ইতিকথা 

মধুসূদন ও মধুরক্যান্টিন

লাবণ্য কান্তা

লাবণ্য কান্তা

তখন ব্রিটিশ আমল, জমদারি প্রথা জোরতোড় চলছে। জমিদার বাবুরা তাদের সাজানো নৌকায় চড়ে নদীপথে ঘুরে বেড়ান। আনন্দ ভ্রমণে যান এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে। পুরো ভারতবর্ষ জমদারি তাবিদারিতে নিমগ্ন। সেসব দিনের কথা আর আজকের কথা আকাশ পাতাল পার্থক্য। সেসব কথা এখন রূপকথার মতো শোনায়। এমনই এক রূপকথার গল্পের সূত্রপাত হলেন নকরীচন্দ্র দে। সত্যিই কী তিনি রূপকথার গল্পের শুরু, নাকি সত্যিকারের একটি নতুন স্বাধীন ভূখন্ডের অঙ্কুরোদগমও ? নকরী চন্দ্র দে’র পূর্ব পুরুষের বসবাস ঢাকার অদূরে বিক্রমপুরের শ্রীনগর থানার অধীন বাবুর দীঘির পাড় গ্রামে। শ্রীনগরের জমিদারদের সাথে নকরীচন্দ্রের সেসময় ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। 

সেই সুবাদে জমিদারদের সাথে তাঁর সুসম্পর্কও গড়ে ওঠে। সেই ব্যবসার সূত্র ধরেই একদিন নকরীচন্দ্র তার দুই পুত্র আদিত্য চন্দ্র দে এবং নিবারণ চন্দ্র দে-কে সঙ্গে নিয়ে জমিদার বাবুদের নৌকায় চড়ে ঢাকা শহরে এসে পড়েন। ঢাকার জিন্দাবাজার লেনের জমিদার বাবুদের আশ্রয়ে তাঁদের বাড়িতেই মাথা গুঁজার ঠাই করে নিলেন। তারপর ধীরে ধীরে সেখানে থেকেই তাঁদের আশ্রয় আর প্রশ্রয়ে নিজের ব্যবসার প্রসার ঘটাতে ব্রতী হলেন। নকরী ঢাকা শহরের বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মিষ্টি জাতীয় খাবার দাবার সরবরাহ করতে শুরু করলেন এবং সেইখান থেকেই তাঁর ব্যবসার প্রসার শুরু হলো। সেইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কতদিন যাবত তাঁর ব্যবসা চলমান ছিল তার কোনও সঠিক তথ্য নেই।কিন্তু তাঁর সেই ব্যবসা পুরনো ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। 

১৯২১ সালে যখন রমনা এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন নকরী তাঁর বড় পুত্র আদিত্যকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ব্যবসা পরিচালনার দায়িত্ব দেন। আদিত্য শুরু করলেন নতুন স্থানে তার ব্যবসা। জিন্দাবাজারের সেই বাড়ি থেকেই আদিত্য প্রতিদিন মিষ্টি এবং অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করতেন। সেসব নাস্তা হাতে নিয়ে পায়ে হেঁটে হেঁটে ফেরি করে বিক্রি করতেন। সেইভাবে প্রতিদিন ব্যবসার এতো সাজ সরঞ্জাম বয়ে নিয়ে আসা আবার নিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে উঠলো। আর তার ব্যবসা মোটামুটি ভালো চলতে শুরু করলো। তখন আদিত্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ১৯২২-২৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের অর্থে একটি ছোট ছন-বাঁশের দোকান ঘর বসালেন। অনুরূপ আরেকটি ঘরে তিনি নিজেও বসবাস শুরু করলেন। তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে সেই অনুমতিটুকুও দিয়ে দিলো। চলতে থাকে তার ব্যবসা। সময় করে আদিত্য তার গ্রামের বাড়ি শ্রীনগরেও যান। সেখানে স্ত্রী-পুত্র থাকে। তাদের দেখাশুনাও করেন। 

জমিদারদের সাথেও সুসম্পর্ক বজায় রাখেন এবং সেইসাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সমাজের সাথেও তার সম্পর্ক গড়ে উঠতে থাকে। তখন ছাত্রদের মধ্য থেকে আদিত্যের চা- দোকান ঘরের বর্ণনা দিতে গিয়ে অধ্যাপক এবং সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদের দ্বিতীয় রঁদেভু (ফরাসী শব্দ) আদিত্যের দোকানটি বড় দরিদ্র। কম্পাউন্ডের এক কোণের টিনের চালাওয়ালা দুর্মার ঘর, ভিতরে মলিন বর্ণ টেবিলের পাশে লম্বা ন্যাড়া টুল পাতা; এখানে আমরা ক্ষুৎ পিপাসা নিবারণ করে থাকি, যেহেতু সারা তল্লাটে দ্বিতীয় কোন চায়ের ঘর নেই। আদিত্যের ভোজ্য তালিকা অতি সীমিত, কোন কোনদিন তার স্বহস্তের প্রস্তুত মিষ্টান্ন ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না চায়ের সঙ্গে; কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না আমাদের, গদ্য পদ্য সমস্ত খাদ্যই আমাদের পক্ষে উপাদেয় এবং সুপাচ্য, সেগুলির রাসায়নিক গুণাগুণ নিয়ে চিন্তিত হবার মতো দুর্দিন তখনো বহুদূর।” 

