পিলখানা ট্র্যাজেডি : রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র

ফণীন্দ্র সরকার : ২০০৯ সালে পিলখানায় (তদানীন্তন বিডিআর হেডকোয়ার্টার) নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল। এ নারকীয় হত্যাকাণ্ডে ৫৮ সেনা অফিসার নিহত হয়েছেন। দিবসটিকে কালো দিন হিসেবে আমরা স্মরণ করি। সীমান্ত রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী, তাদের কিছু দাবি-দাওয়াকে কেন্দ্র করে বার্ষিক বর্ণাঢ্য সম্মেলনে ঢাকার পিলখানায় যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। 

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে যে গোষ্ঠী ক্ষমতায় এসে বাংলার, বাঙালির মূল চেতনাকে করেছিল ছিন্ন ভিন্ন- সেই পরাজিত গোষ্ঠীই একের পর এক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে আসছিল- সুজলা-সুফলা বাংলার তীর্থভূমিতে। পিলখানা হত্যাযজ্ঞ ছিল তেমন এক ঘটনা। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এমন অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। ঘটনার গভীরে প্রবেশ করতে আমরা সক্ষম হইনি আজও। ঐতিহাসিকভাবেই এ কথা সত্য যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে দেশটিকে জঙ্গি সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত করা হয়। অনেক সংগ্রাম, আন্দোলনের মাধ্যমে ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে ১২ জুনের সাধারণ নির্বাচনে স্বাধীনতার তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বহনকারী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বাঙালি জাতিকে সুশাসন উপহার দিতে সক্ষম হয়। গুড গভর্নমেন্ট বলতে যা বোঝায়—শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার সে বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট করতে সচেষ্ট হয়। 

কিন্তু দুর্ভাগ্য জাতির। দেশীয় আন্তর্জাতিক চক্রান্তে ২০০১ সালে ১ অক্টোবর সাধারণ নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে পরাজিত হতে হয়। শাসন ক্ষমতায় আসে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি। জন্ম হয় আরো একটি কালো অধ্যায়ের। ২০০১-এর অক্টোবর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ একটি অন্ধকার যুগের মধ্যে বসবাস করেছে। সে যুগের অবসান কল্পে বাঙালি আবার জেগে ওঠে। ২ বছর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থেকে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সব দলের অংশগ্রহণে সে নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট ব্যাপকসংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে।

সেদিনের সেই নতুন সরকারের বয়স মাত্র পৌনে ২ মাস। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ঘটে যায় নারকীয় ঘটনা। গণতান্ত্রিক নতুন সরকারের পথচলায় সৃষ্টি করা হয় ভয়ঙ্কর ব্যারিকেড। তদানীন্তন বিডিআর জওয়ানদের দাবি-দাওয়া ছিল নিছক একটি অজুহাত। কার্যত ঘটনার আড়ালে ছিল আওয়ামী লীগ সরকারকে উত্খাতের এক ভয়ঙ্কর চক্রান্ত। স্বাধীনতাবিরোধীরা আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে ঠেকাতে না পেরে ঘটিয়েছিল এমন ঘটনা। যখন তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ হয়ে যায় তখন বিদ্রোহীরা শেখ হাসিনাকে ঘটনাস্থলে আহ্বান করেছিল সারেন্ডার করার লক্ষ্যে। কিন্তু তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল নেত্রীকে হত্যা করা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দৃঢ়তায় বিদ্রোহীরা পরাস্ত হয়। এদিকে বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াত নানা অপপ্রচারে মেতে ওঠে। কেন সেনাবাহিনীকে অভিযান পরিচালনার অনুমতি দেয়া হয়নি। কেনই বা এত সেনা অফিসার হত্যার পরও শেখ হাসিনা তাত্ক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি বলে যারা অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে তাদের উদ্দেশ্য কিন্তু ভিন্ন। সেদিনের সেই বাস্তবতাও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। 

বিরোধীপক্ষ শেখ হাসিনাকে সেনাবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করানোর অপচেষ্টায়ও লিপ্ত ছিল, এখনো আছে। নানা কৌশলে পিলখানা হত্যাযজ্ঞে শেখ হাসিনাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর হীন প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে মাত্র ক্ষমতায় এসেছে।

