আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ডাকসু নির্বাচন

টানা তিন দশক পর আগামী ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে তফসিল ঘোষিত হয়েছে নির্বাচনের। সেখানে ডাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আবাসিক হলেই ভোটকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

এ সিদ্ধান্তে ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর ভেতরে তৈরি হয়েছে দুটি পক্ষ। এক পক্ষ এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে, আরেক পক্ষ এর বিরোধিতা করছে। আবাসিক হলে ভোটকেন্দ্র রাখার পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি নিচ্ছে। এদিকে হলে ভোটকেন্দ্র রাখার বিষয়ে প্রশাসনও অনড় অবস্থানে রয়েছে। সব মিলিয়ে ডাকসু নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ভোটকেন্দ্র। অবশ্য ছাত্র সংগঠনগুলো প্রার্থিতা নির্ধারণের জন্য নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনাও চালাচ্ছে।

এর আগে ২৯ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় ডাকসু নির্বাচনের গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করা হয়। সেখানে নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র আবাসিক হলগুলোতেই স্থাপনের সিদ্ধান্ত অপরিবর্তিত থাকে। এরপর ছাত্রদল, প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ভোটকেন্দ্র একাডেমিক ভবনে স্থাপনের দাবি জানায়। অন্যদিকে ছাত্রলীগের নেতৃত্বাধীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে আবাসিক হলেই ভোটকেন্দ্র রাখার প্রস্তাব করে। ভোটকেন্দ্রের পাশাপাশি ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থানের বিষয়ও এ নির্বাচনের অন্যতম ইস্যু। তবে সহাবস্থানের ব্যাপারে সম্প্রতি কিছুটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। 

হলে ভোটকেন্দ্রের পক্ষে যারা : ডাকসু নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র হলে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বেশ কয়েকটি ছাত্র সংগঠন। ছাত্রলীগ নেতৃত্বাধীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদের ব্যানারে টিএসসি-ভিত্তিক ২২টি সংগঠনও এর পক্ষে রয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সংবাদ সম্মেলন করে ডাকসুর ভোটকেন্দ্র আবাসিক হলে করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে তারা। 

তাদের সঙ্গে ছাত্রলীগও একাত্মতা প্রকাশ করেছে। 

ভোটকেন্দ্র নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে কোনো শঙ্কা নেই বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্র হলের ভেতরে হওয়ার ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ। শুধু ছাত্রলীগ নয়, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্তর্ভুক্ত আটটি ছাত্র সংগঠন ও টিএসসি-ভিত্তিক সব সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এটিকে স্বাগত জানিয়েছে। তার মতে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা থেকে একটি 'নন-ইস্যু'কে 'ইস্যু'তে পরিণত করার চেষ্টা করছে তথাকথিত বামপন্থি সংগঠনগুলো। সবার দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে ডাকসু নির্বাচনকে সার্থক করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির সভাপতি এস এম রাকিব সিরাজী বলেন, তারা চান না কোনো বিতর্কের কারণে ডাকসু নির্বাচন বন্ধ হয়ে যাক। ঐতিহ্যগতভাবেই ডাকসু নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র আবাসিক হলগুলোতে হয়ে আসছে। এমন নয় যে, আগে একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র ছিল এখন হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই চাচ্ছেন ভোটকেন্দ্র হলে হোক। টিএসসি-ভিত্তিক সব সংগঠন সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদ ব্যানারে হলে ভোটকেন্দ্র হওয়ার বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে। কোনো বিতর্কে না গিয়ে হলে ভোটকেন্দ্রের ব্যাপারে আপত্তি কীভাবে দূর করা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা ভেবে দেখতে পারে।

ভোটকেন্দ্র একাডেমিক ভবনে করার পক্ষে যারা : এদিকে একাডেমিক ভবনে ভোটকেন্দ্র করার দাবিতে গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে চার দিনের আলটিমেটাম দিয়েছে বাম সংগঠনগুলোর মোর্চা 'প্রগতিশীল ছাত্রজোট'। দাবি মানা না হলে উপাচার্য কার্যালয় ঘেরাও করার ঘোষণা দেন তারা। একই দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট। ছাত্রদলও লিখিতভাবে প্রশাসনের কাছে তাদের সাত দফা দাবি উত্থাপন করেছে। এর অন্যতম দাবি- ভোটকেন্দ্র আবাসিক হল থেকে একাডেমিক ভবনে স্থানান্তর। 

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বাশার সিদ্দিকী বলেন, প্রশাসনের কাছে ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে রাখার দাবি জানিয়েছি। এক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্র একাডেমিক ভবন কিংবা টিএসসিতে করা যেতে পারে। মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনেও একই দাবি করেছি। হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র স্থাপনের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এতদিন সহাবস্থানের একটা দাবি ছিল। একপর্যায়ে প্রশাসন সহযোগিতা করেছে। অন্যান্য ছাত্র সংগঠনও ছাত্রদলকে অভ্যর্থনা জানিয়েছে। তবে এই সহাবস্থান যেন শুধু ডাকসুকেন্দ্রিক না হয়, সহাবস্থান যেন স্থায়ী হয়।

হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র রাখাসহ বিভিন্ন দাবির সমর্থনে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ বলেন, প্রশাসন চাইলে ২৪ ঘণ্টার নোটিশে সিন্ডিকেট সভা ডেকে বিষয়টি সমাধান করতে পারে। এটি শুধু কয়েকটি সংগঠনের দাবি নয়, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি। এ নির্বাচনকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে না রেখে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের উৎসব হিসেবে নেওয়া উচিত।

বেশিরভাগ ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীই ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে চাচ্ছেন বলে জানান সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সালমান সিদ্দিকী। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের মতামত দেখার জন্য প্রশাসনকে গণভোট আয়োজনের কথা বলেছিলাম। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা গণভোটের মাধ্যমে ভোটকেন্দ্র যেখানে রাখার সিদ্ধান্ত নেবে সেখানেই সবার মত থাকবে। তবে প্রশাসন সেটিও অগ্রাহ্য করেছে। প্রশাসনকে এ ব্যাপারে চাপ দিতে থাকব। অন্যদিকে নির্বাচনের প্রস্তুতিও নেব।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হাসান বলেন, এখানে সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদ যারা চালায় তাদের প্রায় সবাই ছাত্রলীগের 'পোস্টেড' নেতা। এটা ছাত্রলীগের এপিঠ-ওপিঠ। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখে না, একমাত্র ছাত্রলীগ বাদে বাকি প্রতিটি সংগঠন ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে রাখার দাবি জানাচ্ছে। এ ছাড়া ইনডিপেনডেন্ট টিভির জরিপ অনুযায়ী ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র চায়। আর ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধন করা যাবে না- এমন কিন্তু নয়। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রশাসন চাইলেই তা সংশোধন করতে পারে।

তবে এ বিষয়ে নির্বাচনের প্রধান রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক ড. এস এম মাহফুজুর রহমান বলেন, ডাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। যেহেতু গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এটি হয়েছে, তাই এ বিষয়ে নতুন করে কোনো কিছু বলার থাকে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মুহাম্মদ সামাদ বলেন, প্রতিটি আবাসিক হলে ভোটকেন্দ্র হবে। শিক্ষকরা এখানে নির্বাচন পরিচালনা করবেন। সেখানে কেন্দ্র সরানোর প্রশ্ন যুক্তিযুক্ত মনে হয় না।

পাঠকের মন্তব্য