মোবাইল ফ্লেক্সিলোড প্রতারণা : দুই ভাই এখন কোটিপতি

মিয়াপাড়া, পুকুরপাড় ও আজিমনগর ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার তিন গ্রাম। মিয়াপাড়া গ্রামে পাশাপাশি নির্মাণাধীন দুটি দালান। একটি ফারুক হোসেন মাতবরের। অন্যটি তার ভাই জুয়েল হোসেন মাতবরের। বড় ভাইয়ের বয়স ২৮, ছোট ভাই ২৫ বছরের। প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোতে পারেননি দুই ভাইয়ের কেউই। পেশাগত পরিচয়ও নেই। আয়ের বৈধ উৎস না থাকলেও দুই ভাই পাঁচতলার ফাউন্ডেশন দিয়ে তুলছেন দালান। দুই ভাইয়ের নামেই রয়েছে ডজনখানেক প্রতারণার মামলা।

মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসকে কেন্দ্র করে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করেছেন ভাঙ্গা উপজেলার এ তিন গ্রামের অনেকেই। প্রতারণার টাকায় তাদের অনেকেই সুদৃশ্য দালান তৈরি করেছেন।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্যমতে, ২০১০ সালের আগে গ্রামীণ, একটেলের (বর্তমান রবি) মতো বিভিন্ন সেলফোন অপারেটরের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে যারা প্রতারণা করতেন, তারাই মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ঘিরে একই প্রতারণা করছেন। এদের সিংহভাগই ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার। সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে এসব প্রতারককে একাধিকবার গ্রেফতারও করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রতিবারই জামিনে মুক্তি পেয়ে একই প্রতারণায় নেমে পড়েন তারা।

কয়েকজন প্রতারকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা মূলত দুই ধরনের আর্থিক প্রতারণা করে থাকে। এর মধ্যে যারা প্রযুক্তিগত বিষয়ে বেশি দক্ষ, তারা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের বিভিন্ন গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করে। এ চক্রের কিছু সদস্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিকাশের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের এজেন্টদের খাতা থেকে ছবি তুলে নাম্বার সংগ্রহ করে। এরপর একটি ফোন দিয়ে ওই নম্বরে কল করে নিজেকে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে গ্রাহকের গোপন পিন নম্বর জানার চেষ্টা করে। পিন নম্বর পাওয়ার পর প্রতারকদের হাতে থাকা আরেকটি ফোন থেকে দ্রুত ওই অ্যাকাউন্টে লগইন করে। এ সময় গ্রাহকের ফোনে একটি ভেরিফিকেশন কোড চলে যায়। ওই কোড গ্রাহকের কাছ থেকে জেনে অ্যাকাউন্টে এন্ট্রি করে। পরে গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা নিজেদের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে নেয়।

আরেকটি চক্র প্রতারণা করে লটারি ঘিরে। তারা মূলত দৈবচয়ন ভিত্তিতে বিভিন্ন নাম্বারে ফোন করে নিজেকে সেলফোন অপারেটরের কর্মী পরিচয় দেয়। তাদের প্রতারণার ভাষ্য থাকে, ‘আপনি লটারি জিতেছেন। পুরস্কার হিসেবে আপনাকে ১০ লাখ টাকা দেয়া হবে। এ পুরস্কার বুঝে নিতে চাইলে আপনাকে আমাদের কাছে ১০ হাজার টাকা পাঠিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। তারপর পুরস্কারের অর্থ আপনার ঠিকানায় পৌঁছে যাবে।’

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যের ভিত্তিতে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় অনুসন্ধানে গিয়ে দেখা যায় প্রতারণার বিশদ চিত্র। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভাঙ্গার চামড়াবাড়ী গ্রামে ২০০৪ সালে এক যাত্রাশিল্পী প্রথম সেলফোন অপারেটরের কর্মকর্তা পরিচয়ে প্রতারণার মাধ্যমে ৩০০ টাকার একটি রিচার্জ কার্ড হাতিয়ে নেন। পরে কৌশলটি শিখিয়ে দেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আজিমনগরের ফারুক হোসেন মাতবরকে। বড় ভাইয়ের কাছ থেকে প্রতারণার অভিনব পন্থা রপ্ত করেন জুয়েল। এরপর টানা ১১ বছর সেলফোন ব্যবহারকারীদের পুরস্কার জেতার সুসংবাদ দিয়ে কয়েক লাখ টাকার ফ্লেক্সিলোড হাতিয়ে নেন এই দুই ভাই। নিজ গ্রামের অন্য কিশোরদের মধ্যেও প্রতারণার এ কৌশল ছড়িয়ে দিয়েছেন তারা।

ফ্লেক্সিলোড হাতিয়ে দৈনিক খরচটা চললেও কারোরই ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। দালানও ওঠেনি। ২০১৩ সাল পর্যন্তও এ দুই ভাই পরিবারের সঙ্গে টিনের ছাপরা ঘরেই বসবাস করতেন। বছর দুয়েক পর হঠাৎ করেই প্রতারণার ভিন্ন কৌশলে টাকা আসতে থাকে তাদের হাতে। বসতভিটায় প্রথমে ফারুক একটি দোতলা বাড়ি করেন। গত বছর ছোট ভাই জুয়েল আরেকটি দোতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। এরপর ধীরে ধীরে তাদের অনুসারী আজিমনগর, মিয়াপাড়া ও পুকুরপাড় গ্রামের ১৮-২০ বছর বয়সী কিশোররাও শুরু করে দালান নির্মাণ। প্রতারণার টাকায় বিলাসী জীবন যাপনও করছে এসব কিশোর।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মাওয়া-ফরিদপুর প্রধান সড়কের পাশে পুলিয়া বাজারের মাঝ দিয়ে চলে গেছে সরু রাস্তা। ওই রাস্তা দিয়ে ১২ কিলোমিটার গেলে আজিমনগর। রাস্তার প্রথম তিন কিলোমিটার পাকা। এরপর দুই কিলোমিটার আধাপাকা। বাকি সাত কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা, যেখানে সাইকেল বা মোটরসাইকেল ছাড়া অন্য কোনো বাহন চলতে পারে না। গ্রামবাসীও হেঁটে সাত কিলোমিটার সড়ক পাড়ি দেয়। কাঁচা-পাকা সড়কটির শেষ মাথায় আজিমনগর। গ্রামটিতে ফসলি জমির তুলনায় বাঁশঝাড় ও আম-কাঁঠালের জমির পরিমাণই বেশি।

