নির্বাচনে বাংলাদেশের গণমাধ্যম : সেকাল কিংবা একালের ‘স্বাধীনতা'

এখন গণমাধ্যমের ছড়াছড়ি ৷ গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি যা-ই হোক না কেন, মোদ্দা কথা, ভোক্তার চেয়ে বেশি পত্রিকা, টেলিভিশন এবং অনলাইন৷ এই পরিস্থিতিতে একাদশ জাতীয় নির্বাচন ক্রমশ এগিয়ে আসছে৷ ভুলে গেলে চলবে না, এইবারই প্রথম দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের আবহ তৈরি করা হয়েছে এবং এই অবিশ্বাস্য পরিবর্তনটি বাংলাদেশে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে৷ এ পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের জন্য কাজ করার জায়গা বের করা সম্ভব হবে কিনা সেটিই ছিল পুরো সময়ের আলোচনার বিষয়৷

বিগত সাধারণ নির্বাচনকালীন গণমাধ্যমের ভূমিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, বরাবরই সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার পরিবেশ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করা হয়েছে৷ মূল দু'টি দল, তথা জোটের সংবাদ পরিবেশনে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের দরকার পড়েনি৷ তবে ভারসাম্য রক্ষা করে উভয়দলের নেত্রীদের একইরকমভাবে হাজির করার চেষ্টা ছিল৷ বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য, দলগুলোর কর্মকাণ্ড, এমনকি তর্কবিতর্ক তোলারও চেষ্টা করেছে৷ তবে এখানে একটু বড় ‘তবে' রয়েছে৷ 

মূল দুটি দল, তথা জোটের সংবাদ পরিবেশন করেছে, তবে এইবার দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের কারণে সেই চেষ্টায় ভাটা পড়ে থাকতে পারে, কেননা, গণমাধ্যমের টিকে থাকার, সুনজরে থাকার বিষয়গুলো এখন প্রবল৷

‘অনেকক্ষেত্রে সাংবাদিকতার সাধারণ নৈতিকতাও মানা হচ্ছে না’

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার ‘এথিকস’ কতটুকু মানা হয়? আর নীতিহীন সাংবাদিকতার বিস্তারের কারণই বা কী? প্রশ্ন উঠেছে সাংবাদিকদের দলবাজি নিয়ে৷ আছে আর্থিক অসততা ও মালিকপক্ষের স্বার্থরক্ষার অভিযোগ৷ 

অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা স্বাধীন মত প্রকাশের অন্তরায়

সংবাদপত্র বা ব্যাপক অর্থে গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ, যার কাজ হলো সরকারের জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করা আর সরকারের দায়িত্ব হলো দায়িত্বশীল গণমাধ্যমগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখে নেওয়া তাদের কাজের জায়গাগুলো ঠিক আছে কিনা৷ দুজনে পরস্পরের শত্রু তো নয়ই, জরুরি সম্পর্কের মধ্যেই থাকে৷বাংলাদেশের গণমাধ্যম বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন হয়ে পরবর্তীতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নথিবদ্ধ করতে ভূমিকা পালন করেছে৷ তবে সংবাদ পরিবেশনে ভুল হলে সেটিও নিজেরা উল্লেখ করার মতো মেরুদণ্ড থাকতে হবে৷

বর্তমান সময়ে একটি বাক্য প্রায়ই শোনা যায়, ‘‘আমরা কোনো হস্তক্ষেপ করি না, ‘গণমাধ্যম অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে৷'' এসব বাক্য রোজকার কাজে সারাক্ষণ  টোকা দিতে থাকে৷ তার মানে, চাইলে হস্তক্ষেপ সম্ভব৷ এবং কার দেওয়া স্বাধীনতা ভোগ করছে? একথা সুস্পষ্ট, মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকলে তবেই ব্যক্তি স্বাধীন৷ কিন্তু বিরুদ্ধ মতকে (বিরোধী দল অর্থে নয়) একেবারেই মাথাচাড়া দিতে না দেওয়া, কেউ লাইনের বাইরে আলাপ তুললে তাঁকে তাঁর লাইনটা আবার চিনিয়ে দেওয়া, একবার শিক্ষা দিলে আর যেন মুখ খুলতে না চায় এসবই এই প্রক্রিয়োর অন্তর্গত৷

