গণতন্ত্র, সুশাসন ও নির্বাচন   

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, উপ-সম্পাদকীয় : নির্বাচনের আমেজে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার মহাজোট সরকার তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসবে নাকি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন বিএনপির ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দল ক্ষমতা পাবে ? প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপ হয়েছে, ঐক্যফ্রন্ট সভা সমাবেশ করে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিএনপিকে, ২০ দলের ভেতর থাকা জামায়াতকে নির্বাচনে নিয়ে এসেছে।  তিনি হাল ধরেছেন বিএনপির। ঐক্যফ্রন্ট বলছে, অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ সাত দফা দাবি দিয়েছিল,তার কোনোটিই আদায় হয়নি। তবু তারা শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে এসেছে আন্দোলনের অংশ হিসেবে।

যাহোক, সবকিছু ছাপিয়ে এখন শুধুই নির্বাচনি উত্তেজনা। প্রতি পাঁচ বছর পর এমনটাই হয়, এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। বরং এবার একটু বেশিই। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একটা সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি অংশ না নেওয়ায় তা একতরফা হয়ে যায়। বিএনপি ও জামায়াত নির্বাচন প্রতিহত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। বহু স্কুল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, কোনও জনপদ নিরাপদ ছিল না। ফলে ভোটার অংশগ্রহণও আশানুরূপ হয়নি। তাই এবারের ভোট বড়  ভোট।

এ দেশে ভোটে জেতা মানে সব পাওয়া। যে হারে সে সব হারায়। তাই দলীয় মনোনয়ন কেনার উন্মাদনা দেখা গেলো এবার আরও বেশি করে। সব রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি এখন ভোটযুদ্ধে।

বাংলাদেশের বাতাসে একটা ভোট রোমাঞ্চ ফিরেছে। কিন্তু এই উৎসবের মঞ্চে শঙ্কাও আছে। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ভোটযুদ্ধের প্রস্তুতিতে একটু একটু করে জোর বাড়তে শুরু করেছে, তেমনি জনমনে তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা, বাদ-বিতর্কও শুরু হয়ে গেছে। নতুন সংসদে আওয়ামী লীগের উন্নয়ন আধিপত্য বজায় থাকবে নাকি ২০০১-এর পর হাওয়া ভবন কেলেঙ্কারি, একের পর এক জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান, সারাদেশে একযোগে বোমা হামলা, গ্রেনেড হামলা, একুশে আগস্টসহ নানা ঘটনায় খাদের কিনারে চলে যাওয়া বিএনপি-জামায়াত জোট স্বমহিমায় ফিরবে, এসবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। 

শেখ হাসিনার ১০ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যাপক আলোচিত। তবে তার এই আলোচিত দশকে সুশাসনের প্রশ্ন বারবারই উচ্চারিত হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের নিবিড় সম্পর্ক যেমন বড় জিজ্ঞাসা, তেমনি জিজ্ঞাসা হয়ে উঠছে হেফাজতে ইসলামের মতো কট্টর ইসলামি গ্রুপের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সখ্য।

নতুন এক বিরাট জনগোষ্ঠী এবার ভোট দিচ্ছে। গবেষণা ও উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিষ্ঠান কলরেডি বলছে, তরুণ প্রজন্মের ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ চায় বর্তমান সরকার আবার ক্ষমতায় আসুক। তরুণদের ৬৮ দশমিক ৩ শতাংশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। তবে জরিপে অংশ নেওয়া ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ তরুণ এই সরকারের দুর্নীতি নিয়ে অসন্তুষ্ট। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নতুন ভোটারদের ভাবনা শীর্ষক এক গবেষণা জরিপের ফলাফলে বলা হয়, জরিপে অংশ নেওয়া ৩০ দশমিক ২ শতাংশ তরুণ আসন্ন নির্বাচনে পরিবর্তন দেখতে চায় এবং ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ নির্বাচন বিষয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত এখনও নেননি। তরুণদের ১৫ দশমিক ৭০ শতাংশ চায় একটি দুর্নীতিমুক্ত সরকার,আর ১৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ চায় সুশাসনের সরকার।

নির্বাচনে শেখ হাসিনার প্রাধান্য কিছুটা হলেও বজায় থাকবে এমন ইঙ্গিতই উঠে এসেছে প্রায় সব আলোচনায়। বিদেশি অর্থায়ন ছাড়া নিজেই পদ্মা সেতুর মতো বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন যেমন আলোচনায়,তেমনি  শেখ হাসিনার এই দশটি বছর নিয়ে নানামুখী আলোচনা হতে পারে। উন্নয়ন হয়েছে, মানুষের আয় ও ব্যয় সক্ষমতা বেড়েছে, বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে নানা কারণে ইতিবাচকভাবে আলোচিত। পুরো দশটি বছরই শেখ হাসিনাকে সবচেয়ে বেশি মোকাবিলা করতে হয়েছে সন্ত্রাস ও সহিংসতা। যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে গিয়ে তাকে যে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে, তা ছিল ভয়ঙ্কর।

দ্য ইকোনমিস্টসহ যারা নানা কিছু লিখছে এই দেশ নিয়ে, পশ্চিমা কোনও দেশকে কি স্বাধীনতাবিরোধী মানবতাবিরোধী অপরাধীর বিচার করতে, খুনের বিচার করতে গিয়ে সশস্ত্র যুদ্ধের মোকাবিলা করতে হয়েছে? এ যেন ছিল আরেক ১৯৭১। রাজনৈতিক সহিংসতা কত ভয়ানক হতে পারে তার নজির দেখেছে মানুষ, যখন তারা মাসের পর মাস পুড়েছে পেট্রোলবোমা নামের আগুন সন্ত্রাসে। এই যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিরোধিতা থেকেই শুরু হয় জঙ্গি উত্থান, যার বড় আক্রমণ ছিল গুলশানের হলি আর্টিজান ক্যাফেতে হামলা করে বিদেশি হত্যা। অবশ্য এর আগে থেকেই মুক্তমনা লেখকদের হত্যার পাশাপাশি চলছিল বিদেশি নাগরিক হত্যা। পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত দক্ষতায় শেষ পর্যন্ত সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছে। শেখ হাসিনার প্রশাসন ও পুলিশের নামে যারা বদনাম করেন, তাদেরও মুখ কার্যত বন্ধ হয়েছিল একের পর এক জঙ্গি খতমে।

ডিসেম্বরের মধ্যেই মানুষ রায় দেবে নৌকা না ধানের শীষ তারা চায়। অনেকের ধারণা,২০০৮’র মতো না হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার মহাজোটের আধিপত্য থাকবে। এই ধারণার পেছনে আছে বাস্তবতা। গত দশ বছরের শাসনে তিনি দেশের সর্বস্তরে যে বিপুল উন্নয়ন ঘটিয়েছেন, সেসব তো কেউ আজ অস্বীকার করতে পারছে না। আর এই উন্নয়নের সুবাদে ব্যক্তি শেখ হাসিনা যে বিপুল জনসমর্থন পেয়েছেন এবং পেয়েই চলেছেন সেটাই নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে ভোটে।

তারপরও ড. কামাল হোসেন হাল ধরার পর আরেক প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও তার মিত্র জামায়াত ধরে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। দেশব্যাপী একটা লড়াইয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সে লড়াই সুস্থ হোক, স্বাভাবিক হোক, সেটাই এখন মানুষের চাওয়া।  সুশাসন আসুক, গণতন্ত্র আসুক, গণতন্ত্রের ধারায় যেন জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী শাসন আসুক।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা 

পাঠকের মন্তব্য