জামায়াতে বিভক্তি না দল বাঁচানোর কৌশল ?

মুক্তিযুদ্ধে দলটির ভূমিকা নিয়ে ক্ষমা চাওয়া এবং দলের সংস্কার বিষয়টি আবারো আলোচনায় এসেছে৷ এই ইস্যুতে এক নেতা দেশের বাইরে থেকে পদত্যাগ করেছেন৷ আরেকজন হয়েছেন বহিস্কার৷ প্রশ্ন উঠেছে এটা নতুন কৌশল কিনা৷

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক এখন লন্ডনে অবস্থান করছেন৷ তিনি সেখান থেকে শুক্রবার দলের আমির মকবুল আহমেদের কাছে লিখিত পদত্যাগপত্র পাঠান৷ তার দীর্ঘ পদত্যাগ পত্রে দু'টি বিষয় স্পষ্ট৷ আর তা হলো, জামায়াতের সংস্কার এবং মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে তাদের অবস্থান৷ তিনি বলেছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভূমিকা এবং পাকিস্তান সমর্থনের কারণ উল্লেখ করে জামায়াতকে জাতির কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া উচিত৷

এই দু'টি বিষয় নিয়ে পদত্যাগী এই জামায়াত নেতা সঙ্গে লন্ডন থেকে টেলিফোনে কথা বলেছেন৷ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তিনি জামায়াতের ভূমিকা বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন? তার জবাবে বলেন, আমি মিন করেছি যে, ১৯৭১ সালে জামায়াত রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে এবং পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছে৷ এজন্য জামায়াতকে জাতির আছে ক্ষমা চাইতে হবে৷

‘ক্রাইসিস থেকে বাঁচার জন্য নয়’: রাজ্জাক

ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধের অপরাধে অভিযুক্ত শীর্ষ জামায়াত নেতাদের আইনজীবী ছিলেন৷ তিনি তাদের পক্ষ হয়ে ওই অপরাধকে ডিফেন্ড করেছেন৷

তাহলে এখন তিনি কী মনে করেন? জামায়াত নেতারা যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার সঙ্গে কি জড়িত ছিলেন? তারা তো দণ্ডিত হয়েছেন৷ এ ব্যাপারে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, এখানে দু'টি বিষয়৷ একটি হলো পাকিস্তানকে সমর্থন করা৷ এজন্য ১৯৭২ সালে একটি আইন ছিল, কলাবোরেটর অর্ডিন্যান্স, যা পরে বাতিল হয়ে যায়৷ আরেকটা হলো যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ৷ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ জামায়াত নেতাদের ওপর আসছে ২০১০ সালে৷ দু'টো জিনিস সম্পূর্ন ভিন্ন৷ তাদের বিরুদ্ধে যদি কলাবোরেটর আইনে ব্যবস্থা নেয় হতো, তাহলে একটা বিষয় ছিল৷ ওটা ছিল রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করা৷ পাকিস্তানকে যে কোনো মানুষ রজনৈতিকভাবে সমর্থন করেছে কলাবোরেটরস অর্ডিন্যান্স-এ তার বিচার করা যায়৷ কিন্তু ১৯৭২ সালের যে আইনের অধীনে বিচার করা হয়েছে ২০১০ থেকে ২০১৪ সালে সেটা ছিল ওয়্যার ক্রাইম৷ আমি ছিলাম তাদের লইয়ার৷ আমি তাদের ডিফেন্ড করেছি৷ আমি তাদের ব্রিফ দেখেছি৷ আমি মনে করি যদি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্বচ্ছ বিচার হতো অথবা ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড মেনে সংবিধান অনুযায়ী যদি বিচার হতো তাহলে তাদের কেউ দণ্ডিত হতেন না৷ তারা সবাই খালাস পেতেন৷

জামায়াতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা একটা দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে বসবাস করি৷ পশ্চিম বিশ্বে অনেক দেশেই আছে তিউনিসিয়া , তুরস্ক, মরক্কো- এইসব দেশে ইসলামি আন্দোলনের অনেক পরিবর্তন হয়েছে৷ ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার যে চিন্তা তার মধ্যে পরিবর্তন আনতে হবে৷ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ইসলামি মুভমেন্টের যে পরিবর্তন হয়েছে সেটাকেই জামায়াতের সামনে নিয়ে আসা উচিৎ বলে আমি মনে করি৷

