Projonmo Kantho logo
About Us | Contuct Us | Privacy Policy
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০১৯ , সময়- ২:৪৬ পূর্বাহ্ন
Total Visitor: Projonmo Kantho Media Ltd.
শিরোনাম
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হলেন ফেরদৌস ও শাহ ফরহাদ নেতাজি'কে কেন রাষ্ট্রনায়কের মর্যাদা দেওয়া হল না, ক্ষুব্ধ মমতা সাংবাদিকদের একটা করে ফ্ল্যাট দেবে সরকার আ'লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর জনগণ শান্তিতে : কাদের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্ব ইজতেমা করার সিদ্ধান্ত ডাকসু নির্বাচন, আগামী ১১ মার্চ বিশ্ব চিন্তাবিদের তালিকায় এবার শেখ হাসিনা  যুবলীগ ও আ'লীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, গুলিবিদ্ধ ১০ গণতন্ত্র ও উন্নয়ন একসঙ্গে চলবে : প্রধানমন্ত্রী দুদকের পরিচালক সাময়িক বরখাস্ত

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে


আব্দুল বায়েস

আপডেট সময়: ৭ জানুয়ারী ২০১৯ ১২:০৬ পিএম:
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে

উপ-সম্পাদকীয় : মনে পড়ে, টিভি সিরিয়ালটির নাম ‘জয়ী’। ছোটখাটো একটা সংসারের বা খানার টানাপড়েনের গল্প। বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে নায়িকার নামেই নাটকের নাম। বোধকরি আরো বোধগম্য যে নানা বাধাবিপত্তি, হুমকি-ধমকি ও ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল তথা জীবনের সব ঝুঁকি উপেক্ষা করে, কখনো বেড়া ডিঙিয়ে দৃপ্ত পদভারে এগিয়ে যায় ‘জয়ী’। এবং সে একের পর এক জয়ী হতে থাকে। ব্যাপারটা এ রকম দাঁড়ায় যে একটা জয় হাতে পায় তো আরেকটা যুদ্ধ শুরু হয়। দু-একবার প্রতিপক্ষের  ষড়যন্ত্রে জীবন বিপন্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছিল বটে। একসময় এসে দেখা গেল বুদ্ধিদীপ্ত, সৃজনশীল ও মানবিক গুণে গুণান্বিত এই ‘জয়ী’ তার তির্যক সমালোচকদেরও সহযোগিতা এবং সমবেদনা কুড়াতে সক্ষম হয়। মোটকথা, সব ষড়যন্ত্রের জুতসই জবাব দিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম তার চলতেই থাকে, চলতেই থাকে। বোধ হয় সে জন্যই বলে, মুক্তির সংগ্রাম কখনো শেষ হয় না।

দুই. দেশ কিংবা সমাজও কিন্তু বড় পরিসরে একটা সংসার। এমনকি আমরা বলি জগৎ সংসার। অর্থনীতির  ভাষায়, খানা বা পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বলে মাইক্রো ইকোনমিকস আর দেশ তথা সমাজের অর্থনীতিকে বলা হয় ম্যাক্রো ইকোনমিকস। ইকোনমিকস যদিও রাজনীতিক বা সামাজিক উপাদান ছোট সংসারে যেমন থাকে, তেমনি থাকে বড় সংসারে। ছোট সংসারে সবই ছোট থাকে, বড় সংসারে বড়।

তিন. ঠিক এ মুহূর্তে বাংলাদেশ নামক দেশটির তথা সমাজের সংসারে একজন ‘জয়ী’ আছেন। তাঁর নাম শেখ হাসিনা, যিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের  কন্যা। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় শিশু রাসেলসহ বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবার। বিদেশ থাকার সুবাদে শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা বেঁচে যান। আশির দশকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে প্রয়াত পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের কঠিন চ্যালেঞ্জ কাঁধে তুলে নেন।

নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন শেষে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হলেন ১৯৯৬ সালে।  ক্ষমতায় বসে অনেকটা পরিকল্পিত উন্নয়নের ছকে, পঞ্চবার্ষিক উন্নয়নের ছাতার নিচে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও একই সঙ্গে সামাজিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অবহেলিত কৃষিকে মূলমঞ্চে আসন দেওয়া হয়। প্রথমবারের মতো ইকোনমিক গ্রোথ উইথ এ হিউম্যান ফেস বা ইনক্লুসিভ গ্রোথ পর্বের পর্দা ওঠে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মঞ্চে।