একটা সময় ছিল, যখন টেলিফোনেও সংবাদপত্র বন্ধ করা যেতো৷অতীতে একটা সময় ছিল, বিশেষ ক্ষমতা আইনে যে-কোনো সময় দুই লাইনের একটি আদেশ জারি করে যে-কোনো গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া যেতো৷ কিন্তু বর্তমানে গণমাধ্যম বন্ধ করার কোনো আইনি প্রক্রিয়া নেই৷ কিন্তু তাই বলে কি গণমাধ্যম স্বাধীন? গণমাধ্যমের উপস্থাপনা দেখে বোঝা যাবে গণমাধ্যম আসলে ‘দৃশ্যত' স্বাধীন৷ স্বাধীনতা হলো একটা বোধ৷ কেউ দিয়ে দিচ্ছে বা আপনি নিজেকে স্বাধীন ভেবে নিচ্ছেন এ দুয়ের মধ্যে এর বাস সম্ভব না৷আপনি যথেষ্ট স্বাধীনতার সাথে আপনার কথা চাইলেই বলতে পারেন সেই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার নাম স্বাধীনতা৷এরকম কোনো স্বাধীনতা আদৌ বিরাজমান নয়৷ তাই বলে কি কেউ সারাক্ষণ নিষেধাজ্ঞা জারি করছে? তেমনটা হওয়ার সুযোগ বর্তমান সময়ে নেই৷ এখন সরাসরি কিছু হয় না৷ প্রযোজনে অদৃশ্য নিষেধাজ্ঞা একটা জারি থাকে, এ নিয়ে লেখার শেষের দিকে আলোচনা করতে চাই৷

যা কিছুই গণমাধ্যম হাজির করে তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে৷ প্রতিটি গণমাধ্যম এবং তাদের সাথে জড়িত মালিক, পরিচালনা পর্ষদ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের৷এবং তার পত্রিকা টেলিভিশনের অনুমতি প্রাপ্তি থেকে শুরু করে এর চলার পথ পুরোটাই সরকারের হাতে থাকায় পরবর্তীতে তাদের  ‘কথা শুনে চলা' জরুরি হয়ে ওঠে৷ এই পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি মেনে নিয়ে যতটা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ হাজির করা যায় সেই চেষ্টা সাংবাদিকের থাকতে হবে৷ লড়াইটা আজীবন সেখানেই৷

ফেইক নিউজ-পেইড নিউজ: নতুন চ্যালেঞ্জ

গণমাধ্যমের নীতিহীনতায় এ সময়কালে নতুন সংযোজন ফেইক নিউজ ও পেইড নিউজ৷যখন কিনা আপনার সামনে নিবন্ধিত গণমাধ্যম ছাড়াও অনলাইনের হাতছানি আছে, তখন যে-কোনো এক উপায়ে প্রপাগান্ডা মেশিন হিসেবে এ দুইয়র চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে! আশঙ্কা করা হচ্ছে,  এবারের জাতীয় নির্বাচনে সে মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে৷ পেইড নিউজ মানে মূলত অর্থের বিনিময়ে প্রার্থীদের পক্ষে তথ্য দিয়ে ইতিবাচক রিপোর্ট আর বিরোধী প্রার্থীর বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতিবেদন হাজির করা৷ ভোটারকে বিভ্রান্ত করে এ ধরনের নিউজ একপ্রকার প্রতারণা হলেও এর সাথে বিশাল অঙ্কের টাকা জড়িত৷ফেইক নিউজ বা পেইড নিউজের সাথে মোটা দাগে মূলধারার গণমাধ্যম সম্পৃক্ত না থাকলেও প্রভাব পড়ে তাদের ওপর৷ অন্তত ফেইক নিউজটি যে ফেইক এটির পিছনে তাদের সময় ব্যয় করতে হয়৷

