দেশে দেশে বিচিত্র যত পেশা

জীবিকার তাগিদে আমাদের সবাইকেই কোনো না কোনো পেশার সাথে যুক্ত হতে হয়। দেশ, সময় ও জাতি ভেদে সেসব পেশা কখনোই একইরকম হয় না। পৃথিবীর একেক দেশে একেকরকম ও একেক ধরনের পেশা দেখতে পাওয়া যায়। আবার প্রাচীনকালে এমন অনেক পেশা ছিল, যা আজকাল আর নেই বললেই চলে। প্রতিটি পেশার রয়েছে নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য, রয়েছে কিছু বৈচিত্র্যতা। বিচিত্র সব পেশা নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন। লিখেছেন মেহেদী হাসান গালিব

নকার-আপার : এলার্ম ঘড়ি ছাড়া প্রতিদিন ঠিক সময়ে ঘুম থেকে ওঠার কথা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। কিন্তু আগেরকার দিনে যখন এলার্ম ঘড়ি ছিল না তখন মানুষ ঘুম থেকে উঠতো কী করে ? তখন এলার্ম ঘড়ির কাজটি করতো কিছু পেশাদার মানুষ, যাদের বলা হতো ‘নকার-আপার’। নকার-আপাররা তাদের ডিউটি অনুযায়ী মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শয়নকক্ষের জানালায় বড় একটি লাঠি দিয়ে আঘাত করতেন। গ্রাহক ঘুম থেকে না ওঠা পর্যন্ত নকার-আপাররা ক্রমাগত লাঠি দিয়ে জানালায় আঘাত করে শব্দ করতেন। একজনের ঘুম ভাঙানো হলে ছুটে যেতেন আরেকজনের বাড়িতে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও নকার-আপার পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

অন্যের পরিবর্তে লাইনে দাঁড়ানো : লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে আমাদের কারোরই ভালো লাগে না। কিন্তু কাজের প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তবে মজার বিষয় হলো জাপানের নাগরিকরা লাইনে দাঁড়িয়ে না থেকেও লাইনের মধ্যে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় রাখতে পারেন। কারণ কিছু মানুষ টাকার বিনিময়ে অন্যের পরিবর্তে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। ফলে কোনো ব্যক্তি লাইনে দাঁড়িয়ে না থেকেও খুব সহজেই তার কাজটি সম্পন্ন করতে পারেন। জাপানে এই পেশাটি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

টাকার জন্য ঘুম : আমরা সবাই জানি পরিশ্রম না করলে জীবনে কোনোকিছুই করা সম্ভব নয়। কিন্তু মজার বিষয় হলো ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও কিছু মানুষ টাকা রোজগার করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বিজ্ঞানীরা যখন কোনো ঘুমের ঔষধ কিংবা ঘুম সংক্রান্ত কোনো বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন তখন কিছু মানুষের ওপর তাদের গবেষণার প্রয়োগ ঘটানো হয়। আর এর বিনিময়ে তাদের দেওয়া হয় পারিশ্রমিক!

প্রেমিক পদে চাকরি : শুনতে খানিকটা অদ্ভুত লাগলেও প্রেমিক পদে চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন অসংখ্য মানুষ। আমেরিকা, চিন, জাপান, ইউরোপ ও দক্ষিণ আফ্রিকায় এই অদ্ভুত পেশার দেখা মেলে এবং এসব দেশে এই পেশা সম্পূর্ণ আইনসম্মত।

মূত্র দিয়ে কাপড় পরিষ্কার : প্রাচীন রোমে কাপড় পরিষ্কার করার জন্য ক্রীতদাসদের কাজে লাগানো হতো। কিন্তু এখনকার মতো সেসময় কাপড় ধোয়ার সাবান কিংবা ডিটারজেন্টেনের প্রচলন ছিল না। তাই তারা গোড়ালি সমান মূত্রের মাঝে দাঁড়িয়ে কাপড় ধোয়ার কাজটি করতেন। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। মূত্রে থাকা বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে অন্যতম একটি উপাদান হলো অ্যামোনিয়া, যার পরিষ্কারক ক্ষমতা খুবই তীব্র। এজন্যই রোমের মানুষ কাপড় ধোয়ার জন্য মূত্র ব্যবহার করতেন।

