প্রথম নারী বাংলাদেশী রেলচালকের কাজের অভিজ্ঞতা

চৌদ্দ বছর আগে বাংলাদেশ রেলওয়েতে চালক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন টাঙ্গাইলের মেয়ে সালমা খাতুন৷ আলাপকালে তিনি তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন৷

আপনি যে সময়ে বাংলাদেশ রেলওয়েতে যোগদান করেছেন তখন দেশের কোনো কর্মক্ষেত্রেই নারীদের তেমন একটা উপস্থিতি ছিল না৷ এমন প্রক্ষাপটে রেলওয়ের চালক হিসেবে যোগদান করার মতো একটি সাহসি সিদ্ধান্ত আপনি কেন এবং কীভাবে নিলেন ? 

সালমা খাতুন : ছোটবেলা থেকেই ব্যতিক্রমধর্মী কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল আমার৷ যেটা সাধারণত কেউ করে না তেমনি একটু চ্যালেঞ্জিং ধরণের কিছু একটা করার ইচ্ছা ছিল আমার৷ এ ইচ্ছা পূরণ করাটা আমার জন্য এতো সহজ ছিল না, কেননা আমি ছিলাম গ্রামের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে৷ এদিকে আমাকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্যও আমার বাবা-মায়ের ছিল না৷ গ্রামের স্কুল থেকে এসএসসি পাস করার পর অর্থনৈতিক টানাপড়েনের কারণে আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়৷ তবে আমি জেদ করি, আমি পড়বই৷ আবার বাবা-মা আমাকে তখন এইচএসসিতে ভর্তি করায়৷ এদিকে আমাদের পরিবারে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন লেগেই ছিল৷ 

যে কারণে এইচএসসি পাস করার পর আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, আমার পরিবার থেকে বলা হয় আর পড়াশোনা করানো সম্ভব নয়৷ তখন আমার মনে হলো আমার একটা কিছু করা দরকার যেন আমার পরিবারকে কিছুটা অর্থনৈতিক সহযোগিতা করতে পারি৷ আমি যখন একটা কিছু করার উপায় খুঁজছিলাম, তখন আমার বড় ভাই আমাকে একদিন বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখিয়ে বলল যে, তুমি চাইলে এখানে আবেদন করতে পার৷ চাকরির এ সুযোগটি আমার ইচ্ছার সাথে মিলে যায়, আর তাই আমি আবেদন করি৷

চাকরির পরীক্ষা দিতে গিয়ে কি একজন নারী হিসেবে আপনাকে কোনো ব্যতিক্রমধর্মী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে ?

সালমা খাতুন : লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমি মৌখিক পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পাই৷ মৌখিক পরীক্ষায় উপস্থিত কর্তাব্যক্তিরা খুব আগ্রহ নিয়েই আমার কাছে জানতে চান যে, এ চাকরিটি আমি করতে পারব কিনা? বললাম, আমি পারব, এ চাকরিটি আমি করতে চাই৷ তাঁরাও আমাকে উৎসাহিত করেছিলেন৷

আপনার প্রতিবেশী ও আপনার আত্মীয় স্বজনেরা এক্ষেত্রে আপনাকে কতটা সহযোগিতা করেছে বা আপনি তাঁদের কাছ থেকে কতটা সাড়া পেয়েছেন ?

সালমা খাতুন : চাকরিতে যোগদান করে ট্রেনিং এর জন্য আমাকে ঢাকায় চলে যেতে হয়৷ যে কারণে প্রথমে আমার প্রতিবেশীরা জানতো না আমি রেলওয়েতে চালক হিসেবে যোগদান করেছি৷ প্রায় এক বছর ট্রেনিং শেষে যখন আমি ফিরে আসি তখন আমার আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা বিষয়টি জানতে পারে৷ বাংলাদেশের প্রথম নারী রেলচালক হয়ে আমি তাঁদের গর্বিত করেছি- এই বলে তাঁরা সবাই আমাকে উৎসাহিত করেছে৷

চাকরির শুরুতে আপনি কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন ?

