প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান'কে ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ 

প্রজন্মকন্ঠ এর পক্ষ হতে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো: জিল্লুর রহমানকে ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ 

২০শে মার্চ, ২০১৯ মহান ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও ভাষাসৈনিক, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, আাওয়ামী লীগের দু:সময়ের কান্ডারি, ৭১বছরের আওয়ামী লীগের ইতিহাসে সর্বাধিক চারবার নির্বাচিত সাধারন সম্পাদক প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো: জিল্লুর রহমানের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। প্রজন্মকন্ঠ এর পক্ষ হতে আমরা এই মহান নেতার মহাপ্রয়ান দিবসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

মো: জিল্লুর রহমান এর জন্ম ও শিক্ষা জীবন

১৯২৯ সালের ৯ই মার্চ তারিখে বর্তমান ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জেলার (তদানীন্তন মহকুমার) পরীতলা গ্রামের মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরবের বাসিন্দা স্বনামধন্য আইনজীবি ‘মেহের আলী মিয়া’ ছিলেন ময়নসিংহ লোকাল বোর্ডের (বর্তমান সময়ের পৌরসভা) চেয়ারম্যান ও ময়মনসিংহ ডিষ্ট্রিক্ট বোর্ডের সদস্য। জিল্লুর রহমান ময়মনসিংহ জেলা শহরে তার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র মো: জিল্লুর রহমান ১৯৪৫ সালে ভৈরব কে. বি. হাই স্কুল হতে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ম্যাট্রিকুলেশন (বর্তমান এসএসসি সমমান) পাস করেন, যা সে সময়ে ছিলো বিরল ঘটনা। ১৯৪৭সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমান ঢাকা কলেজ) হতে ইন্টারমিডিয়েট অব আর্টস আইএ (বর্তমান এইচএসসি সমমান) পাশ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইতিহাস বিষয়ে ১৯৫২ সালে বিএ (সন্মান) ও ১৯৫৪ সালে এমএ পাশ করেন। একই সাথে ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে আইন বিষয়ে ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি ১৯৫৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।

অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস আইভী ও সুযোগ্য সন্তানেরা

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি (১২ই ফেব্রুয়ারি ২০০৯-২০মার্চ ২০১৩), মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বর্ষীয়ান রাজনীতিক জিল্লুর রহমানের আজীবন অনুপ্রেরণার উৎস, অন্যতম সহযোদ্ধা ও রাজনৈতিক সহকর্মী, বাংলাদেশের সঙ্কটময় মূহুর্তগুলিতে সাহসের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার সঠিক পরামর্শদাত্রী স্ত্রী আইভী রহমানও ছিলেন বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগের সঙ্কট কালসমূহের সুদক্ষ লড়াকু সৈনিক। ২১শে আগষ্ট গ্রেনেড হামলায় মারাত্মক আহত হয়ে মৃত্যুকালে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। জাতীয় মহিলা সংস্থার সাবেক চেয়ারপার্সন আইভি রহমান মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদিকা হিসেবেও দায়িত্বরত ছিলেন।  বিশ্বের ইতিহাসের বর্বরতম হামলা-রাজনৈতিক জনসভায় প্রকাশ্য দিবালোকে একুশে আগষ্ট এর গ্রেনেড হামলার শিকার হয়ে পরিসমাপ্তি ঘটে কিংবদন্তী তুল্য সূখী রাজনৈতিক দম্পতির একটি বৃন্তে দুটি ফুলের একটি ফুল। এই সূখী দম্পতির তিন সন্তান, এক পুত্র ও দুই কন্যা। পুত্র মো: নাজমুল হাসান (পাপন)-বর্তমানে মাননীয় সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি। 

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমান, মো: জিল্লুর রহমান ও ভাষা আন্দোলন

ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র মো: জিল্লুর রহমান ১৯৪৭ সালে প্রথম শেখ মুজিবুর রহমানের সংস্পর্শে আসেন। “দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট অদ্ভুত রাষ্ট্র পাকিস্তানের সাথে পূর্ব বাংলা টিকতে পারবে না, সৃষ্টি করতে হবে বাংলাদেশ”-বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা (পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা) শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সে সময়কার সকল আন্দোলন ও সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯৪৮ সালে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও ১৯৪৯ সনে গঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমানের বিশ্বস্ত সহকর্মী মো: জিল্লুর রহমান। এর পূর্বে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে সিলেটের স্বাধীনতা জন্য প্রচারণা চলছিল। সেই প্রচারণায় জিল্লুর রহমানও অংশ নিয়েছিলেন। 

