আর কত মৃত্যু চাই ?

রাসায়নিক গুদাম বনাম চকবাজার ট্রাজেডি

নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পর পুরান ঢাকার আবাসিক ভবন থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নেয়ার দাবি ওঠে জোরেশোরে। ২০১০ সালের ওই আগুনে ১২৪ জনের মৃত্যুর পর আবাসিক ভবন থেকে রাসায়নিক গুদাম সরাতে একযোগে অভিযানেও নামে ফায়ার সার্ভিস ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। তার পরও সরেনি আবাসিক ভবন থেকে রাসায়নিকের গুদাম।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পুরান ঢাকার বংশাল থানা এলাকার আরমানিটোলা, বাবুবাজার, মিটফোর্ড, লালবাগ থানা এলাকার শহীদনগর ও ইসলামবাগ এবং চকবাজার থানা এলাকায় রয়েছে ৪০০টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। এ ভবনগুলোয় রয়েছে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোজ, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোপাইল, টলুইনের মতো দাহ্য পদার্থ। ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত হওয়ার পর কয়েক দফা অভিযান চালিয়েও পুরান ঢাকা থেকে এসব রাসায়নিকের গুদাম অপসারণ হয়নি।

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (ঢাকা) দেবাশীষ বর্ধন বলেন, এসব রাসায়নিকের গুদামের ৯৮ শতাংশই অনুমোদনহীন। অগ্নিদুর্ঘটনার বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে এসব গুদাম।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, পুরান ঢাকার আরমানিয়ান স্ট্রিটের ২৬/৩ নম্বর বাড়ির নিচতলায় রয়েছে এপি গোডাউন নামে একটি কেমিক্যালের গুদাম। এর পূর্ব দিকে রাস্তা, পশ্চিমে হাসপাতাল, উত্তর ও দক্ষিণে মার্কেট। ২০০ বাই ৩০০ ফুট আয়তনের গুদামটিতে সংরক্ষণ করা হয় ক্যালসিয়াম সোডিয়াম কার্বনেট ও ব্লিচিং পাউডারের মতো দাহ্য পদার্থ।

রাসায়নিক গুদামটির মালিক মামুন দাবি করেন, বংশপরম্পরায় তারা রাসায়নিকের ব্যবসা করে আসছেন। এ ব্যবসা বন্ধ করে দিলে তার পরিবারকে না খেয়ে থাকতে হবে। তবে লাইসেন্স আছে কিনা জানতে চাইলে এর কোনো জবাব দেননি তিনি।

এদিকে গত বছর গুলিস্তান-মতিঝিলের ফুটপাত থেকে হকারদের উচ্ছেদের পর ডিএসসিসির মেয়র জানিয়েছিলেন, ওই বছরের ১ মার্চ থেকে পুরান ঢাকার আবাসিক ভবন থেকে সব গুদাম সরাতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। র্যাব ও পুলিশের সহায়তা নিয়ে ১ মার্চ থেকে সিটি করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়ে অভিযানে নামবেন বলেও সে সময় জানান তিনি। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে গুটিকয়েক কারখানায় অভিযান চালানোর পর হঠাৎ করেই সে তত্পরতা থেমে যায়।

চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের পর আবারো রাসায়নিক গুদাম সরানোর ঘোষণা দিয়েছেন ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন। গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে তিনি বলেন, গত বছরও আমরা একটি উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিছু গুদামে অভিযানও চালিয়েছিলাম। কিছু সিলগালা করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে শিল্প মন্ত্রণালয় ও এফবিসিসিআই থেকে জানানো হয়, এসব রাসায়নিক গুদাম ব্যবসায়ীদের আরো কিছুটা সময় দিলে তারা নিজ থেকেই স্থানান্তর করবেন। সেজন্যই রাসায়নিকের কারখানা ও গুদাম স্থানান্তরের কাজ বন্ধ করা হয়েছিল। এবার আর কারো কথা শোনা হবে না। শক্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে পুরান ঢাকাকে রাসায়নিকের কারখানা ও গুদামমুক্ত করা হবে।

পুরান ঢাকাকে রাসায়নিক কারখানা ও গুদামমুক্ত করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. জাবেদ পাটোয়ারী। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুরান ঢাকাকে বাঁচাতে হলে এখান থেকে সব ধরনের রাসায়নিকের কারখানা ও গুদাম সরাতে হবে। এজন্য পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেয়া হবে।

তবে ভিন্ন কথা বলেছেন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) বার্ন ইউনিট পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিল্পমন্ত্রী বলেন, পুরান ঢাকার কেমিক্যাল ব্যবসা বংশপরম্পরার। এটা তো বন্ধ করা যাবে না। এর সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। আমি পুরান ঢাকার মানুষ। আমি জানি।

রাসায়নিক গুদাম অপসারণের জন্য কয়েক দফা উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। এ বিষয়ে সংস্থাটির পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) মেজর একেএম শাকিল নেওয়াজ বলেন, নিমতলী ট্র্যাজেডির পর থেকেই আমরা চেষ্টা করছি পুরান ঢাকা থেকে সব ধরনের রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নিতে। এজন্য গণমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়েই আমরা কয়েক দফা অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে সেটা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব ম্যাজিস্ট্রেট নেই যে আমরা নিজেদের ইচ্ছেমতো অভিযান পরিচালনা করব। একটি অভিযান চালাতে হলে ম্যাজিস্ট্রেট চেয়ে আবেদন করে অপেক্ষায় থাকতে হয়।

পাঠকের মন্তব্য