প্রশাসনিক কাঠামো ছিল তখনো স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের সাজানো বাগান। এত অল্প সময়ে সে বাগান ভাঙা সম্ভব ছিল না। নতুন করে প্রশাসন সাজাতে বুঝেশুনে একটু সময় নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এই সময়টাকে বেছে নিয়েছিল স্বাধীনতাবিরোধী চক্র। বিডিআর জওয়ানরা বেছে বেছে দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা অফিসারদের হত্যা করার পেছনে ছিল মিলিটারি ও প্যারামিলিটারিদের মধ্যে একটা বিভাজন তৈরি করা। সশস্ত্রবাহিনীতে বিভাজনটা তৈরি করতে পারলে ষড়যন্ত্রটা সফল হবে এমন প্রত্যাশার কমতি ছিল না সেদিন কিন্তু শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দূরদর্শিতার জন্য তাদের সব চক্রান্ত ভেস্তে যায়। শেখ হাসিনা একটি ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এড়ানোর নীতি গ্রহণ করেন। সেনাবাহিনীকে অভিযান পরিচালনার অনুমতি দিলে ঘনবসতিপূর্ণ ঝিগাতলা এলাকায় অসংখ্য সাধারণ মানুষের প্রাণহানি ঘটত। তাছাড়া আজকের মতো সেনাবাহিনীর হাতে আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না। 

যে প্রযুক্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব সেরকম প্রযুক্তি সেনাবাহিনীতে না থাকায় পরিস্থিতি নয়িন্ত্রণে বিকল্প উপায় গ্রহণ করা ছাড়া উপায় ছিল না। সেনাবাহিনীতে একটা বিভাজন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ারও সম্ভাবনা ছিল। তাই শেখ হাসিনা শান্তিপূর্ণ উপায়ে ঘটনা সামাল দিয়েছিলেন। বিদ্রোহীদের যৌক্তিক দাবি-দাওয়া মেনে নেয়ার আশ্বাস প্রদান করে বৈঠক করে বিদ্রোহ দমন করেছিলেন। বিদ্রোহীরা ধারণা করছিল তাদের ইনডেমনিটি দেয়া হবে কিংবা সাধারণ ক্ষমা করা হবে কিন্তু বিদ্রোহের পেছনে রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যায়। যে জন্য প্রচলিত আইনে বিদ্রোহীদের বিচারের আওতায় নিয়ে এসে বিচার কার্যও সম্পন্ন করা হয়। কলঙ্কিত বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে বিজিবি অর্থাত্ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ রাখা হয়। ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই। 

পিলখানা হত্যাযজ্ঞের ১০ বছর অতিক্রান্ত হলো। এই দশ বছরে দেশে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। আর্থ-সামাজিক অবস্থার ঘটেছে ব্যাপক উন্নয়ন। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে নানামুখী ষড়যন্ত্র চক্রান্ত চলছে। বিভিন্নভাবে শেখ হাসিনার সরকারকে বিপদগ্রস্ত করতে নানারকম অপতত্পরতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারের ভেতরে ষড়যন্ত্রকারীরা ঘাপটি মেরে বসে আছে এমন ধারণা সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। এই লেখা যখন লিখছি তখন চকবাজারে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে প্রায় ৭০ জনের মতো। আহত হয়েছেন অনেকে। নয় বছর আগে পুরান ঢাকায় নিমতলীতে এমন ঘটনায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির পেছনে মূল কারণ খুঁজতে প্রশাসন তত্পর হয়ে উঠেছে।

২০১০ সালের নিমতলীর ট্র্যাজেডির পরও মূল কারণ খুঁজে বের করা হয়েছিল। জানা গেছে, পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল কারখানা ও গুদামঘর দাহ্য পদার্থ জাতীয় বস্তুর কারণেই অগ্নি দগ্ধে এত বেশি ক্ষতির কারণ। সে সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুরান ঢাকা থেকে সব দাহ্য পদার্থজাতীয় কারখানা গুদামঘর সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন কিন্তু তার নির্দেশও কার্যকর করা হয়নি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কাজেই বুঝতে হবে সরকারের ভেতরেই বিরোধী শক্তি এখনো সক্রিয়। অতএব স্বাধীনতার পক্ষশক্তিকে সতর্কতার সঙ্গে পথ চলতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, শেখ হাসিনা দেশ, জাতির ‘মোড়’ ঘুরিয়ে দিয়েছেন। ‘মোড়’ ঘোরাতে গিয়ে তিনি নানা সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। মোড় ঘোরাতে গেলে দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়- এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ‘মোড়’ ঘোরানো কথাটিতে যে এত জাদু আছে তা কে জানত? তিনি ধর্ম, বর্ণ, দলমত, নির্বিশেষে সবার চেতনা ফিরিয়ে দিয়েছেন। জাতিকে আপেক্ষিক সত্য থেকে উচ্চতর সত্যে উপনীত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। এটাই যে জীবনের সার্থকতা ও জাতির সার্থকতা। এই বিবর্তনের মধ্যেই একটি জাতির অতিক্রমণ। যত বাধাই আসুক-শেখ হাসিনা এগিয়ে যাবেন। সমস্ত অপশক্তি প্রতিহত করে শেখ হাসিনার অগ্রযাত্রায় দেশবাসী তার পাশে থাকবে। পিলখানা হত্যাযজ্ঞে যারা নিহত হয়েছেন তাদের রক্ত বৃথা যাবে না।

– লেখক: কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

পাঠকের মন্তব্য