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ১৯৫২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক আমতলায় একটি ছাত্র সমাবেশে মো: জিল্লুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। এ সমাবেশ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি সফল করার কর্মপরিকল্পনা ঠিক করা হয়। ২০ ফেব্রুয়ারিতে ফজলুল হক ও ঢাকা হলের পুকুরপাড়ে যে ১১জন নেতার নেতৃত্বে ২১ ফেব্রুয়ারির ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সেখানে জিল্লুর রহমান অন্যতম নেতা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার অপরাধে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন এবং একই সাথে তার মাস্টার্স ডিগ্রি কেড়ে নেয়া হয়। কিন্তু প্রবল আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুনরায় তার মাস্টার্স ডিগ্রি ফিরিয়ে দেয়।

৫৪’র যুক্তফন্ট নির্বাচন, মো: জিল্লূর রহমানের অবদান ও নূরুল আমিনের পরাজয় 

অন্যতম ভাষা সৈনিক হিসেবে সুপরিচিতি লাভকারি ফজলুল হক হলের বিনা প্রতিদন্ধিতায় নির্বাচিত সহ-সভাপতি (ভিপি) হিসেবে তাঁর তুমুল জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানী ও শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার জন্য গঠিত নির্বাচন স্টিয়ারিং কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন এবং স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারম্যান আবুল মনসুর আহম্মদ নিজে ত্রিশাল আসনে এমএনএ প্রার্থী হওয়ায় বৃহত্তর ময়মনসিংহের সকল আসনে ভলান্টিয়ারদের কাজের সুসংহত সমন্বয়ের মাধ্যমে যুক্তফ্রন্টের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনে মো: জিল্লুর রহমানের অবদান অপরিসীম বলে আবুল মনসুর আহমদ (যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহার খসড়া রচয়িতা ও সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রীসভার সিনিয়র মন্ত্রী) এর বিভিন্ন লেখায় এবং সে সময়ের যুক্তফ্রন্টের সে সময়ের ভলান্টিয়ার ভাষা সৈনিক রফিক উদ্দিন ভূঞা ও ভাষা সৈনিক শামছুল হক (পরবর্তীতে উভয়েই ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের জেলা সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন ও জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন) এর সাথে আলাপচারিতায় জানা যায়। এ সময়ে সফলতার সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল আসনে সমগ্র পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিন পরাজিত হন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক “খালেক নওয়াজ খান” এর কাছে। এ ঘটনাটি সে সময়ে বিশ্ব মিডিয়াতেও আলোড়ন তুলেছিলো। সমগ্র পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিন পরাজয় এবং যুক্তফ্রন্টের তরুণ প্রার্থীর বিস্ময়কর বিজয়ে ঐ আসনের এমএনএ প্রার্থী “খালেক নওয়াজ খান” এর নামের পাশে মো: জিল্লুর রহমানের নামটিও দীর্ঘদিন ঐ এলাকার প্রবীণদের মুখে মুখে ছিলো। 

বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির সুপ্ত চিন্তা নিয়ে গঠিত আওয়ামী লীগে মো: জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বলাভ  

১৯৫৬ সালে কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন জিল্লুর রহমান। ৬০ এর দশকে জিল্লুর রহমান ঢাকা জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

জিল্লুর রহমান ১৯৬২ সালের সামরিক শাসন, ৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানসহ সকল গণ-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।
নির্বাচিত এমএনএ মো: জিল্লুর রহমানের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা মো: জিল্লুর রহমান ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন। ১৯৭১ এর মার্চের অসহযোগ আন্দোলন সংগঠনে অসামান্য অবদান ছিলো তাঁর।

তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রবীণ সংগঠক ছিলেন এবং নির্বাচিত এমএনএ হিসেবে “প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার” বা “মুজিবনগর সরকার” এর পক্ষে গুরুদায়িত্ব পালন করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে “স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র” এবং “জয় বাংলা” নামে প্রকাশিত মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানের দায়ে সেই সময় তৎকালীন ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বাধীন দখলদার সরকার প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে তাঁর জাতীয় পরিষদ  সদস্য পদ বাতিল করে ২০ বছর কারাদন্ড প্রদান ও সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে।

স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে গঠন ও উন্নয়নে জাতির পিতার পাশে মো: জিল্লুর রহমান

মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সংবিধান প্রণয়নে গণ-পরিষদে মো: জিল্লুর রহমান সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ পূণর্গঠন, দেশে ফিরে আসা শরণার্থীদের পূণর্বাসন, দেশের যোগাোযোগ ব্যবস্থা পূণ:প্রতিষ্ঠা ও দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল করার কাজে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নবম সম্মেলনে (৭ ও ৮ এপ্রিল, ১৯৭২) নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সমগ্র দেশের নেতা-কর্মী ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয় করার কাজে মো: জিল্লুর রহমান নিজেকে জাতির পিতার পরিক্ষীত সৈনিক ও দেশের ক্রান্তিলগ্নে অন্যতম কান্ডারি হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। জিল্লুর রহমান ১৯৭৩  সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু, আত্ম-প্রচারবিমুখ ও চামচা-পোষণে অনভ্যস্ত মো: জিল্লুর রহমানের জাতির প্রতি ১৯৭২-৭৫এর এই বিশাল অবদান ইতিহাসের আড়ালেই থেকে গেছে। 

