গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে হবে

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

উপ-সম্পাদকীয়, মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.): ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে সুপরিকল্পিত গণহত্যা শুরু করে। ওই সেনা অভিযানের কোড নেম বা সাংকেতিক নাম ছিল অপারেশন সার্চলাইট। ২৫শে মার্চ শুরু হওয়া গণহত্যার অন্যতম কালপ্রিট পাকিস্তানের ১৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা কর্তৃক লিখিত—A Stranger in my own Country গ্রন্থের ভূমিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে—We exploited East Pakistan and when the people rose demanding their right of self determination, the Pakistan military, then in power retaliated with genocide. যুদ্ধের পর পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে তদন্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনী অনেক চেষ্টা করেও গণহত্যার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে ধামাচাপা দিতে পারেনি।

গণহত্যার অন্যতম ঠাণ্ডা মাথার পরিকল্পনাকারী মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী নিজের গা বাঁচানোর জন্য তদন্ত কমিটির কাছে বলেছেন, লে. কর্নেল ইয়াকুব মালিকের নির্দেশে ১৯৭১ সালের ২৭ ও ২৮ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসে বাঙালি অফিসারসহ ১৯৫ জন নিরীহ মানুষকে স্রেফ জবাই করা হয়। সালদা নদীর এলাকায় ৫০০ জনকে হত্যা করা হয় এবং গ্রামাঞ্চলে ও ছোট শহরগুলো শত্রুমুক্ত করার নামে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নির্দয়ভাবে ধ্বংস, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাযজ্ঞ চালায়।

একজন ব্রিগেড কমান্ডার, ব্রিগেডিয়ার ইকবালুর রহমান তাঁর জবানবন্দিতে বলেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল গুল হাসান পূর্ব পাকিস্তানের সেনা ইউনিট পরিদর্শনের সময় সৈনিকদের জিজ্ঞাসা করতেন, তুমি কয়জন বাঙালিকে মেরেছ? আরেকজন অফিসার লে. কর্নেল আজিজ আহমদ খান সাক্ষ্যে বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে তাঁর ইউনিটে গিয়ে জেনারেল নিয়াজি জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা কত হিন্দু মেরেছ? জেনারেল নিয়াজি তাঁর নিজের লেখা—The betrayal of East Pakistan গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন জেনারেল টিক্কা খান তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তানের মাটি চাই, মানুষ চাই না।’ নিয়াজি তাঁর বইয়ে লিখেছেন টিক্কা খান পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করেন এবং সে অনুসারে জেনারেল রাও ফরমান আলী ও ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জানজেব আরবাব হুকুম পালন করেন। জেনারেল ফরমান আলী তাঁর টেবিল ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ ভূমি বাঙালির রক্তে লাল করা হবে।’

নিয়াজি তাঁর বইয়ে আরো লিখেছেন—‘২৫শে মার্চ রাতে জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় ছিলেন এবং তিনি দেখেছেন সেদিন রাতে টিক্কা খান কী করেছেন। সারা রাত ট্যাংক, কামান, মেশিনগানের শব্দ ভেদ করে ভেসে এসেছে ঢাকার অসহায় মানুষের আর্তনাদ।’ আরেক পাকিস্তানি অফিসার ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিক Witness to Surrender গ্রন্থের ৭৭ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেছেন, ‘১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ সকালে শেরেবাংলানগরে অবস্থিত নিজের কমান্ড পোস্ট থেকে বাইরে এসে শহরের দিকে তাকিয়ে জেনারেল টিক্কা খান বিদ্রূপের হাসিতে বলেছিলেন, ঢাকা শহরে কয়েকটি নেড়ি কুত্তা ছাড়া মানুষজন আছে বলে তো মনে হচ্ছে না।’ এত বড় নিষ্ঠুর-নির্মম উপহাস যে ব্যক্তি করতে পারেন তাঁর জন্য কসাই উপাধিই যথার্থ হয়। বেলুচিস্তানে নির্বিচারে নিরীহ মানুষ হত্যার জন্য এই উপাধি টিক্কা খান পেয়েছিলেন। এ কারণেই একাত্তরে যুদ্ধের সময়ে শিল্পী কামরুল হাসান এঁকেছিলেন সেই বিখ্যাত ইয়াহিয়া খানের রাক্ষসরূপী ছবি, যার নিচে লেখা ছিল—‘এই দানবদের হত্যা করুন।’ জেনারেল খাদিম হোসেন রাজার বইয়ের ভূমিকায় উল্লেখ আছে, মার্চ মাসে ঢাকায় উত্তাল আন্দোলন শুরু হওয়ার অনেক আগেই একাত্তরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সামরিক অ্যাকশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

