বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ, ১৯৭১ এর ভাষণ

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ, ১৯৭১এর ভাষণ

(গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের তথ্য মন্ত্রণালয়ের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা বিভাগ-ডিএফপি হতে প্রকাশিত ভিডিওটি হতে শুনে হুবহু বাংলায় লেখা। ভিডিওটিতে বক্তব্যের ইংরেজী অনুবাদও সংযুক্ত রয়েছে-সম্পাদক)

  মুজিব ভাই এসে গেছেন, তাঁকে আপনারা স্লোগান দিয়ে অভিবাদন দেন, 
“শেখ মুজিবের পথ ধরো”, ……. “বাংলাদেশ স্বাধীন করো”
“মুজিব ভাইয়ের পথ ধরো”, …… “বাংলাদেশ স্বাধীন করো”
“বাঁশের লাঠি তৈরি করো”, …….. “বাংলাদেশ স্বাধীন করো” 
“বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধরো”, ………. “বাংলাদেশ স্বাধীন করো”
 
ভাইয়েরা আমার,

আজ-দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন, আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্রগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ, বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তাঁর অধিকার চায়। কি অন্যায় করেছিলাম? নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের মানুষ সম্পুর্ণভাবে আমাকে-আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেমব্লি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করবো এবং এদেশকে আমরা গড়ে তুলবো। 

এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ২৩ বচ্ছরের করুণ ইতিহাস, বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস, ২৩বছরের ইতিহাস মুমূর্ষ নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস, বাংলার ইতিহাস এ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আয়ুব খাঁন মার্শাল'ল জারি করে ১০বছর আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ৬-দফা আন্দোলনের ৭ই জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে আয়ুব খাঁনের পতন হওয়ার পরে যখন ইয়াহিয়া খাঁন সাহেব সরকার নিলেন- তিনি বললেন, “দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন-গণতন্ত্র দেবেন”, আমরা মেনে নিলাম। 

তারপরে অনেক ইতিহাস হয়ে গেলো, নির্বাচন হলো। আপনারা জানেন, দোষ কি আমাদের? আইজকে তিনি, আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খাঁন সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি, আপনারা জানেন, আলাপ-আলোচনা করেছি। আমি, শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাঁকে অনুরোধ করলাম- ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেননা, তিনি রাখলেন, ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, প্রথম সপ্তাহে মার্চ মাসে হবে। তিনি মাইনা নিলেন। আমরা বললাম, ঠিক আছে আমরা এসেমব্লিতে বসবো। আমরা আলাপ আলোচনা করবো, আমি বললাম বক্তৃতার মধ্যে, এসেমব্লির মধ্যে আলোচনা করবো- এমনকি এও পর্যন্ত বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশী হলেও একজন যদিও সে হয় তাঁর ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব। 

জনাব ভুট্টো সাহেব এখানে এসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন, যে আলোচনার দরজা বন্ধ না, আরো আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতৃবৃন্দ তাঁদের সঙ্গে আলাপ করলাম- আপনারা আসুন-বসি, আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করি। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি এখানে আসে, তাহলে কসাইখানা হবে এসেমব্লি। তিনি বললেন, যে যাবে, তাকে মেরে ফেলে দেওয়া হবে, যদি কেউ এসেমব্লিতে আসে, তাহলে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত দোকান জোর করে বন্ধ করা হবে। তারপরেও কেউ যদি আসে তাকে ছান্নাছাড় করা হবে। আমি বললাম, এসেমব্লি চলবে। তারপরে হঠাৎ ১ তারিখে এসেমব্লি বন্ধ করে দেওয়া হলো।

ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হিসাবে এসেমব্লি ডেকেছিলেন। আমি বললাম যে, আমি যাবো। ভুট্টো সাহেব বললেন তিনি যাবেননা। ৩৫জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে আসলেন। তারপর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো, দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। বন্ধ করে দেয়ার পরে এদেশের মানুষ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠল। 

আমি বললাম, শান্তিপুর্ণভাবে আপনারা হরতাল পালন করেন। আমি বললাম, আপনারা কল-কারখানা, সব কিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিলো। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেড়িয়ে পড়লো, তাঁরা শান্তিপুর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য দৃঢ়স্থির প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। কি পেলাম আমরা? যে আমার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি, বহিঃশত্রুর আক্রমন থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য। আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরীব-দুঃখীনী আর্ত মানুষের বিরুদ্ধে- তার বুকের উপর হচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু, আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু,-আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি, যখনই এদেশের মালিক হবার চেষ্টা করেছি- তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। 

