বিক্রেতারা নতুন নতুন মুখ

এখনো সীমান্ত ডিঙিয়ে ‘ইয়াবা’ ঢুকছে টেকনাফে

‘ক্রসফায়ার’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’, সাঁড়াশি অভিযান, মামলা, আত্মসমর্পণ- সবই চলছে ইয়াবা সাম্রাজ্য টেকনাফে। তবু বন্ধ হয়নি ইয়াবার ব্যবসা। এখনো ইয়াবা আছে। এখনো সীমান্ত ডিঙিয়ে ইয়াবা ঢুকছে টেকনাফে। নানা হাতবদল হয়ে যাচ্ছে নেশাখোরদের হাতে। সেখান থেকে কাঁচা টাকা লুটে নিচ্ছেন আড়ালে থাকা ইয়াবা ব্যবসায়ীরা। তবে আগের চেয়ে ‘উষ্ণতা’ কমেছে ব্যবসার। 

এখন কেউ প্রকাশ্যে ইয়াবা বিক্রি করছে না, করছে গোপনে। আর বিক্রেতারা নতুন নতুন মুখ। বিভিন্ন সংস্থার তৈরি টেকনাফের ইয়াবা ব্যবসায়ীদের যে তালিকা ইতিমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে তার বাইরে আরও অন্তত ২৫০ জন নতুন ব্যবসায়ীর নাম পেয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে কমপক্ষে ৩০ জন বড় মাপের ইয়াবা ব্যবসায়ী। যারা এত দিন পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরের বাইরে ছিলেন। তাদের একটা নতুন তালিকা ইতিমধ্যে তৈরি করেছে পুলিশ প্রশাসন। 

ইয়াবা ব্যবসার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে।

গত বছরের মে মাসে শুরু হওয়া মাদকবিরোধী অভিযানের পর থেকে এ পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় ‘ক্রসফায়ার’ ও ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছেন অন্তত ৪১ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী। এর ৩৯ জনই টেকনাফের অধিবাসী। রয়েছেন বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নাগরিকও। টেকনাফে ইয়াবা ব্যবসার ইতি টানতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর প্রায় নয় মাস ধরে যে-যার মতো করে অভিযান চালাচ্ছে কিন্তু লাগাম যেন টেনে ধরাই যাচ্ছে না। এ অবস্থায় গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের দিকে কক্সবাজারের পুলিশ প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তন আনে সরকার। 

বিশেষ করে মাদকের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেকনাফের পুলিশ প্রশাসনে রদবদল ঘটানো হয়। তার পর থেকে প্রায় চার মাস টেকনাফে চলছে অভিযান। পুলিশের এমন সাঁড়াশি অভিযানের কারণে এলাকায় টিকতে না পেরে আত্মগোপন করেন বড় বড় ব্যবসায়ীরা। দুর্বল হয়ে পড়ে তাদের নেটওয়ার্ক। আর তাতেই প্রকাশ্যে ইয়াবা ব্যবসা অনেকটা কমে আসে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টেকনাফে ইয়াবার ব্যবসা অনেক কমে এসেছে। শতাংশের হিসাবে বলতে পারেন ৬০ ভাগ কমে এসেছে। পুরোপুরি বন্ধ করা বেশ কঠিন জানিয়ে ওই কর্মকর্তা আশা প্রকাশ করে বলেন, যদি চিহ্নিত ও তালিকাভুক্ত বড় ইয়াবা কারবারিরা আত্মসমর্পণ করেন তাহলে ইয়াবা ব্যবসা ২০ শতাংশে নেমে আসবে।

স্থানীয় পুলিশের একাধিক সূত্র জানান, ইয়াবার ব্যবসা যে একেবারে বন্ধ হয়নি তারা তা বুঝতে পারছেন। দুটি কারণে এখনো ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে। এর একটি হচ্ছে, আগে থেকে আনা ইয়াবা এখনো কারবারিদের কাছে মজুদ আছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, সীমান্ত গলিয়ে এখনো কিছু কিছু ব্যবসায়ী ইয়াবা আনছেন। টেকনাফের স্থানীয় সূত্রগুলো জানান, টেকনাফে এখন যারা ইয়াবা ব্যবসা করছে তারা একেবারেই অপরিচিত মুখ; এদের বয়স ১২ থেকে ১৫/১৬ বছর। আত্মগোপনে থাকা ইয়াবা কারবারিরা এখন এদের ব্যবহার করছেন। তাই প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যায় না ইয়াবা কেনাবেচা। সূত্র জানান, টেকনাফের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে এখনো ইয়াবা ঢুকছে। তবে সেটা বেশ কৌশলে আর অতি গোপনে। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা সীমান্তরক্ষীদের সোর্সদের ব্যবহার করছেন দরকষাকষির জন্য। 
ভোররাতে নাজিরপাড়ার সীমান্ত দিয়ে ২ লাখ ৩৪ হাজার পিস ইয়াবার একটি চালান ঢোকে টেকনাফে। 

এর মালিক নাজিরপাড়ার রমজান আলীর ছেলে মো. তাহের। নাজিরপাড়ার স্থানীয় বেশ কয়েকজন যুবক জানান, মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার এ চালানটি নিরাপদে পার করতে তাহের যোগাযোগ করেন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) স্থানীয় সোর্স নুর মোহাম্মদ (বশর) ও নুর মোহাম্মদ মংগিরির সঙ্গে। তাদের মাধ্যমে চূড়ান্ত দরকষাকষির পর তাহের ১ লাখ ৭০ হাজার পিস ইয়াবা ঘাট দিয়ে নিয়ে যান। বাকি ইয়াবার মধ্যে ২০ হাজার পিস পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার দেখিয়েছে বিজিবি। আর ৪৪ হাজার পিসের কোনো হদিস নেই। এ নিয়ে তাহেরের সঙ্গে বিজিবি সোর্সের বাগ্বিত চলছে দুই দিন ধরে। তাহের তার বাকি ৪৪ হাজার পিস ইয়াবা ফেরত চাচ্ছেন। এ ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়রা জানান, প্রশাসনের এত কঠোর অভিযানের মধ্যে এভাবেই থেমে থেমে টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ঢুকছে।

জানা গেছে, এই তাহেরকে ধরতে তার বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও ইয়াবার ব্যবসা চলছে বলে স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে। ইয়াবা ব্যবসায়ীরা এখন রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করছেন। রোহিঙ্গাদেরও যোগসূত্র রয়েছে। তবে শোনা যায় এর পক্ষে জোরালো তথ্য পাওয়া যায়নি।

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক সোমেন ম ল বলেন, ইয়াবার চালান আসা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। এখনো আসছে, তবে পরিমাণে খুব কম। তিনি জানান, এ মুহূর্তে টেকনাফ সীমান্ত ছাড়াও মহেশখালী, আনোয়ারা, বাঁশখালী, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীসহ কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে এসব চালান আসছে। বেশ কয়েকটি ধরাও পড়েছে।

টেকনাফের স্থানীয় প্রশাসনসূত্রে জানা গেছে, ইয়াবা ঢোকে উপজেলার নাজিরপাড়া, বাহারছড়া ঘাট, খুরের মুখ, মুন্ডার ডেল, মহেশখালী ঘাট, শাপলাপুর ঘাটসহ অন্তত ১০টি পয়েন্ট দিয়ে।

পাঠকের মন্তব্য