ডাকসুর ভিপি নূর'কে নিয়ে আশা ও আশঙ্কা

উপ-সম্পাদকীয়, বিভুরঞ্জন সরকার : ডাকসুর ভিপি পদে নির্বাচিত হয়ে চমক সৃষ্টি করেছেন নুরুল হক নূর। ক্যাম্পাসে তিনি অপরিচিত নন, বরং অতিপরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ কোনো নেতা তিনি ছিলেন না। তাকে ‘শিবির’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হলেও তিনি নিজে দাবি করেছেন যে স্কুল থেকেই তিনি ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে তিনি মহসিন হল শাখার কমিটিতেও পদ পেয়েছিলেন। তবে ছাত্রলীগ তাকে ধারণ করতে পারেনি। কোটা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই মূলত নূর সামনে চলে আসেন । ওই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। মার খেয়েছেন। জেল খেটেছেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি। কারণ যাই হোক না কেন কোটা আন্দোলন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যাপক সমর্থন পেয়েছিলো। এমন কি সরকার সমর্থক ছাত্রলীগের অনেকেই কোটা আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। কোটা আন্দোলন ছিলো মূলত সংগঠননির্বিশেষে সব শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। এই আন্দোলনে সাহসী ভূমিকা পালন করে ক্যাম্পাসে নূর জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন । তার পেছনে ব্যাপক ছাত্র সমাজের সমর্থন আছে। তাদের ভালোবাসা যে তিনি পেয়েছেন তার বড় প্রমাণ ডাকসুতে ভিপি পদে নির্বাচিত হওয়া।

তবে নুরুল হক নূরকে কিন্তু সংগঠনবহির্ভূত বা স্বতন্ত্র প্রর্থী বলা যাবে না। তার একটি সংগঠন আছে, নাম ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’। এই সংগঠনের ব্যানারেই তিনি এবং তার সমর্থকরা ডাকসু নির্বাচন করেছেন। নূর এখন হয়তো প্রচলিত (ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র দল, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র মৈত্রী ইত্যাদি) কোনো সংগঠনের সদস্য নন কিন্তু তারও একটি সংগঠন আছে। তার এই সংগঠনের পেছনে হয়তো কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থন নেই। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্টতা না থাকাই হয়তো এখন তার জন্য বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে তার জনপ্রিয়তার কারণে তাকে নিয়ে রাজনীতিতে টানাটানি চলবে। যার লক্ষণ ডাকসু নির্বাচনের পর স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাকে প্রভাবিত করে পক্ষে টানার একটি প্রতিযোগিতা এখন শুরু হয়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ তথা সরকারবিরোধী শক্তি চাইছে তাকে ব্যবহার করে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে যাতে সরকার বেকায়দায় বা চাপে পড়ে। আমাদের দেশে কিছু সংগঠন আছে, কিছু নেতা আছেন যারা ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল’। এরা উচ্চ মার্গের কথা বলেন, সবার সব কিছুতে খুঁত ধরেন কিন্তু নিজেরা নিজের যোগ্যতা বা ক্ষমতায় নিখুঁত কিছু করতে পারেন না। এরা সাধারণত আটা-ময়দা গুলিয়ে রাখেন, কোথাও ধোঁয়া দেখলেই তাদের রুটি-পরোটা ভাজার শখ হয়। এই শক্তি-গোষ্ঠী এখন নুরুল হক নূরের পেছনে লাগবে। সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে তাকে নানা ধরনের উপদেশ-পরামর্শ দেবেন। প্ররোচিত করবেন। নূর ভবিষ্যতে কতো দূর যেতে পারবেন তা নির্ভর করছে এখন তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর। তিনি কি করবেন? কোন পথে হাঁটবেন?

ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পুনরায় নির্বাচন দাবি করা হয়েছে পরাজিত প্রার্থী এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে। তবে ছাত্রলীগ ফলাফল মেনে নিয়েছে। নুরুল হক নূর পুনর্নির্বাচন দাবি করলেও তার অবস্থান নমনীয়। তিনি ছাত্রলীগের সভাপতির সঙ্গে কোলাকুলি করে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, আবার নির্বাচন প্রত্যাখ্যানকারীদের সঙ্গে একাত্মতাও প্রকাশ করেছেন।

ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সব প্রার্থীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে গণভবনে গিয়েছেন। সেখানে ছাত্রলীগের নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সামনে নূর তার বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তার পা ছুঁয়ে সালাম করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখে নিজের মায়ের প্রতিচ্ছবি দেখার কথা বলেছেন। সব মিলিয়ে গণভবনে যে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয় তা থেকে অনেকের কাছে এটা মনে হয় যে, নূর বুঝি ছাত্রলীগেই ফিরে যাচ্ছেন।

কেন এমন ধারণা বা আশঙ্কা? নূর যদি তার বর্তমান অবস্থানে থেকেই ডাকসু ভিপির দায়িত্ব পালন করেন তাহলে অসুবিধা কোথায়? তাকে এখনই কেন কোনো না কোনো খোয়ারে গিয়ে ঠাঁই নিতেই হবে? ডাকসু ভিপি হিসেবে তিনি সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবেন, তার কাছে তো এটাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা। অন্য কারো লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে তিনি কেন ব্যবহৃত হবেন?

কোটা আন্দোলনের প্রতি ছিলো সব শিক্ষার্থীদের সমর্থন। কিন্তু ডাকসুর পুনর্নির্বাচনের প্রতি সব শিক্ষার্থীদের সমর্থন আছে বলে মনে হয় না। কোটা আন্দোলন বিস্তৃত হয়েছিলো সব উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, দেশজুড়ে। ডাকসুর পুনর্নির্বাচনের দাবিতে সেভাবে সারাদেশে, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আন্দোলন হবে না। কোটায় সফল, তাই নূর যেকোনো ইস্যুতে আন্দোলন করতে চাইলে সফল হবেন সেটা মনে করার কারণ নেই।

নূর ভবিষ্যতের জন্য আশা জাগিয়েছেন। তার মধ্যে নেতৃত্বগুণের সম্ভাবনা দেখছেন অনেকেই। কিন্তু তিনি যদি হিসেবি না হন, তিনি যদি এতোদিন ধরে সঞ্চিত তার জনপ্রিয়তার অপব্যহার বা অপচয় করেন, তাহলে তাকে নিয়ে তৈরি হওয়া আশা পরিণত হবে আশঙ্কায়। ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বেশি টানাটানি করে ক্যাম্পাসের বাইরের যারা নানা ‘কুসুমচয়ন’ করছেন তারা নূরের কতোটুকু হিতাকাক্সক্ষী সেটা বুঝতে হবে তাকেই।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

পাঠকের মন্তব্য