তারা আমাদের ভাই, আমি বলেছি তাঁদের কাছে এ কথা, যে আপনারা কেনো আপনার ভাইয়ের বুকে গুলি মারবেন? আপনাদের রাখা হয়েছে, যদি বহি:শত্রু আক্রমণ করে, তা থেকে দেশটাকে রক্ষা করার জন্য। তারপরে উনি বললেন, যে আমার নামে বলেছেন, আমি নাকি বলে স্বীকার করেছি, অমি নাকি ১০ই তারিখে রাউন্ডটেবিল কনফারেন্স হবে। আমি ওনাকে এ কথা বলে দেবার চাই, আমি তাকে তা বলি নাই। টেলিফোনে  আমার সঙ্গে কথা হয়, তাকে আমি বলেছিলাম, জনাব এহিয়া খাঁন সাহেব আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান, ঢাকায় আসেন, কিভাবে আমার গরীবের উপরে, আমার বাংলার মানুষের বুকের উপর গুলি করা হয়েছে। কি করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে, কি করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন, তারপরে আপনি ঠিক করুন, আমি এই কথা বলেছিলাম। 

আমিতো অনেক আগেই বলেছি, কিসের আরটিসি, কার সঙ্গে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে, তাঁদের সঙ্গে বসবো? আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে, বা আমাদের সঙ্গে আলোচনা করে ৫ঘন্টা গোপনে বৈঠক করে যে বক্তৃতা তিনি করেছেন, এবং, যে বক্তৃতা করে এসেম্বলি করেছেন, সমস্ত দোষ তিনি আমার উপর দিয়েছেন, বাংলার মানুষের উপর দিয়েছেন। আমি পরিষ্কার মিটিংয়ে বলেছি, এবারের সংগ্রাম আমার মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।

ভাইয়েরা আমার,

২৫তারিখে এসেমব্লি কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি ১০তারিখে এসে বলে দিয়েছি যে, ঐ শহীদের রক্তের উপর পাড়া দিয়ে আরটিসিতে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারেনা। এসেমব্লি কল করেছেন- আমার দাবি মানতে হবে প্রথম- (১) সামরিক আইন মার্শাল-ল উইথড্র করতে হবে; (২) সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে; (৩) যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে;  আর, (৪) জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপরে বিবেচনা করে দেখবো, আমরা এসেমব্লিতে বসতে পারবো, কি পারবো না। এর পূর্বে, এর পূর্বে এসেমব্লিতে বসা, আমরা এসেমব্লিতে বসতে আমরা পারি না। জনগণ সে অধিকার আমাকে দেয় নাই। ভায়েরা আমার, তোমরা আমার উপর বিশ্বাস আছে?

আমি, আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিস্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্টকাচারী, আদালত-ফৌজদারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরীবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সেইজন্য সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলো আছে সেগুলোর হরতাল কাল থেকে চলবেনা- রিকসা-ঘোড়াগাড়ি চলবে, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে- শুধু, সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জর্জকোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোনো কিছু চলবেনা। ২৮তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন।

এরপরে, যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের উপর হত্যা করা হয়- তোমাদের সবার কাছে আমার অনুরোধ রইলো, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে, সবকিছু-আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমারা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। 

তোমরা আমার ভাই , তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবেনা। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। ভালো হবে না, সাত কোটি মানুষকে দাবাইয়া রাখতে পারবানা। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের ডোবাতে পারবে না।

আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগের থেকে যদ্দুর পারি তাঁদের সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা পারেন, আমার রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা-পয়সা পৌঁছিয়ে দেবেন। আর, এই ৭দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছেন, প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাঁদের বেতন পৌঁছাইয়া দেবেন। সরকারী কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি, তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে, খাজনা - ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো-কেউ দেবে না। শুনেন, মনে রাখবেন, শত্রু বাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটপাট করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-নন বাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই, তাঁদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়। মনে রাখবেন, রেডিও-টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনে, তাহলে কোন বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না। ২ঘন্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাঁদের মায়নাপত্র নেবার পারে। কিন্তু পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। 
টেলিফোন-টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বিদেশের সঙ্গে নিউজ পাঠাতে হলে আপনারা চালাবেন। কিন্তু, যদি এই দেশের মানুষকে খতম করার চেস্টা করা হয়-বাঙালিরা বুঝেশুনে কাজ করবেন। তবে আমি অনুরোধ করছি, আপনারা আমাদের ভাই, আপনারা দেশকে একেবারে জাহান্নামে ধ্বংস করে দিয়েন না, জীবনে আর কোনদিন আপনাদের মুখ দেখাদেখি হবে না। যদি আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ফায়সালা করতে পারি, তা হলে অন্তত: ভাই ভাই হিসাবে বাস করার আমার এই  দেশে মিলিটারি শাষণ চালানোর চেষ্টা আর করবেন না।   

দ্বিতীয় কথা, প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, প্রত্যেক ইউনিয়নে, প্রত্যেক সাব-ডিভিশনে  আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল। এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। 

মনে রাখবা, ''রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ''।
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম''। “জয় বাংলা”।

(ভিডিওতে শুনে বাংলায় হুবহু লিখেছেন- মো: মাহমুদ হাসান, ভূতপূর্ব কলেজ অধ্যক্ষ ও সমাজ গবেষক, ঢাকা, তারিখ-০৬ই মার্চ, ২০১৭, বিকাল ৩.৩০ মিনিট) 

 

পাঠকের মন্তব্য