ইতোমধ্যেই আদিত্য সন্তান-সন্ততির পিতাও হয়েছেন, সেই সন্তানেরা হাতে পায়ে বড় হয়েছে; তারও একটা সময় বয়স বেড়ে গেলো। তখন আদিত্য বার্ধক্যজনিত কারণে আর ব্যবসার কাজ চালাতে পারছিলেন না, তখন তিনি তার মেঝ পুত্র মধুসূদন-কে শ্রীনগর স্কুলের ইতি টেনে ঢাকায় নিয়ে আসেন তাকে। ঢাকায় নিয়ে আসার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চা-নাস্তার দোকানটি চালাবার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। 

মধুসূদনের বয়স তখন মাত্র চৌদ্দ। তবু তার স্বভাবজাত গুণে এবং পিতার নিকট থেকে অমায়িক আচরণ রপ্ত করে নিলেন এবং খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের সাহায্য সহযোগিতা এবং পৃষ্ঠপোষকতা লাভে সমর্থ হন। 

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের দাবীতে ডাকসুর অফিস সংলগ্ন এবং ডাকসুরই নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যান্টিনের ভার মধুসূদন দে’র ওপর ন্যস্ত করা হয়। মধুসূদনের সেই ক্যান্টিনটি তার পিতার হাত ধরে প্রথমে ভ্রাম্যমান চা-নাস্তার কাজেই রত ছিল, পরে তা চায়ের দোকানে রূপ ধারণ করে এবং পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারিরা সেই চায়ের দোকানটিকে ‘ মধুর ক্যান্টিন ’ বলতে শুরু করলেন। 

অনুমান করা যায় যে, মহান ভাষা আন্দোলনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে ১৯৪৮ সালের দিকে পুরনো কলাভবনস্থ ডাকসু নিয়ন্ত্রিত উক্ত চা-দোকানটি মধুসূদনের নিজস্ব ক্যান্টিনের মর্যাদা লাভ করে। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ক্যান্টিনটি বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগের জায়গায় অবস্থিত ছিল। যখন অন্যান্য বিভাগসমুহ নীলক্ষেত এলাকায় নির্মিত ভবনে স্থানান্তরিত হয় তখন মধুর ক্যান্টিন পুরনো কলাভবন এলাকা ছেড়ে বর্তমান স্থানে পুনঃস্থাপিত হয়। মোটামুটি এটিই হচ্ছে আদিত্যের দোকান থেকে ‘মধুর ক্যান্টিন’ প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

‘মধু দা’ স্মারক গ্রন্থে স্মৃতি কথায় অজয় রায় লিখেছেন, “ মধুর ক্যান্টিনের মালিক প্রয়াত মধুসূদন দে পঞ্চাশ দশকের শুরু থেকে ছাত্র মহলে সকলের কাছে ছিলেন মধু দা। তারও আগের ছাত্রদের কাছে তিনি হয়তো ছিলেন শুধু ‘মধু’। সে কালটা ছিল শেখ মুজিব, তাজউদ্দিন আহমেদ, কামরুদ্দিন আহমেদ, শামসুল হক, ওলি আহাদ, অরবিন্দ বোস, কল্যাণ দাশ গুপ্ত, সমীর বোস, জ্ঞানেশ পত্রনবীশ প্রমুখ এবং আরও পরে আব্দুল মতিন, গাজিউল হক, হাসান হাফিজুর রহমান প্রমুখদের কাল। এরা সবাই ভাষা সৈ্নিক। সে কাল ছিল শামসুর রাহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ... এদের কাল। 

কিন্তু সে কাল আমরা দেখিনি। মধু’ দা শুধু তো নাম নয়, একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর চায়ের দোকান হয়ে উঠল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অপরিহার্য অঙ্গ। সামান্য একটি চায়ের ক্যান্টিন যে একটি ইনস্টিটিউশন হয়ে উঠতে পারে, এর সাথে সম্পৃত্ত না হলে অনুধাবন করাও যায় না।” 

জানা যায়, বর্তমানে মধুর ক্যান্টিনটি যেখানে অবস্থিত তা এক সময়ে ছিলো ঢাকার নবাবদের বাগানবাড়ির পরিত্যক্ত নাচঘর। সেই নাচঘর এবং মধুর ক্যান্টিন দুটোই আজ স্মৃতি। মধুসূদন কিশোর বয়সে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন দেখেছেন, মুসলিমলীগের পাকিস্তান আন্দোলনও দেখেছেন। যেমন তিনি দেখেছেন জগন্নাথ হলের ছাত্রদের সাথে ফজলুল হক হলের ছাত্রদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তেমনই দেখেছেন ঢাকায় হিন্দু-মুসলিমের দাঙ্গা বারবার অনেকবার। দেখেছেন সাম্প্রদায়িকতার বীভৎসরূপ কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তির পরিবেশকে কলুষিত করতো। 