আওয়ামী লীগের ইতিহাসে একটি অনন্য রেকর্ড-যুগ্মভাবে শেখ মুজিবুর রহমান ও মো: জিল্লুর রহমান এর ৭১বছরের আওয়ামী লীগের ইতিহাসে ২০টি সম্মেলন ও সাতটি বিশেষ সম্মেলেন হয়, এর একটি অনন্য রেকর্ডের অধিকারি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ও মো: জিল্লুর রহমান।

বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন দল আওয়ামী লীগ। এদেশের যত অর্জন, আন্দোলন, সংগ্রাম আর ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে জড়িয়ে আছে দলটির নাম। অসাম্প্রদায়িক আর সাধারণ, খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যুগে যুগে বহু নেতা তৈরি হয়েছেন এই দলে। তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা এসব নেতাকে ধীরে ধীরে দল পরিচালনায় অন্তর্ভুক্ত করে সফল হয়েছে আওয়ামী লীগও।

১৯৪৯ সালের প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২০টি জাতীয় সম্মেলন হয়েছে আওয়ামী লীগের। এই সম্মেলনগুলোতে দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে কার্যনির্বাহী কমিটি পর্যন্ত নির্বাচিত হয়েছেন শত শত নেতা। তবে এখন পর্যন্ত সভাপতি হয়েছেন সাতজন। এর মধ্যে বর্তমান সভাপতি শেখ হাসিনা সর্বোচ্চ সাতবার, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তিনবার করে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ দুইবার এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও আবদুল মালেক উকিল একবার করে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। আর সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন একবার নির্বাচিত হয়েছেন দলের আহ্বায়ক।

এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ৯ জন। সবচেয়ে বেশি চারবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মো: জিল্লুর রহমান, যা আওয়ামী লীগের ইতিহাসে একটি অনন্য রেকর্ড। এছাড়া তাজউদ্দিন আহমেদ তিনবার, আবদুর রাজ্জাক ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী দুইবার করে, প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক, আবদুল জলিল ও মো: ওবায়দুল কাদের একবার করে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো: জিল্লুর রহমান যেসব সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন, এর সংক্ষেপে  বিবরণ 

(১) নবম সম্মেলন : ৭ ও ৮ এপ্রিল, ১৯৭২, সভাপতি: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক : মো: জিল্লুর রহমান। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে পুনরায় অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য এই কাউন্সিলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

(২) দশম সম্মেলন: ১৮ থেকে ২০ জানুয়ারি, ১৯৭৪; সভাপতি: এ এইচ এম কামারুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক: মো: জিল্লুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মারা যাওয়ার আগে এটিই ছিল আওয়ামী লীগের শেষ কাউন্সিল। দলীয় গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক ভাবধারা প্রণয়নের জন্য শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ ছেড়ে দেন। কারণ নতুন গঠনতন্ত্র অনুসারে সরকারের দায়িত্বে থাকা কেউ দলের দায়িত্বে থাকতে পারবে না। ফলে এএইচএম কামারুজ্জামানকে সভাপতি ও জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।

(৩) ১৫তম সম্মেলন : ১৯ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর, ১৯৯২; সভাপতি: শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক: মো: জিল্লুর রহমান। এ সম্মেলনে নতুন অর্থনৈতিক নীতিমালার আলোকে সর্বসম্মতিক্রমে দলের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্রে সংশোধনী আনা হয়।

(৪) ১৬তম সম্মেলন : ৬ ও ৭ মে, ১৯৯৭, সভাপতি: শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক: জিল্লুর রহমান। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয় লাভের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এই জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর মো: জিল্লুর রহমান আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়ামের সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ-বাকশাল এর প্রথম সম্পাদকও ছিলেন মো: জিল্লুর রহমান, যার দরুন কোন কোন ইতিহাসবিদ তাঁকে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বেশিবার (পাঁচবার) নির্বাচিত সাধারন সম্পাদক হিসেবেও উল্লেখ করেন। 

স্বাধীন দেশে কারাগারে মো: জিল্লুর রহমান

জাতির জনকের হত্যার পর প্রায় চার বছর কারাবন্দি ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ এর জাতির জনককে স্বপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ১১জন কেন্দ্রীয় নেতাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। জাতির পিতার একান্ত আস্থাভাজন ও বাকশালের প্রথম সম্পাদক হিসেবে মো: জিল্লুর রহমানকে পাকিস্তানী ও মার্কিনীদের মদদপুষ্ট জিয়া-মোশতাক চক্রের খুনী বিপথগামী সামরিক কর্মকর্তারা প্রচন্ড রকম শারিরীক নির্যাতন করে বলেও শোনা যায়।  

