরিককে নিয়ে তিনি একটি দল গঠন করেন, যারা পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম এলাকায় গিয়ে পাহাড়িদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করবেন এবং তাদের মধ্যে একটি আস্থার বোধ সৃষ্টি করবেন। এমন একটি দলে আমারও যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। বাহন ছিল হেলিকপ্টার। সেই হেলিকপ্টারে যেতে হয়েছিল দুর্গম অঞ্চল ঘুনধুম, আলীকদম, কালাপাহাড়, মারিশ্যা প্রভৃতি স্থানে। কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। নিচ থেকে হেলিকপ্টারে গুলি করার ঝুঁকি ছিল। যেসব মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল তারা অত্যন্ত সহজ সরল কিন্তু বেশ স্বাধীনচেতা। তাদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, পাহাড়ি অঞ্চলে তারাও শান্তি চায়, কিন্তু কোনো সরকারের ওপরই তারা আস্থা রাখতে পারেনি। তাদের বলি, আমরা বঙ্গবন্ধুর কন্যার পক্ষে এসেছি এবং তিনি নিজেই এই এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন চান এবং শান্তি ছাড়া এই উন্নয়ন সম্ভব নয়। মনে হলো তারা আমাদের কথায় কিছুটা হলেও আস্থা রাখতে পেরেছে। এরই মধ্যে আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর নেতৃত্বে শান্তিবাহিনীর প্রধান সন্তু লারমার (এরই মধ্যে মানবেন্দ্র লারমার মৃত্যু হয়েছে) সঙ্গে আলোচনা চলতে থাকে। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনা শেষে উভয় পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তি স্থাপন করতে একমত হয়। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই চুক্তি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সংসদে বিরোধী দলের নেতা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঘোষণা করেন, এই চুক্তি স্বাক্ষর হলে ফেনী নদী পর্যন্ত ভারতের অংশ হয়ে যাবে। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে তাঁর উপস্থিতিতে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ আর সন্তু লারমা এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এটি ছিল একটি আদর্শ চুক্তি। কারণ তা ছিল উভয় পক্ষের জন্য বিজয়ের (উইন-উইন) চুক্তি। এই চুক্তিতে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে  পৃথক সত্তা বলে স্বীকার করে নেওয়া হয়। এবং তাদের উন্নয়নের জন্য অনেকগুলো ব্যবস্থার কথা বলা হয়, যার অন্যতম ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম স্থানীয় সরকার কাউন্সিল ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ১৯৯৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে অস্ত্র সমর্পণ শুরু করে। সেদিনের অনুষ্ঠানেও আমার উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে তারা তাত্ক্ষণিক কোনো মন্তব্য না করে দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়ন চায়। তবে তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা, যেকোনো অবস্থায়ই পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসুক। অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানের সময় দেখা গেছে অনুষ্ঠান চলাকালে স্টেডিয়ামের এক কোণে কিছু তরুণ-তরুণী চুক্তিবিরোধী ব্যানার নিয়ে বসে ছিল। শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় ২০ বছর পরও এই গোষ্ঠী এখনো সক্রিয় এবং তারা বহুধাবিভক্ত। এলাকায় চাঁঁদাবাজি আর হানাহানি করা ছাড়া তাদের অন্য কোনো কাজ নেই।

যে সেনাবাহিনীর সঙ্গে একসময় স্থানীয় জনগণের একটা চরম বৈরী সম্পর্ক ছিল, দেখা গেছে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের সেই সম্পর্ক বর্তমানে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। সেনাবাহিনীর সহায়তায় পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। স্থাপিত হয়েছে স্কুল, কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাস্থ্যসেবা এখন মানুষের নাগালের মধ্যে। সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা বোধ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো। যেকোনো মানুষ স্বীকার করবে ২০  বছর আগের তুলনায় বর্তমানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। তবে এখনো চুক্তির অনেক শর্ত বাস্তবায়ন বাকি আছে বলে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারীদের একজন সন্তু লারমা প্রায়ই অভিযোগ করেন। সেসব দিকে সরকারের আরো দৃষ্টি দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। এই সম্পদ যেমন স্থানীয়দের কাজে লাগবে, ঠিক একইভাবে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শেখ হাসিনা তিন মেয়াদে দেশ ও জনগণের কল্যাণে অনেক যুগান্তকারী অর্জন করেছেন। তবে যে কাজটি দিয়ে তাঁর সাফল্যের কীর্তি শুরু হয়েছে তা হচ্ছে পাবর্ত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি। এবং এই চুক্তিটি কোনো তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়া করা হয়েছে। এটি তাঁর জন্য এক বিরল কৃতিত্ব।

লেখক : বিশ্লেষক ও  গবেষক


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top