লিঙ্ক বয় : বর্তমানে যত গভীর রাতেই রাস্তায় বের হওয়া হোক না কেন, ল্যাম্পপোস্টের আলো সবসময়ই অন্ধকার দূর করে। আর কোনো কারণে লোডশেডিং হলে মোবাইল কিংবা টর্চ লাইট তো আছেই। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন বিদ্যুত্ ও উন্নত এসব প্রযুক্তি আমাদের হাতের নাগালে ছিল না তখন লোডশেডিং হলে অন্ধকার রাস্তায় চলাফেরা করতে বেশ অসুবিধা হতো। আর মানুষের এই অসুবিধা দূর করার জন্যই তখনকার সময় কমবয়সী ছেলেরা মশাল হাতে পথচারীদের পথকে আলোকিত করে চলাফেরায় সাহায্য করতো। এই ছেলেদের বলা হতো ‘লিঙ্ক বয়’। ল্যাম্পপোস্ট উদ্ভাবনের আগে ইংল্যান্ডের রাস্তায় এই লিঙ্ক বয়দের দেখা পাওয়া যেত।

বিয়ের অতিথি হওয়া : সাধারণত আমাদের দেশের কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে ঠিকমতো দুই পা ফেলাই দায় হয়ে পড়ে। কিন্তু জাপানে এই চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে বিয়ের অনুষ্ঠানে অতিথির অভাব পড়ে। তাই জাপানে টাকার বিনিময়ে অতিথি ভাড়া করা হয়। টাকার বিনিময়ে অতিথিরা বিয়ের অনুষ্ঠানে যান এবং পেটপুড়ে খাওয়া-দাওয়া করে আসেন।

আসবাবপত্র পরীক্ষক : কোনো আসবাবপত্র তৈরির পর প্রস্তুতকারীদের মাথায় সর্বপ্রথম যে চিন্তাটি কাজ করে তা হলো আসবাবপত্রটি মানুষের কতটা উপকারে আসবে এবং তা মানুষের জীবনকে কতটুকু আরামদায়ক করে তুলবে। তাই আসবাবপত্র তৈরি হওয়ার পর কিছু মানুষকে নিয়োগ দেওয়া হয় তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার জন্য। আসবাবপত্র পরীক্ষকরা আসবাবপত্রটি ব্যবহার করেন তাতে শুয়ে-বসে, এমনকি ঘুমিয়েও পরীক্ষা করে নেন। আর এই কাজের জন্য তারা পারিশ্রমিকও পেয়ে থাকেন!

প্রফেশনাল পুশার : লোকাল বাসে ভ্রমণের ক্ষেত্রে হরহামেশাই আমাদের যে বিষয়টির সম্মুখীন হতে হয়, তা হলো ধাক্কা খাওয়া। অতিরিক্ত ভীড়ের কারণে কখন কে কাকে ধাক্কা দিচ্ছে কিংবা কে কার পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে তা দেখার কোনো সুযোগ নেই। যাত্রীদের এসব সমস্যার কোনো তোয়াক্কা না করেই বাসের হেলপাররা বেশি বেশি যাত্রী ওঠাতে থাকেন। এক্ষেত্রে তারা ধাক্কা দিয়ে অন্য যাত্রীদের জন্য জায়গা করে দেন। মজার বিষয় হলো জাপান ও নিউইয়র্ক সিটির রেলস্টেশনে ভীড়ের সময় প্রফেশনাল পুশাররা ধাক্কা দিয়ে যাত্রীদের জন্য জায়গা করে দেন। পূর্বে এটি শিক্ষার্থীদের জন্য পার্টটাইম চাকরি হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে অনেকেই এই পেশাকে ফুলটাইম চাকরি হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।

র্যাট ক্যাচার : বর্তমানে ইঁদুর মারার জন্য বাজারে বিভিন্ন ধরনের ঔষধ, কীটনাশক ও ফাঁদ থাকলেও একটা সময় ছিল যখন ইঁদুর মারার জন্য এগুলো ছিল না। তখন ইঁদুরের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল র্যাট ক্যাচার। তখনকার দিনে র্যাট ক্যাচাররা ইঁদুর ধরে ধরে মানুষকে বিভিন্ন ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতো।

লেক্টর : ফ্যাক্টরিতে একটানা কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের মাঝে এক ধরনের একঘেঁয়েমি ভাব চলে আসে এবং তারা স্পৃহা হারিয়ে ফেলেন। তাই শ্রমিকরা যাতে তাদের কাজের প্রতি আগ্রহ ও মনোযোগ হারিয়ে না ফেলেন সেজন্য পূর্বে বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে লেক্টর নিয়োগ দেওয়া হতো। লেক্টরদের কাজ ছিল উচ্চস্বরে খবর এবং বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম পড়ে শ্রমিকদের শোনানো। এতে করে শ্রমিকদের মধ্যে সহজে একঘেঁয়েমি ভাব চলে আসতো না।

পাঠকের মন্তব্য