‘রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনীতি করতে হবে’: মঞ্জু

আর শুক্রবার ঢাকা মহানগর জামায়াত থেকে বহিস্কৃত মুজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘‘মুক্তিযুদ্ধ এবং সংস্কার প্রশ্নে জামায়াতে বিভক্তি আছে৷ আমি মনে করি, তরুণসহ ৬০ ভাগ জামায়াত সদস্য মনে করে, একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতের ক্ষমা চাওয়া উচিৎ৷ তারা সংস্কারও চান৷ জামায়াত যদি এখন না করে তাহলে একসময়ে এটা করতে বাধ্য হবে৷''

মুজিবুর রহমান মঞ্জু ঢাকা মহানগরের মজলিসে শুরার সদস্য ছিলেন৷ তিনি ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি৷ জাময়াতের সংস্কার এবং মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে জাময়াতের অবস্থান পরিস্কার করার ব্যাপারে তিনি অনেক দিন ধরেই কথা বলছিলেন৷

তিনি মনে করেন, এরই মধ্যে জামায়াত দুর্বল হয়ে পড়েছে৷ আমাদের নেতাদের ফাঁসি দিল৷ জামায়াততো কার্যকর প্রতিবাদও করতে পারেনি৷ জামায়াতের সংস্কার তাই জরুরি৷ আর সেটা হলো অনেক মানবিক বিষয় আছে সেখানে ইসলামকে টেনে আনার দরকার নেই৷ সেটা সবার জন্যই মানবিক৷ আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনীতি করতে হবে৷ আমি মনে করে জাময়াতের ভিতরে একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হওয়া দরকার৷ সেখান থেকেই জামায়াতের রাজনৈতিক ভূমিকা এবং করনীয় ঠিক করা উচিতল৷

তবে আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘জামায়াত নেতাদের যে অপরাধে ফাঁসি দেয়া হয়েছে তারা সে অপরাধ করেননি৷ তাদের যে যুদ্ধাপরাধের কথা বলা হচ্ছে সেটা আমি মনে করি ঠিক না৷ তারা রাজনৈতকভাবে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন৷

‘দল বাঁচাতে, সম্পদ রক্ষায় কৌশল করছে’: শাহরিয়ার

তবে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক শাহরিয়ার কবির অবশ্য মনে করেন এটা জাময়াতের একটি নতুন কৌশল৷ কারণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়ার পর যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে জামায়াতের বিচার হবে৷ তখন বিচারে এই দলটির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ হলে দলই থাকবেনা৷ যারা দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং জামায়াতের যে সম্পদ আছে, তা বাজেয়াপ্ত হবে৷ তাই তারা নতুন এক প্রতারণামূলক কৌশলের আশ্রয় নিয়ছে৷ এই পদত্যাগ বা বহিষ্কার জামায়াতের একটি পাতানো কৌশল৷ এতে সরকারের বা ওবায়দুল কাদেরের উচ্ছ্বুসিত হওয়ার কিছু নেই৷

তিনি বলেন, জাময়াতকে একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে বলছেন রাজ্জাক সাহেব৷ সেটা কোন ভূমিকার জন্য? একাত্তরের গণহত্যার জন্য? যুদ্ধাপরাধের জন্য ? তিনিওতো জামায়াত নেতাদের আইনজীবী ছিলেন৷ জামায়াত তার রানৈতিক ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে পারে৷ কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যার জন্যতো ক্ষমা চাইবে না৷ আর ক্ষমা চাইলেইতো অপরাধ মাফ হয় না৷ দলের সংস্কারও জামায়াত আসলে করবেনা৷ তাদের মওদুদীবাদই বহাল আছে৷ রাজ্জাক সাহেবের পদত্যাগ যদি জামায়াতের পরিকল্পনার অংশ না হতো তাহলে জামায়াতের আমির কিভাবে বলেন যে তার সঙ্গে মহব্বতের সম্পর্ক থাকবে৷

তিনি বলেন, জামায়াত এখন তার দল বাঁচাতে, সম্পদ রক্ষায় নতুন কৌশল করছে৷ এতে বিভ্রান্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই৷

পাঠকের মন্তব্য