ব্যক্তিগতভাবে আমার দীর্ঘ ১৫ বছরের কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে দেখেছি তা হলো, একজন পুরুষ সহকর্মীকে বাসায় পৌঁছে তাদের গৃহস্থালির কাজকর্ম বা সন্তানদের সামলানোর বিষয়ে মনোযোগ দিতে হয়না৷ কিন্তু কর্মক্ষেত্রে একজন পুরুষ সহকর্মীর মতো একজন নারী কর্মীকেও সমান সময় অতিবাহিত করতে হয়৷ নারীকর্মীদের কর্মক্ষেত্রে সহনশীল মাত্রার কর্ম ঘণ্টা নির্ধারণ ও তার বাস্তব রূপ দেয়া আমার দাবি৷

সালমা খাতুন : আমি যখন চাকরিতে যোগদান করি তখন আমার বিভাগে ৫০০ পুরুষ কর্মী ছিলেন৷ তার বিপরীতে আমিই ছিলাম একমাত্র নারী কর্মী৷ আমি যখন ট্রেনিং এ যাই তখন আমার পুরুষ সহকর্মীদের অনেকেই আমাকে দেখতে আসতো এই ভেবে যে রেলওয়েতে একজন মেয়ে সহকর্মী এসেছে৷ তাঁদের অনেকেই বলতো যে এটি অনেক চ্যালেঞ্জিং একটি পেশা৷ তবে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে, আমি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার চেষ্টা করব৷ এই মনোবল থাকার কারণেই সম্ভবত আমি আজ ১৪ বছর ধরে সফলতার সাথে কাজ করে আসছি৷ অনেক সাহস নিয়ে এ কাজটি করতে হয়েছে আমাকে৷ এ সময়ে অনেকেই আবার আমাকে বলেছে, আমরা যদি পারি তুমি কেন পারবে না৷ আমার সহকর্মীরা সকলেই আমাকে সহযোগিতা করেন৷ তা না হলে তো এতদুর আসতে পারতাম না৷

আপনার শিক্ষা জীবন কেমন ছিল ?

সালমা খাতুন : এইচএসসি পাস করে আমি চাকরিতে যোগদান করি৷ তবে পড়াশোনার প্রতি আমার সবসময়ই আগ্রহ ছিল৷ সে কারণে আমি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি৷ আর চাকরি করার পাশাপাশি আমি বিএড পাস করি৷ পরে, কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে আমি এমএ পাস করি৷

একজন নারী চালক হিসেবে কর্মক্ষেত্রে আপনি কি ধরণের পরিস্থিতির মুখোমুখি হন ?

সালমা খাতুন : এ মুহূর্তে আমি মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছি৷ একটি বিষয় হলো, নারী পুরুষ সবাইকেই এ পেশাটিতে অত্যন্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে হয়৷ যেমন রাস্তার উপর থেকে কেউ পাথর ছুড়ে মারে, সে জন্য সতর্ক থাকতে হয়৷ সবসময় সিগনালের দিকে খেয়াল রাখতে হয়৷ বিপদ এড়ানোর জন্য প্রতিটি মুহূর্তে সচেতন থাকতে হয়৷ তবে একজন নারী চালক হিসেবে আমি বলব আমাকে একটু বেশি চাপ নিতে হয়, কেননা আমার সন্তানদের রেখে আমি কাজে যাই৷ যদিও আমার স্বামী আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন তারপরও, কাজ থেকে ফিরতে দেরি হলে আমি বাচ্চাদের জন্য টান অনুভব করি৷ 

একজন নারী চালক হিসেবে আপনি কীভাবে যাত্রীদের মুখোমুখি হন ?

সালমা খাতুন: আসলে যাত্রীরা আমাকে দেখে খুব অবাক হয়৷ প্রথম দিকে আরো বেশি অবাক হতো৷ যাত্রীরা অনেকেই প্রশ্ন করতো, আপনি মেয়ে মানুষ ট্রেন চালাচ্ছেন? আবার অনেক মেয়েই বলে যে আপনাকে দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হই৷

১৪ বছরের কর্মজীবনের বিশেষ কোনো বিষয়ে কি আপনি কিছু বলবেন ?

সালমা খাতুন: আসলে আমার যে বিষয়টি খুব খারাপ লাগে সেটি হলো পথচারীদের অসচেতনতা৷ অনেক সময়ই দেখা যায় পথচারীদের অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে, যে বিষয়গুলো আমার কাছে অত্যন্ত খারাপ লাগে৷

পাঠকের মন্তব্য