যখন কিনা গণমাধ্যম সংখ্যাগত দিক থেকে বিপ্লব ঘটাতে চলেছে, তেমন একটা সময়ে এসে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলা এবং আসলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনোদিন ছিল না, এখনো নেই– এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া বড় উপহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে৷ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাপারে আমাদের সবার মনে সংশয় ও আশঙ্কা রয়েছে৷ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বলতে কী বোঝায় তার  বোঝাপড়া গণমাধ্যমের থাকতে হবে৷ আমার যতটুকু প্রয়োগ করব, করার সাহস আছে, তা-ই স্বাধীনতা৷ কবে ছিল এসব বলার স্বাধীনতা? এই মুহুর্তে আওয়ামীলীগের নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি মিডিয়া উপকমিটি হয়েছে, যেখানে প্রথম সারির টেলিভিশনের সাংবাদিকরা সদস্য, সেই পরিস্থিতির ভিতর সাংবাদিকরা ঠিক কতটা জায়গা পাবে সাংবাদিকতা করার, বা পেলেও সেটা দৃশ্যত পাওয়া হবে কিনা সেসব প্রশ্ন নিয়ে সামনের দিকে এগুচ্ছে৷

সময়ের সাথে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

সরকার যখন মুখ বন্ধ করতে চায়, তখন সে এমন আইনের আশ্রয় নেয় যার মাধ্যমে সে ভয় জারি রাখতে পারে৷ হয়তো সকলের প্রতি সেই আইন প্রয়োগ করবে না, কিন্তু ভয়টা ঢুকিয়ে দেওয়াগেলে অর্ধেক কাজ শুরুর আগেই হয়ে যায়৷১৯৭৫ সালের পর দীর্ঘসময় সামরিক শাসনে থাকা বাংলাদেশ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে গণতান্ত্রিক মুডে আসে৷ ১৯৭৫-এ বা পরবর্তীতে গণমাধ্যমকে সামরিক সরকার যেভাবে পরিচালনা করতে চেয়েছে সেটি বলে দিলেই কাযকর করতে হতো৷ আর এখন এই ‘বলে দেওয়ার' প্রবণতাও দরকার পড়ে না, যখন কিনা আপনার ঘাড়ের ওপর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো একটি অস্পষ্ট আইন থাকে, যে আইন কাকে ধরবে আর কাকে ধরবে না, তা বলা সম্ভব না, তখন সবাই সাবধানি হয়ে ওঠে প্রয়োজনের ভিতরে কিংবা বাইরে৷

বেড়েছে গণমাধ্যম, বেড়েছে সেল্ফ সেন্সরশিপ

গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতা কিংবা স্বাধীনতার কথা বলতে পারি কিংবা ইতিহাস থেকে উদাহরণও দিতে পারি৷ কিন্তু সত্যিকার অর্থে এসব কথা খুব বেশি আমলে নেওয়া যাবে না৷ বাস্তব কথা হচ্ছে, মিডিয়া যে জায়গায় থাকার কথা, সেখানে নেই, জনগণ মিডিয়ার সঙ্গে নেই৷ মানুষ সব দেখছে, শুনছে, কিন্তু তাঁদের অংশগ্রহণ না থাকায় তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছে না৷ কেবল এখন না, গণমাধ্যম তার ব্যবসা টিকিযে রাখতে এই পুঁজিবাজারের সময়ে সবসময়ই নিজেই নিজেকে থামিয়েছে৷ কী ছাপা যাবে বা যাবে না, সে নিয়ে অন্য কেউ বাধা দেওয়ার আগেই কোনটি ছাপলে তার সমস্যা হবে, সেটা ঠিক করে নিয়ে ‘না ছাপা'র সিদ্ধান্তে এসে গেছে গণমাধ্যম৷ আর এখানে নিজের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই সাংবাদিকদের৷ গণমাধ্যম যখন ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং গণমাধ্যম যখন রাজনীতিক আদর্শের বলি হবে, তখন সে আর জনগণের কথা চাইলেও বলতে পারবে না৷ 

বিশেষ সুবিধা হাসিলের জন্য, চক্ষুশূল হয়ে যাওয়ার ভয়ে আগেভাগেই সংবাদ সেল্ফ সেন্সরে চলে যাওয়ার সবকটি সম্ভাবনা সক্রিয় আছে৷ ফলে সংখ্যাগতভাবে যতই টেলিভিশন বাড়ুক, সংবাদপত্রের ছড়াছড়ি হোক, সংবাদই যদি কাটা পড়ে, তাহলে এই ‘সংখ্যা-বিপ্লব' আসলে কোনো কাজের হবে না৷

পাঠকের মন্তব্য