চার. ১৯৯৯-২০০১ সময়কালে জাবির ভিসি হিসেবে বিভিন্ন সময় তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়। প্রসঙ্গত, স্মরণীয় এমন একটা না বললেই নয় এই কথা বোঝানোর জন্য যে তাঁর চিন্তাভাবনা অসাধারণ এবং সম্ভবত সে কারণেই তিনি ‘জয়ী’। প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করে তাঁর আন্তরিক সম্ভাষণ আর অমায়িক মুখ দেখে আমার সেই সময়কার সব নার্ভাসনেস যেন নিমেষে উবে গেল। মনে হলো, দেশের প্রধানমন্ত্রী নয়, আমি একজন সাধারণ গৃহবধূর মুখোমুখি হয়েছি। আমার নার্ভাসনেস দূর করার জন্য কি না জানি না, তিনি মাথার আঁচল আরো একটু টেনে স্মিতহাস্যে বললেন,

‘আপনার অনেক লেখা আমি পড়েছি’।

এর পরের বক্তব্যটি ছিল আরো অনেক বেশি আশ্বস্ত করার মতো, হৃদয়গ্রাহী এবং স্টেটসম্যান লাইক, ‘যে দলেরই হোক, বিশৃঙ্খলাকারীদের কঠোর হাতে দমন করবেন। দরকার হলে সরাসরি আমার কাছে ফোন করবেন। আমি চাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা হোক।’

ভাবলাম, এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। এরই মধ্যে আমার নার্ভাসনেস দূর হয়েছে, কণ্ঠের জড়তা কেটে গেছে। একটু গুটিসুটি হয়ে বিনীতভাবে বললাম,

‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাই সুযোগ পেলেই সেখানে ছুটে যান। কিন্তু দেশে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে, সেগুলোতে আপনার যাওয়া উচিত নয় কি?’

বেশ জোরে একটা হাসি দিয়ে উত্তর দিলেন, ‘আমি কি কখনো যাব না বলেছি? নিশ্চয়ই যাব, যাব না কেন?’

‘তাহলে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জাবিতে আপনাকে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’

‘ঠিক আছে, আমি আপনার ক্যাম্পাসে যাব। দিন-তারিখ ঠিক করুন’, জানালেন প্রধানমন্ত্রী।

‘এবার বলুন, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে সমস্যাগুলো কী কী?’

আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটা লন্ড্রি লিস্ট তুলে ধরলাম, যার মধ্যে ছাত্র-ছাত্রী ও ক্যাম্পাসের সম্পদের নিরাপত্তার খাতিরে এর চারদিকে দেয়াল নির্মাণ অন্যতম ছিল।

‘দেয়াল কেন?’ প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন।

‘তা না হলে বহিরাগতরা বেশ বিরক্ত করে।’

‘তার চেয়ে বরং প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করুন—যেমন দিঘি বা পুকুর কাটুন। মাছ চাষও হবে, বহিরাগতদের অবাধ চলাচলও বাধাগ্রস্ত হবে।’

‘কিন্তু নেত্রী, মানুষ যে মাছ চুরি করে খেয়ে ফেলবে?’

‘আর তাতে কী? একটু-আধটু খাক না, তবুও তো প্রোটিন পাবে। তার পরও যা থাকবে তা আপনার জন্য কম হবে না।’

প্রধানমন্ত্রী জাবি ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। মনে পড়ে, শীতের মৌসুমে অতিথি পাখির আগমন তাঁর ভাষণকে কাব্যময় করে তুলেছিল। বললেন, যে ক্যাম্পাসে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে পাখি আসে, সে ক্যাম্পাসে যেন একটা গুলির শব্দ শোনা না যায়।

নদীতে পলি পড়ার মতো জীবনে অনেক আনন্দ মনে জমা হয়, যার মধ্যে কিছু হারিয়ে যায় আবার নতুন কিছু আনন্দ প্রতিস্থাপিত হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার অনুরোধে সাড়া দিয়ে জাবি ক্যাম্পাসে আসতে রাজি হয়েছিলেন, আমার মনে ওই আনন্দটা চিরস্থায়ী আসন গেড়ে বসে আছে।