স্বাধীন দেশে আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় ক্রান্তিকালে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো: জিল্লুর রহমান

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারির পর ১৬ জুলাই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হলে ক্রান্তিকালে আওয়ামী লীগের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে মো. জিল্লুর রহমান দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন এবং দক্ষতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে দলের নেতৃত্ব দেন। শেখ হাসিনাকে কারামুক্ত করার লড়াইয়ে তিনি একই সঙ্গে আদালত ও রাজপথ এর লড়াইকে সুসংহতভাবে পরিচালনায় সুদক্ষ নেতৃত্বের স্বাক্ষর রাখেন। এ সময়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি। শেখ হাসিনা ১১ মাস জেলে থাকা এবং এরপর কয়েক মাস চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে থাকার সময় জিল্লুর রহমান আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে মন্তব্য করেছেন যে, ১/১১এর বৈরি সময়ে শেখ হাসিনা যখন কারাগারে, জিল্লুর রহমান তখন আওয়ামী লীগকে ভাঙ্গনের থেকে মুক্ত রেখেছিলেন। তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্ব না থাকলে হয়তোবা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সে সময়ে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যেতো।

তাঁর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের জন্য তাঁর অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ণ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এক বিবৃতিতে বলেন, ১৯৭৫ পরবর্তী দুঃসময়ে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে তাঁর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় প্রিয় স্ত্রী ও রাজনৈতিক সহকর্মী আইভি রহমানকে হারিয়ে শোকাহত হয়েছিলেন, কিন্তু দমে যাননি। এক-এগারো-পরবর্তী চরম দুঃসময়ে তিনি আওয়ামীলীগের হাল ধরেন। তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আমাকে মুক্ত করে আনে। বাংলাদেশের মানুষ ফিরে পায় মুক্ত গণতন্ত্র।

স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র-পরিচালনায় মো: জিল্লুর রহমান

(১) জিল্লুর রহমান ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদের সদস্য ও ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারন সম্পাদক হিসেবে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ পূণর্গঠন, দেশে ফিরে আসা শরণার্থীদের পূণর্বাসন, দেশের যোগাোযোগ ব্যবস্থা পূণ:প্রতিষ্ঠা ও দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।  

(২) ১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন, বিরোধী দলের একজন সিনিয়র সদস্য, বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে সংসদ ও সংসদের বাইরে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

(৩) ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদেও তিনি সদস্য নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। এ সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকারের তিনি স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দয়িত্ব পান। একই সঙ্গে তিনি জাতীয় সংসদের উপনেতা হিসেবেও ২০০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। 

(৪) ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিরোধী দলীয় উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন।

(৫) ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিল্লুর রহমান ষষ্ঠবারের মতো জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯তম রাষ্ট্রপতির শপথ নেয়ার আগ পর্যন্ত তিনি জাতীয় সংসদের উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন।

(৬) তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২০০৯ সালে বাংলাদেশের ১৯-তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ শপথ গ্রহণের মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি এম এম রহুল আমিন তাকে বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গভবনে শপথ বাক্য পাঠ করান। উল্ল্যেখ্য যে, বাংলাদেশের ১৭তম রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের মেয়াদ ছিল ২০০৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। নবম সংসদ নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ায় তার মেয়াদও দীর্ঘায়িত হয়।

মহাপ্রয়াণে মো: জিল্লুর রহমান

দীর্ঘদিন রোগে আক্রান্ত হয়ে ১০ মার্চ, ২০১৩ তারিখে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে কিডনি ও মূত্রপ্রদাহে আক্রান্তজনিত কারণে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভর্তি হন জিল্লুর রহমান। এর পূর্বদিন ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ফুসফুসের সংক্রমণ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অতঃপর ২০ মার্চ, ২০১৩ তারিখে তাঁর দেহাবসান ঘটে। সিঙ্গাপুরে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মাহবুব উজ জামান স্থানীয় সময় ৬:৪৭ ঘটিকায় জিল্লুর রহমান মৃত্যুবরণ করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান। ঐ সময় তাঁর সন্তানেরা সেখানে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পূর্বেই ১৪ মার্চ, ২০১৩ তারিখ হতে জাতীয় সংসদের স্পিকার আব্দুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। জিল্লুর রহমানের মৃত্যুতে বাংলাদেশে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়।

(নোট: এই নিবন্ধটিতে কোনরুপ তথ্যগত ভূল কারো কাছে ধরা পড়লে, দয়া করে আমাদেরকে অবহিত করলে তা আমরা সংশোধন করে দেব)

নিবন্ধটি সংকলন করেছেন : মো: মাহমুদ হাসান (ভূতপূর্ব কলেজ অধ্যক্ষ ও সমাজ গবেষণা কর্মী), ঢাকা।

পাঠকের মন্তব্য