এলো ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কালরাত্রি। মধুসূদন যে শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের মালিক তা ছিলেন না। তিনি ছিলেন স্বয়ং একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর ক্যান্টিন ছিলো একটি আন্দোলন যার নাম ‘ স্বাধীনতা ’। সেই কালরাত্রিতে আক্রান্ত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। জগন্নাথ হল, শিববাড়ি শহিদমিনার। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক এলাকার ভবনগুলোতেও অবিরাম গুলিবর্ষণ হলো। ছাত্রদের হলে নির্বিচারে কামান দাগানো হলো। ২৬শে মার্চ সারাদিন চলে সেই হত্যাযজ্ঞ। রক্তের বন্যা বইছিল যখন তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ বুঝতে পারেনি কোথায় কি ঘটছে। সারা দেশে কারফিউ জারি রয়েছে। যে যেখানে রয়েছে সেখানেই মার খাচ্ছে, গুলি খাচ্ছে, বন্দী হচ্ছে, লাশ হচ্ছে আরও কতো কী! ... 

সারারাত অস্ত্রের ঝনঝনানি, গগনবিদারি শব্দ কিন্তু কেউ এক পা নড়তে পারছে না। ২৬ তারিখ সকালে সেনাবাহিনীর পাঁচ সদস্যের একটি দল গেলো মধূসূদনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ১নম্বর ভবনের দ্বিতীয় তলায়। দীর্ঘদেহী মধুসূদনকে চিনতে তাদের দেরি হলো না। তারা তাঁকে ধরে নিয়ে যেতে চাইলে তাঁর স্ত্রী তাদের বাধা দিলেন, কিন্তু সেই বাধা দেয়ার পরিণতি এমন হলো যে তাঁকে জীবন দিতে হলো। সেনাবাহিনীরা বেয়নেটের আঘাতে তাঁর দেহ ক্ষত-বিক্ষত করে ফেললো। খসে পড়লো তাঁর হাত দুটি তাঁর দেহ থেকে। মধুসূদনের স্ত্রী যোগমায়া দেবী ছিলেন অন্তসত্তা। সেনা সদস্যরা তাঁকে ব্রাশ ফায়ারের গুলিতে তাঁকে ঝাঁঝরা করে দিলো। সেই ব্রাশ ফায়ারের কয়েকটি গুলি এসে লাগলো মধুসূদনের গায়ে, তিনি আহত হয়ে পড়ে গেলেন। তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সম্মুখেই ঘটছে এসব ঘটনা। সবাই উৎকণ্ঠায় স্তব্ধ হয়ে রইলো। শুরু হলো এলোপাথাড়ি গুলি। নিহত হলেন মধুসূদনের জ্যেষ্ঠ পুত্র রনজিৎ এবং নব পরিণীতা রিনা। গুলিবিদ্ধ হলো মধুসূদনের কন্যা। তাতেও ক্ষান্ত হলো না সেনারা। মধুসূদনের আহত দেহটিকে তারা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় জগন্নাথ হলের মাঠে। আহত মধুসূদন তখনো আর্তচিৎকার করছিলেন। তিনি বিড় বিড় করে বলছিলেন, তার কি অপরাধ যে তাকে হত্যা করা হচ্ছে। তার স্ত্রী তখন ঘরের মেঝেতে লাশ হয়ে পড়ে ছিলেন। বড় ছেলে, তার স্ত্রীকেও পাক সেনারা গুলি করে মেরে ফেলে। তার কন্যাও গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় পড়েছিল। 

মধুসূদনকে তারা নিয়ে গেলো জগন্নাথ হলের মাঠে, বেয়নেটের খোঁচায় আঘাত করতে করতে তাকে শেষ করে দেয়। মধুসূদনের স্ত্রী তখন অন্তসত্তা ছিলেন। সেই অবস্থায় তিনি গুলিবিদ্ধ হলেন এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। মধুসূদন সেই কথাটি জানতে পারলেন না, কেন এইভাবে পাকসেনারা তার পুরো পরিবারের ওপর আক্রমণ করলো এবং হত্যাযজ্ঞ ঘটালো। কিন্তু জানতেন না যে তার ক্যান্টিন বহু চিন্তা-চেতনা প্রস্তাবের বীজ উপ্ত হওয়ার স্থান হয়ে উঠেছিল তাই তাকে এইভাবে নিজের জীবনসহ সন্তান-সন্ততির জীবনও দিতে হলো।

ফেসবুক স্টাটাস লিঙ্ক : লাবণ্য কান্তা
২৪ মার্চ,২০১৯

পাঠকের মন্তব্য