পাঁচ. আগস্ট মাস যেমন তাঁর পরিবারের জন্য তেমনি তাঁর নিজের জীবনের জন্য কাল হয়ে কামড় দিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত সন্ত্রাসবিরোধী এক সমাবেশে জঙ্গি সন্ত্রাসীরা নৃশংস গ্রেনেড হামলা চালায়। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ওরফে ‘জয়ী’। ওই গ্রেনেড হামলার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তথা বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করা। সেই আক্রমণে হতাহত হয় অনেক; আজও শরীরে স্প্লিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছেন কেউ কেউ। কিন্তু কোনোকালেই মৃত্যুকে পরোয়া করেননি। মানুষের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়ন সাধনে প্রত্যয়ী তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকার গঠন করেন। সেই  সরকার  গঠনের মাত্র কদিনের মাথায় সরকার উত্খাতের লক্ষ্যে ঘটে   বিডিআর বিদ্রোহ, যা সামলাতে তিনি বেশ বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। 

তাঁর সরকারের শাসনামলে অর্থাৎ ২০০৯-২০১৪, এই পাঁচ বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ও সামাজিক নির্দেশকের ঊর্ধ্বমুখিতা বাংলাদেশকে উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হিসেবে পৃথিবীতে পরিচিতি দেয়। তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে ধাপে ধাপে উন্নয়ন। সন্ত্রাসের ও জঙ্গিবাদের আস্তানা ভেঙে শান্তির দুর্গ হিসেবে বাংলাদেশের স্বীকৃতি মেলে। ২০১৪ থেকে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের আগ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার গড়পড়তা সাত ছুঁই ছুঁই; দারিদ্র্যের হার নেমেছে ২০-২২ শতাংশে, সামাজিক নির্দেশকে প্রতিবেশী দেশ থেকে এগিয়ে থাকা এবং সবচেয়ে বড় কথা, কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে বৈশ্বিক মানচিত্রে মহিমাময়ী হিসেবে প্রচুর প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি ও তাঁর সরকার। বাংলাদেশকে একটা মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করা, তথা ২০৩০ সাল নাগাদ দারিদ্র্যমুক্ত  বাংলাদেশ গড়ার রূপকার আমাদের ‘জয়ী’ শেখ হাসিনা।  বঙ্গবন্ধু হত্যার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করে তিনি প্রমাণ করেছেন ‘জয়ী’ হতে হলে শুধু ভোট পেলে চলে না; নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতি কমিটমেন্ট থাকতে হয়। দেখাতে চেয়েছেন যারা বাংলাদেশের অস্তিত্ব অস্বীকার করে ৩০ লাখ শহীদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, ইজ্জত লুটেছে অসংখ্য মা-বোনের, তাদের বিচার না হলে বাংলাদেশের যেকোনো অর্জনই বৃথা। হলি আর্টিজানে হামলার পর তাঁর নেতৃত্বে সরকার যেভাবে জঙ্গিদের মোকাবেলা করে বিচারের আওতায় এনেছে, তা সারা দুনিয়ায় জঙ্গিবাদবিরোধী আন্দোলনকে উৎসাহ জুগিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে।

ছয়. ‘জয়ী’ সবেমাত্র সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে বিপুল ভোট ও আসনে জিতেছেন। অঙ্কের হিসাবে না-ই বা গেলাম কিংবা আপাতত স্থগিত রাখলাম বাদ-বিবাদের অংশটুকু। তিনি টানা তৃতীয়বারের মতো এবং চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। শুধু এতটুকু বলাই বোধকরি যথেষ্ট যে আগামী দিনগুলোতে ব্যাপক সংস্কার ছাড়া তাঁর রূপকল্পের বাংলাদেশ গড়া কঠিন হবে। মেগা প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বেগবান করবে সন্দেহ নেই, কিন্তু একটা দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যাপক ও বিস্তৃত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। বিশৃঙ্খল ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, আয়বৈষম্য রোধে কর কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনয়ন, বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের শাসন কাঠামোয় ব্যাপক সংস্কার এবং দেশব্যাপী সুশাসন নিশ্চিত করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখানো আশু করণীয় বলে মনে করি।

জয়তু ‘জয়ী’ শেখ হাসিনা। 

লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

abdulbayes@yahoo.com


আপনার মন্তব্য লিখুন...

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ন বেআইনি
Top