মাদকের থাবায় ধ্বংসের পথে সমাজ

ওমর ফারুক : বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত মাদকের নাম ইয়াবা। সিগারেট থেকে গাঁজা, হেরোইন, ফেন্সিডিলের পথ ধরে নেশার জগতে এখন শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে ইয়াবা। ব্যবহারকারীর মধ্যে কিশোর, তরুণ-তরুণীর সংখ্যাই বেশি। শিক্ষিত সমাজকে ধ্বংস করতে এর চেয়ে বড় অস্ত্র আর হয় না। বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে পরিকল্পিতভাবে ভারত যেমন সীমান্তের কাছাকাছি কয়েকশ ফেন্সিডিল কারখানা গড়ে তুলেছে। তেমনি বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীকে ইয়াবা আসক্ত করতে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় গড়ে উঠেছে অনেকগুলো ইয়াবা কারখানা। নাফ নদীর মিয়ানমার অঞ্চলের ওই কারখানাগুলোর সবচেয়ে বড় মার্কেট বলতে গেলে একমাত্র বাংলাদেশ। 

মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় মোট ৩৭টি ইয়াবা কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় উৎপাদিত ইয়াবা ট্যাবলেট কক্সবাজার জেলার অন্তত ৪২টি পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মিয়ানমারের মানুষ ইয়াবা সেবন করে না বললেই চলে। মাদকটির প্রতি তাদের এতোই অনিহা যে, খাওয়া তো দূরের কথা, ছুঁয়ে পর্যন্ত দেখে না। শুধু ব্যবসায়িকভাবে লাভবান ও পাশ্ববর্তী রাষ্ট্রের এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে তারা ইয়াবা উৎপাদন করছে। হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি-কোটি টাকা। এবং এই টাকার লেনদেন হয় হুণ্ডির মাধ্যমে। 

অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন চিহ্নিত বড়মাপের ব্যাংক গ্রাহক সকালে কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে কোটি টাকার চেক জমা দিয়ে ব্যাংকে হুন্ডির টাকা লেনদেন করছে। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা পচ্ছে বিশেষ সুবিধা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রশাসন ওই এলাকাগুলো চিহ্নিত করলেও ইয়াবা প্রবেশ ঠেকাতে পারছে না। র‌্যাব, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করছে। 

আবার কখনো এসব বাহিনীর সদস্যরাও জড়িয়ে পড়ছে পাচারে। বহনকারীরা ধরা পড়লেও মূল হোতারা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে কারণে অন্য বাহক দিয়ে পরের দিনই আনা হচ্ছে লাখ-লাখ পিস ইয়াবা। বাংলাদেশের এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে ইয়াবা পাওয়া যায় না। গ্রাম-গঞ্জ, শহর, অলি-গলি সবখানেই চলছে ইয়াবার ভয়ঙ্কর রাজত্ব। সহজলভ্য ও বহন করতে সুবিধা হওয়ায় মাদকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে ইয়াবা। 

বিশেষ করে রাজধানীতে ইয়াবার ব্যবহার সবেচেয়ে বেশি। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও ইয়াবা আসক্ত হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা খুব সহজে ইয়াবা সংগ্রহ করতে পারে। এমনকি শিক্ষার্থীর অনেকে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাইম ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থী বলেন, এক বন্ধুর মাধ্যমে ইয়াবা খাওয়া শিখেছি। প্রথমে বিনা পয়সায় খাওয়ার সুযোগ হলেও এখন টাকা দিয়ে কিনে খেতে হয়। এক সময় জানতে পারি, ওই বন্ধু ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ততোক্ষণে সময় গড়িয়েছে বহু দূর। চেষ্টা করেও নেশা ছাড়তে পারছি না। মিরপুর-১ নম্বর প্রিন্স বাজারের পেছনের গলিতে হঠাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চালাতে দেখা গেল। 

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এক চা বিক্রেতাকে আটক করা হয়েছে। কারণ জানতে অভিযানে থাকা এসআই তরিকুল ইসলামকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, চায়ের দোকানের আড়ালে ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ইয়াবা ব্যবসা করে আসছে। তার কিছু নিয়মিত কাস্টমার আছে। যারা চা খাওয়ার নামে এখানে এসে ইয়াবা সংগ্রহ করে। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন ব্যবসা করলেও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযানে এসে ঘটনার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। শুধু মিরপুর নয়। মোহাম্মদপুর, ঝিগাতলা, ধানমন্ডি, গুলশান বনানী ও উত্তরার অভিজাত এলাকায় নিরবে চলছে ইয়াবার রমরমা ব্যবসা। যার সঙ্গে জড়িত আছে সমাজের রাঘব বোয়ালরা। বিশেষজ্ঞদের মতে পারমাণবিক বোমার চেয়ে ইয়াবার ক্ষতিকারক দিক বহুগুণ বেশি। 

এই মাদক সমাজের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে প্রবেশ করে সবকিছু ধ্বংস করে। জাতির প্রধান শক্তি তরুণ সমাজ নেশার ঘোরে হারিয়ে ফেলে জীবনের মূল্যবান সময়। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দেশ মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। দেশের উন্নয়ন ও আধুনিকতার জাকজমকের আড়ালে ভেতরটা হয়ে পড়বে অন্তসারশূন্য। এই ভয়াল আগ্রাসন বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে জাতি অচিরেই বিকলাঙ্গ হয়ে পড়বে বলে মনে করেন তারা। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা প্রবেশ ঠেকাতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা কোনো কাজে আসছে না। 

কারণ, বড় মাপের রাজনৈতিক নেতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পেশার সদস্যরা ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। ইয়াবা ব্যবসার মাধ্যমে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে অনেকে। রাতারাতি ধনি বনে যাওয়া এসব মানুষ আরো ধনি হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 

মিয়ানমারের বিভিন্ন কারখানার সঙ্গে ওই ব্যবসায়ীদের সরাসরি যোগাযোগ আছে। ব্যাপক কড়াকড়ির মধ্যেও বাংলাদেশ-মিয়ানমারের উখিয়ার ঘুমধুম, বটতলী, বালুখালী ও কুতুপালং, টেকনাফ, সাবরাং বিওপি এলাকাসহ ৪২টি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিনই চলছে ইয়াবা চোরাচালান। স্থলপথে কড়াকড়ির কারণে মাছ ধরার নৌকায় করে দেশের অভ্যন্তরে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ঢুকছে। টেকনাফ, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের পাশাপাশি এখন ইয়াবার বড় চালান ঢুকছে চট্টগ্রাম, খুলনা, সুন্দরবন, পটুয়াখালী, বরিশাল, বরগুনা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন নৌ-রুট দিয়ে। ইয়াবা ট্যাবলেটের বাহারি নামের মধ্যে আছে, পরের মাথা ওয়াই, নিচের মাথা, বাবা, ডব্লিউ ওয়াই, পেপসি, সেভেন আপ,  চম্পা, গোলাপ, গুটি ও দানা। 

মাদকনিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খন্দকার রাকিবুল হাসান বলেন, মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসা বন্ধ করতে ইতিমধ্যে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিকল্পনামাফিক কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সে কারণে প্রতিদিন হাজার-হাজার পিস ইয়াবাসহ ধরা পড়ছে চক্রের সদস্যরা। ইয়াবা সেবনের ক্ষতিকারক দিক সম্বন্ধে সবার মধ্যে সচেনতা সৃষ্টি করতে না পারলে জাতিকে ভবিষ্যতে চড়া মূল্য দিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পাঠকের মন্তব্য