বিনা দোষেই কারাগারে ১১ মাস ! 

এ যেন আরেক জাহালমের গল্প। রাজধানীর শাহবাগ থানায় দায়ের করা মাদকের এক মামলায় আসামি ছিলেন শুক্কুর আলী। তবে পুলিশ গ্রেফতার করে বসে শুক্কুর শাহকে। পাঁচ মাস পর বিষয়টি আদালতের গোচরে আনলে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলেন আদালত। পুলিশ জানায়, বাড়িওয়ালার তথ্য অনুযায়ী গ্রেফতার করা হয়েছে তাকে। প্রায় ১১ মাস পর মামলার বাদী যখন আদালতে আসেন সাক্ষ্য দিতে, আসামির কাঠগড়ায় শুক্কুর শাহকে দেখে অবাক বনে যান। তিনি চেনেনই না, কে এই আসামি!

শেষ পর্যন্ত আদালতে প্রমাণিত হয়, শুক্কুর শাহ এই মামলার আসামিই নন, বিনা দোষেই ১১ মাস ধরে জেল খাটছেন তিনি। মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় আদালতের নির্দেশে ছাড়া পেলেন সেই শুক্কুর শাহ। জাহালমের মতোই কোনো অপরাধ না করেও পুলিশের ভুলে ১১ মাস কারাভোগ করতে হলো তাকে।

প্রসঙ্গত, সোনালি ব্যাংকের ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনায় দুদকের দায়ের করা এক মামলায় সালেক নামে এক ব্যক্তির পরিবর্তে পুলিশ ভুল করে গ্রেফতার করে টাঙ্গাইলের জাহালমকে। এরপর তিন বছর ধরে কারাগারে ছিলেন তিনি। সম্প্রতি এ নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালতের নির্দেশে গত ৩ ফেব্রুয়ারি ছাড়া পান জাহালম।

ঠিক একই ধরনের ঘটনাই ঘটেছে শুক্কুর শাহ’র সঙ্গে। শাহবাগ থানার মামলার ঘটনায় উল্লেখ করা হয়, ২০১১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি এ আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। পরের বছর ২০ জুন তিনি এ মামলায় জামিন পান। এরপর থেকেই তিনি মামলায় হাজিরা না দিয়ে পলাতক ছিলেন। ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়।

সংশ্লিষ্ট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মমিনুল ইসলাম এ পরোয়ানা তামিলের দায়িত্ব পান। তিনি সংবাদ পান, হাজারীবাগ থানার ৯(৩)১৮ মামলায় শুক্কুর নামে এক আসামি গ্রেফতার হয়েছে। যাচাই-বাছাই না করেই শুক্কুরকে শাহবাগ থানার মাদকের মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করেন ওই এসআই। এভাবেই শুক্কুর শাহ আদালতের নথিতে হয়ে যান শুক্কুর আলী।

শুক্কুর শাহ’র আইনজীবী মো. জাকির হোসেন জানান, হাজারীবাগ থানার মামলায় জামিনে পেয়েও শুক্কুর শাহ কারাগার থেকে বের হতে পারেননি। পরে খোঁজ নিয়ে আমরা জানতে পারি, তাকে শাহবাগ থানার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। অথচ এ মামলায় শুক্কুর শাহ আসামিই নন। সেটা গত বছরের মার্চের ঘটনা।

বিষয়টি ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হয়। এসময় আদালত এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন দাখিল করতে পুলিশকে নির্দেশ দেন। ঠিকানায় বাড়িওয়ালার প্রত্যয়নপত্রসহ আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাড়িওয়ালা শনাক্ত করায় আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আর এভাবেই জাহালমের মতো শুক্কুর শাহ হয়ে যান শুক্কুর আলী।

শুক্কুর শাহ’র আইনজীবী বলেন, বিচারক তখন আসামির জাতীয় পরিচয়পত্র আদালতে দাখিল করতে বলেন। কিন্তু আসামিকে গ্রেফতারের সময় পুলিশ পরিচয়পত্র নিয়ে যাওয়ায় তা আদালতে দাখিল করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে জামিন পেলেও তাকে মুক্তি দেয়নি কারাকর্তৃপক্ষ।

এদিকে, শাহবাগ থানার এই মামলায় চলতি বছরে ৩০ জানুয়ারি আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেন মামলার বাদী। আর সেই সময়ই তিনি আদালতকে জানান, কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামিকে তিনি চেনেন না। এ মামলার পরবর্তী শুনানিতে (মঙ্গলবার ১৯ ফেব্রুয়ারি) জেল সুপারকে মামলার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন আদালত। তলব করা হয় সংশ্লিস্ট থানার ওসি ও ওয়ারেন্ট তামিল কর্মকর্তাকেও।

মঙ্গলবারের শুনানিতে শুক্কুর শাহকে হাজির করা হয় আদালতে। কারাগারে রক্ষিত শুক্কুর আলী ও শুক্কুর শাহ’র ছবি এবং তাদের মায়ের নাম মেলেনি এসময়। প্রমাণ হয় শুক্কুর শাহ এ মামলার আসামি নন। পরে ঢাকার ২ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক এস এম রুহুল ইমরান আসামি হিসেবে কারাগারে থাকা শুক্কুর শাহকে এ মামলায় খালাস দেন। অন্য কোনো মামলায় আটক না থাকলে শুক্কুর শাহকে তৎক্ষণাৎ মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। সন্ধ্যাতেই মুক্তি পান তিনি।

আদালতে পুলিশও নিজেদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করে। পুলিশের পক্ষে শুনানিতে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, পুলিশ সরল বিশ্বাসে ওই আসামিকে গ্রেফতার করেছে। বাড়িওয়ালা শনাক্ত করার কারণেই গ্রেফতার করা হয় তাকে। এখানে পুলিশের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না।

শুক্কুর শাহ আদালত চত্বরে সাংবাদিকদের বলেন, আমি এই মামলার আসামি না। তারপরও পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে। বিষয়টি আদালতকে আইনজীবীর মাধ্যমে জানানো হয়েছিল, কিন্তু আদালত আমলে নেননি। পুলিশের ভুলে আমাকে ১১ মাস কারাভোগ করতে হয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য