নারীকর্মীদের দক্ষতায় এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ 

পুরুষের তুলনায় বেতন কম। তবু দেশীয় বিনিয়োগে ৪০ লাখ মহিলা শ্রমিকের ওপর ভর করেই এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প। আগে বিদেশ থেকে এলেও এখন দেশীয় নকশায় কাজ হচ্ছে। রপ্তানির বড় বাজার আমেরিকা আর ইউরোপ। বাজার বাড়ছে কানাডা, জাপানে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বেশিরভাগটাই আসে পোশাকশিল্প থেকে। এই শিল্পে যুক্তদের বেশিরভাগই বাংলাদেশের গ্রামের মানুষ।

কারা কাজ করেন, কীভাবে : নুসরত জাহান। বয়স ২৪। পেশায় শ্রমিক। কাজ করেন ঢাকা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে আশুলিয়ার তানিম নিটওয়্যার লিমিটেডে। সকাল ৯টায় ঢোকেন। বের হন বিকেল ৫টায়। রপ্তানির সময় বেশিক্ষণ কাজ করতে হয়। বিনিময়ে ওভারটাইম মেলে। নুসরতের গ্রামের বাড়ি নাটোরে। জানালেন, বেতন পান সাড়ে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। ওভারটাইম হলে বেশি মেলে।

তানিম নিটওয়্যারের কর্মী উম্মে হাবিবা জানালেন, রপ্তানির চাপ থাকলে মাঝে মধ্যে রাতেও কাজ হয়। নুসরত, হাবিবা কাজ করেন কারখানার তিনতলায়। ৯০ জনের মধ্যে ৬৮ জন মহিলা। পুরুষেরা তদারকির দায়িত্বে। ৬তলা কারখানায় সব মিলিয়ে ৩৪০ জন কাজ করেন। মেয়েদের অধিকাংশই সেলাই মেশিনে কাজ করেন। তৃতীয় তলার সুপারভাইজার আজিজুল ইসলাম জানালেন, 'মহিলারা মেশিনে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে কাজ করে। এত সূক্ষ্মভাবে পুরুষেরাও পারে না। ফলে পোশাক কারখানায় মেয়েদের সংখ্যাই বেশি। তারপরও পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের বেতন কম।'

মহিলাকর্মীর সংখ্যা কত : বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে কাজ করছেন ৫০ লাখ শ্রমিক। ৮০ ভাগই নারী। সে হিসেবে গার্মেন্টসে কাজ করা মেয়েদের সংখ্যা ৪০ লাখের মতো। কারও কারও মতে, সংখ্যাটা আরো বেশি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-‌র সিনিয়র সহসভাপতি ফারুক হাসান বলেন, 'এই সেক্টরে সব মিলিয়ে ৪০ লাখের মতো মহিলা কাজ করে।

মাইনে কেমন : পোশাকশিল্পে কাজ করা শ্রমিকদের নূন্যতম বেতন ৫ হাজার ৩০০ টাকা। মালিকেরা বলছেন, শ্রমিকেরা গড়ে সাড়ে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা পান। বছর শেষে দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। বিজিএমইএ-র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, 'আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের দাম বাড়ছে না। কিন্তু উত্‍পাদন খরচ, শ্রমিকের বেতন বেড়েছে। তারপরও শ্রমিকদের বেতন যেন কোনও ভাবেই বকেয়া না থাকে, সেটি নিশ্চিত করার চেষ্টা করি।'

নকশা কোথা থেকে আসে : একটা সময় বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য পোশাকের সব নকশাই বিদেশি ক্রেতারা দিতেন। এখন অধিকাংশই বাংলাদেশের। নকশা তৈরির জন্য বিজিএমইএ বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে। নাম '‌বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অফ ফ্যাশান অ্যান্ড টেকনোলজি।' আরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স)-এর টেক্সটাইল ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন ডিপার্টমেন্টের প্রধান রেবেকা সুলতানা বলেন, বাংলাদেশের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্প এখন ঈর্ষণীয় পর্যায়ে। আরও উন্নতির প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের সে ভাবেই গড়ে তোলা হচ্ছে। পোশাকশিল্পে উন্নতির ফলে তাঁদের আগ্রহ বেড়েছে।

বিনিয়োগ কাদের : বাংলাদেশে পোশাকশিল্পে বিনিয়োগ পুরোটাই দেশীয়। তবে ব্যাক টু ব্যাক লেটার অফ ক্রেডিটের (এলসি) মাধ্যমে কিছু ঋণ মেলে। এক মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, 'বরাতের সময় বিদেশি ক্রেতা টাকা দেন না। তাঁদের হয়ে ওখানকার একটি ব্যাঙ্ক গ্যারান্টার হয়ে এলসি দেয়। নিশ্চয়তা দেয়, ক্রেতা টাকা না দিলে ব্যাঙ্ক দেবে। সেই ব্যাঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগ হয় বাংলাদেশের একটি ব্যাঙ্কের। ফলে ব্যাক টু ব্যাক এলসি হলে বাংলাদেশের ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ মেলে। কাজ শেষে সুদসহ টাকা কেটে বাকিটা গার্মেন্টস মালিককে দেয়। ফলে পুঁজি কম থাকলেও চালিয়ে নেওয়া যায়।'

আন্তর্জাতিক বাজার, বিক্রি কেমন : বাংলাদেশি পোশাকের বেশিটাই আন্তর্জাতিক বাজার। টাকার অঙ্কে ৩ হাজার কোটি ডলারের মতো। বাংলাদেশের রপ্তানির ৮২ ভাগই আসে পোশাক থেকে। পোশাক মালিকদের বক্তব্য, আগে বেশি লাভ হত। কচি ফ্যাশন লিমিটেডের অংশীদার আব্দুল ওয়াদুদ কচি জানালেন, 'একটা শার্ট তৈরি করতে ১০ ডলারের কাছাকাছি খরচ হয়। ১০ ডলারে তৈরি শার্ট পাঠিয়ে দেই। জার্মানি বা ফ্রান্সে তা বিক্রি হয় ২০ থেকে ২৫ ডলারে। খরচ মিটিয়ে অল্পই লাভ থাকে।'

কোথায় বিক্রি হয় : বিজিএমই সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের পোশাকের ২০ শতাংশের ক্রেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যায় ৬০ শতাংশ। এছাড়া জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, ডেনমার্ক, সুইডেন, কানাডা, জাপান, অষ্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত, তুরস্কেও যাচ্ছে। কানাডা, জাপানে বাজার বড় হচ্ছে।‌‌‌

পাঠকের মন্তব্য