রোববার আজিমনগরে ঢুকতেই স্থানীয় কিশোরদের বাধার মুখে পড়তে হয়। সেখানে সাংবাদিক পরিচয় গোপন করে কৌশলে বিলের ধারে গিয়ে দেখা যায় ফারুক ও জুয়েলের বাড়ি দুটি। ফারুকের বাড়ির একটু দূরেই শাজাহান হাওলাদারের ছেলে টোকান হাওলাদারের পাকা বাড়ি। ফারুকের অন্যতম সহযোগী টোকানও দীর্ঘদিন ধরে এ প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত।

আজিমনগরের পাশের গ্রাম মিয়াপাড়া। এ গ্রামেও দালানঘর তুলেছেন প্রতারকরা। মিয়াপাড়ার জাফর ফকিরের ছেলে জাকির সদ্য নির্মাণ করেছেন একটি পাকা দালান। ফারুক ও জুয়েলের মতো জাকিরেরও পেশাগত পরিচয় নেই। শুধু প্রতারণা করেই অজপাড়াগাঁয় দালানের মালিক হয়েছেন তিনি। জাকিরের অন্যতম সহযোগী নশু মাতবর। তিনিও প্রতারণার অর্থে গড়েছেন দালানবাড়ি। নশু মাতবরের বাড়ির পাশে বাদল হাওলাদারের বাড়িটিতেও জৌলুস আছে। শিক্ষাগত বা পেশাগত পরিচয় না থাকলেও প্রতারণার মাধ্যমে পাকা দালানের মালিক হয়েছেন তিনি। এ গ্রামে প্রতারকদের ২০-২৫টি পাকা বাড়ি রয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে পুকুরপাড় গ্রামেও। সেখানেও প্রতারকদের রয়েছে দালানকোঠা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রথমে প্রতারণার বিষয়টি আজিমনগর, মিয়াপাড়া ও পুকুরপাড়ে থাকলেও পরবর্তী সময়ে ফারুকের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে এ প্রতারণার জাল ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের আরো ১৫ গ্রামে। গ্রামগুলো হলো তাড়াইল, ছড়িলদিয়া, ঈশ্বরদী, পুলিয়া, ব্রাহ্মণপাড়া, ঘোষগ্রাম, জাঙ্গালপাশা, ডুয়াটি, পাত্রাইল, দীঘিরপাড়, ভাসসা, দেওড়া, সোনামুখী, রায়নগর ও চামড়াবাড়ী। গ্রামগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থা উন্নত না হলেও সেখানকার সব বয়সী কিশোরদের হাতেই রয়েছে দু-তিনটি করে স্মার্টফোন। তাছাড়া কিশোরদের বাচনভঙ্গিতেও কোনো জড়তা বা আঞ্চলিকতার টান নেই। প্রমিত বাংলায় কথা বলছে সবাই।

স্থানীয় একটি চায়ের দোকানে কথা হয় রায়নগরের কয়েকজন কিশোরের সঙ্গে। কীভাবে তারা প্রতারণার কাজটি করে? জানতে চাইলে তারা বলে, পাশের গ্রাম মিয়াপাড়ায় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এক সপ্তাহ প্রশিক্ষণ নিলেই যে কেউ এটা রপ্ত করতে পারে। এ প্রশিক্ষণ নিতে রাজবাড়ী, বরিশাল, ফেনী ও কুমিল্লা থেকে অনেক কিশোর ও তরুণ আসে মিয়াপাড়ায়। এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যায়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভাঙ্গা সার্কেল) রবিউল গাজী বণিক বার্তাকে বলেন, এখানকার কিশোর-যুবকদের পড়ালেখায় নিরুৎসাহিত করে প্রতারণার কৌশল শেখানো হচ্ছে। জঙ্গিবাদ ও মাদকের মতো সমস্যাটি ক্রমেই ভাঙ্গা উপজেলায় মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে। প্রায়ই প্রতারণার অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়। ছাড়া পেয়ে আবারো প্রতারণায় জড়িয়ে পড়ছে তারা। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে এদের এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে পুলিশ।

অর্থিক প্রতারণাসংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে কাজ করে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। বিকাশের মাধ্যমে প্রতারণার বেশকিছু মামলা তদন্ত করতে গিয়ে ভাঙ্গার প্রতারকদের বিষয়ে জানতে পারে তারা।

পিবিআই ঢাকা মেট্রোর বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ বণিক বার্তাকে বলেন, প্রতারণার অর্থে ভাঙ্গার বেশ কয়েকটি গ্রামে দোতলা ও তিনতলা বাড়িও হয়েছে। এদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেয়া না হলে এ প্রতারণা পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়বে।

পাঠকের মন্তব্য