সুরা আল কালাম-এর কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা

সুরা আল কালাম-এর একটা অংশে খোদা-বিরোধী এবং মহানবীর (সা) বিরোধী লোকদের নানা অপছন্দনীয় স্বভাবের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

একইসঙ্গে সত্য-বিরোধীদের অনুসারী না হতে মহানবীকে (সা) নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ বলছেন : যে বেশি বেশি শপথ করে তথা মিথ্যাবাদী,যে নীচ বা নিকৃষ্ট স্বভাবের,আপনি তার আনুগত্য করবেন না। যে ছিদ্রান্বেষী বা হিংসুক ও পেছনে নিন্দা করে ও একের কথা অপরের কাছে লাগিয়ে ফিরে এবং যে ভাল কাজে বাধা দেয়, সীমালংঘন করে, পাপিষ্ঠ, কঠোর স্বভাব ও তদুপরি কুখ্যাত;

-যারা ইসলাম-বিরোধী তারা যে মিথ্যাচারসহ নানা ধরনের পাপে জড়িত এখানে তা তুলে ধরা হয়েছে। যারা এতসব নীচ স্বভাবের অধিকারী তারা যে আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসুলেরও বিরোধিতা করবেন তা-ই স্বাভাবিক। তাদের কাছে যখন পবিত্র কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করা হয় তখন তারা বলে: এসবই তো সেকালের তথা অতীত যুগের লোকদের কুসংস্কারাচ্ছন্ন রূপকথা মাত্র!

সুরা কালাম-এর ১৭ থেকে ৩৩ নম্বর আয়াতে বাগান মালিকদের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। সম্পদের অহংকারে তারা বড়াই করে বেড়াত এবং দরিদ্রদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত।  এ কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে যাতে সম্পদ কাউকে অহংকারী না করে এবং সম্পদ আহরণ ও ভোগ করাকে কেবলই নিজের অধিকার বলে মনে না করে। যারা এমনই স্বার্থপর হয়ে অন্যদের বঞ্চিত করে তাহলে তাদের পরিণতি হবে এই বাগান-মালিকদেরই মত শোচনীয়।

আলোচ্য এ বাগানটি ছিল ইয়েমেনে। বাগানের মালিক ছিলেন এক বৃদ্ধ মু'মিন। তিনি ওই বাগান থেকে কেবল নিজের জরুরি প্রয়োজন মিটিয়ে বাদ-বাকি বিলিয়ে দিতেন দরিদ্র ও বঞ্চিতদের কাছে। কিন্তু এই মু'মিন মারা যাওয়ার পর তার সন্তানরা বলল: এই বাগানের ফসল বা ফল কেবল আমাদেরই দরকার। অন্যদের চেয়ে এখানে আমাদের অধিকারই বেশি। তাই তারা অন্য সব দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত লোকদের কিছুই দেয়নি। ঈমানের দুর্বলতা ও কৃপণতাই তাদেরকে এমন নিষ্ঠুর করেছিল। তাদের এ পদক্ষেপের কারণে আল্লাহর শাস্তি হিসেবে ওই বাগানে আগুন ধরে যায় এবং বজ্রপাতের ফলে পুরো বাগান জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

সুরা কলমের ১৭ ও ১৮ নম্বর আয়াতে বাগান-মালিক দুই ভাইয়ের ঘটনা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: 'আমি তাদেরকে পরীক্ষা করেছি,যেমন পরীক্ষা করেছি উদ্যানওয়ালাদের, যখন তারা শপথ করেছিল যে,সকালে বাগানের ফল আহরণ করবে,ইনশাআল্লাহ না বলে বা আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ছাড়াই।

এরপরের ঘটনা সম্পর্কে সুরা কলমে বলা হয়েছে: এরপর আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে বাগানে এক বিপদ এল। যখন তারা ছিল নিদ্রিত।  পরদিন সকালে তারা বাগান থেকে ফল আনার জন্য সেদিকে রওনা দেয় এবং নিঃশব্দে এগিয়ে যেতে থাকে যাতে কেউই টের না পায়। তারা বলাবলি করছিল: আজ একটা ফকিরও যেন বাগানের কাছে আসতে না পারে! তাদের বাবা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাগানের ফল সংগ্রহের সময় গরিব-দুঃখিদের ব্যাপক সহায়তা করতেন বলে তারা এই দিনটির জন্য অপেক্ষায় থাকত। কিন্তু বাগান মালিকরা গোপনে ও নিঃশব্দে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ায় তারা ফল সংগ্রহের দিন সম্পর্কে কিছুই জানতে পারেনি। এ অবস্থায় বাগান মালিকরা বাগানে এসে যখন দেখল যে গোটা বাগান পুড়ে ছাই হয়ে আছে তখন তারা ভুল বুঝতে পেরে বলল:

 নিশ্চয়ই আমরা বিভ্রান্ত হয়েছি! হায় আমরা অন্যদের বঞ্চিত করতে চেয়েছি, কিন্তু নিজেরাই বঞ্চিত হলাম!  না ফল পেলাম ও না ফল দান করার সওয়াব পেলাম!  সেখানে এক  মু'মিন ব্যক্তি ছিলেন যিনি ওই দুই কৃপণ ভাই তথা বাগান-মালিকদের কৃপলণতা ও লোভের ব্যাপারে সতর্ক করতেন। তিনি এবার তাদের বললেন: 'আমি কি তোমাদের বলিনি? এখনও কেনো আল্লাহর তাসবিহ বা প্রশংসা কর না?' তারা স্বীকার করে বলে যে, আমরা উদাসীন ও স্বার্থপর হয়ে পড়েছিলাম এবং পাপে লিপ্ত ছিলাম। 'তারা বললঃ আমরা আমাদের পালনকর্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি, নিশ্চিতই আমরা সীমালংঘনকারী ছিলাম।' এরপর দুই ভাই একে অপরকে তীব্র তিরস্কার করা শুরু করল এবং আসল পাপের দায় একে-অপরের কাঁধের ওপর চাপাতে লাগল। তারা তাদের সর্বনাশ হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে বলল: হায় দুর্ভোগ! আমাদের আমরা ছিলাম সীমাতিক্রমকারী।

পবিত্র কুরআন ভালো ও মন্দ লোকদের অবস্থার তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে যাতে তাদের পার্থক ভালোভাবে বোঝা যায়। এ ঘটনার পরবর্তী আয়াতে ধার্মিক ও সৎ লোকদের পুরস্কার এবং কাফিরদের পরিণতি সম্পর্কে বক্তব্য এসেছে। এর পাশাপাশি কাফির ও মুশরিকদের ব্যর্থতা আর ক্ষতির চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।

সুরা কলম-এর ৪২ থেকে ৪৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন : তীব্র ভয় ও আতঙ্কের কারণে গোছা পর্যন্ত পা নগ্ন হয়ে থাকার দিনের কথা স্মরণ কর, সেদিন তাদেরকে সেজদা করতে আহবান জানানো হবে,অথচ তারা সক্ষম হবে না । তাদের দৃষ্টি অবনত থাকবে গভীর লজ্জায়;তারা আপাদ-মস্তক লাঞ্ছনাগ্রস্ত হবে, অথচ যখন তারা সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল,তখন তাদেরকে সেজদা করতে আহবান জানানো হত।

-অপরাধীদের অপরাধ যখন আদালতে সুস্পষ্ট হয় তখন সাধারণত তারা মাথা নীচু করে রাখে। তাদের আপাদ-মস্তকে ছড়িয়ে পড়ে লজ্জা ও অপমান। মহান আল্লাহর আদালতেও এমন অনেকেই হাজির হবে যারা দুনিয়ার জীবনে কখনও আল্লাহর প্রতি নতজানু হয়নি ও সিজদা করেনি এবং তাদের সেই দাম্ভিকতা ও গোড়ামির পরিণতিতে তারা বিচার-দিবসেও আল্লাহর প্রতি সিজদা দিতে সক্ষম হবে না।

সুরা কলমের শেষ আয়াতের আগের আয়াতে মুশরিকদের ব্যর্থতা ও অনুশোচনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। তারা যে আল্লাহর নবীকে 'পাগল' বলে অপবাদ দিত সে কথা আবারও তুলে ধরা হয়েছে এভাবে : কাফেররা যখন কুরআন শুনে,তখন তারা যেন তাদের দৃষ্টি দিয়ে আপনাকে আছাড় মেরে ফেলে দিবে এবং তারা বলেঃ সে তো একজন পাগল।

আর এ সুরার শেষ আয়াতে পবিত্র কুরআন ও মহানবীর সত্যতা তুলে ধরে বলা হয়েছে:  এই খোদায়ি কিতাব বিশ্ববাসীর জন্য উপদেশ ও সতর্ক করার মাধ্যম ছাড়া অন্য কিছু নয়।

পাঠকের মন্তব্য