বিদেশি সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের রিপোর্টেও ভয়াবহ গণহত্যার চিত্র ফুটে উঠেছে। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ সাংবাদিক সায়মন ড্রিংয়ের সেই বিখ্যাত প্রতিবেদন ছাপা হয় লন্ডনের দৈনিক টেলিগ্রাফ পত্রিকায়। ওই রিপোর্টের একাংশের বাংলা করলে দাঁড়ায়—‘পাকিস্তান ও ধর্ম রক্ষায় নামে ঢাকা নগরীকে ধ্বংস করে একটা ভয়ংকর ভূতুড়ে নগরীতে পরিণত করা হয়েছে। ঠাণ্ডা মাথার হত্যাকাণ্ডে ২৪ ঘণ্টায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলিতে কম করে হলেও শুধু ঢাকায়ই সাত হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ঢাকার অনেক এলাকাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় নিযুক্ত আমেরিকান কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড তাঁর নিজের লিখিত ‘ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থের ২১৩ পৃষ্ঠায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাছাই করা গণহত্যার বর্ণনা দিয়েছেন। এই গণহত্যার রিপোর্ট তিনি ২৮ মার্চ ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। একই রকম বাছাইকৃত গণহত্যার বর্ণনা পাওয়া যায় তখন দিল্লিতে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত কেন কিটিংয়ের প্রতিবেদনে, যার বর্ণনা রয়েছে আর্চার ব্লাডের বইয়ের ২১৫ পৃষ্ঠায়। একাত্তরের যুদ্ধের সময় বিশ্ব মিডিয়া ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন তো রয়েছেই, পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মিডিয়ায়ও বাংলাদেশের গণহত্যা সম্পর্কে গবেষণালব্ধ তথ্যাদি বেরিয়েছে।

১৯৮১ সালে জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার-সংক্রান্ত ঘোষণাপত্রে বলা হয়—‘মানব ইতিহাসে যত গণহত্যা হয়েছে তার মধ্যে স্বল্পতম সময়ে সংখ্যার দিক থেকে সর্ববৃহৎ গণহত্যা হয়েছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। গড়ে প্রতিদিন ছয় থেকে ১২ হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।’ এই ঘোষণাপত্রটি বের হয় ঘটনার প্রায় ১০ বছর পর। তার অর্থ যথেষ্ট গবেষণার ফলে এই তথ্য পেয়েছে জাতিসংঘ। সবাই জানেন, ১৯৭১ সালে আমেরিকা পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। সেই আমেরিকার এনসাইক্লোপিডিয়া আমেরিকায় উল্লেখ আছে, একাত্তরে বাংলাদেশে ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়। প্রখ্যাত গণহত্যা গবেষক লিও কুপার ‘জেনোসাইড’ নামে একটি বই লিখেছেন। বইটির প্রচ্ছদেই উল্লেখ আছে, ১৯১৫ সালে আর্মেনিয়ায় গণহত্যার শিকার হয় আট লাখ মানুষ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ৬০ লাখ ইহুদি এবং একাত্তর সালে বাংলাদেশে গণহত্যার শিকার হয় ৩০ লাখ। ১৯৭২ সালে জানুয়ারির ৩ তারিখে তৎকালীন সোভিয়েতের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা ‘প্রাভদা’ প্রকাশ করে, ‘বাংলাদেশে গত ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে।’ লন্ডনের মর্নিং নিউজ ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি প্রকাশ করে, ‘গত ৯ মাসে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী বাংলাদেশে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করে।’

সুতরাং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যা চালিয়েছে—তার যথেষ্ট প্রমাণ আছে। মাত্র আট মাস ২২ দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ৩০ লাখ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে রেকর্ডকৃত তথ্য মতে, এত অল্প সময়ে এত বড় ভয়ংকর গণহত্যা বিশ্বে আর কোথাও হয়নি। বাংলাদেশের এই গণহত্যা পাকিস্তান সেনাবাহিনী চালায় আনুষ্ঠানিক লিখিত মিলিটারি অপারেশন আদেশ জারির মাধ্যমে। এটা মূর্খতা ও গোঁয়ার বুদ্ধির পরিচায়ক এবং সীমাহীন ঔদ্ধত্যের উদাহরণ। প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান অত্যাধুনিক কাল পর্যন্ত বিশ্বের বহু প্রান্তে অনেক রকমের এবং বহু ডাইমেনশনের গণহত্যা হয়েছে, যার কোনোটাই লিখিত সামরিক আদেশ জারি করে করা হয়নি। যেখানে যা ঘটেছে তা করা হয়েছে ক্ল্যানডেস্টাইন পন্থায় এবং গোপনীয় বা বিশেষ বাহিনীর দ্বারা। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী একাত্তরের মার্চ মাসের ২৫ তারিখ দিবাগত রাতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করে। তাদের অভিযান শুরুর পরই শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্পষ্টতই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান আগ্রাসী পক্ষ এবং প্রথম আক্রমণকারী দেশ। তাই জাতিসংঘের কনভেনশন অনুযায়ী এই যুদ্ধের সব দায়দায়িত্ব বর্তায় পাকিস্তানের ওপর।

একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা আজকের থেকে ভয়ানক খারাপ অবস্থায় ছিল। বর্তমানে জেলা, তখনকার মহকুমা শহরের সঙ্গে সব জায়গায় সড়ক যোগাযোগ ছিল না। ওই রকম যোগাযোগ ব্যবস্থায় পাকিস্তান আর্মি গ্রামগঞ্জে গিয়ে কিছুতেই হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারত না যদি রাজাকার, শান্তি কমিটির সদস্য, জামায়াত, মুসলিম লীগের সদস্যরা পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে না থাকত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি সমগ্র ইউরোপের কাছে এবং আরেক আগ্রাসী পক্ষ জাপান, চীন ও কোরিয়ার কাছে একাধিকবার আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চেয়েছে। বাংলাদেশের গণহত্যায় অংশগ্রহণকারী পাকিস্তানের চিহ্নিত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর কোনো বিচারের ব্যবস্থা তো পাকিস্তান করেইনি, বরং তাদের দোসর বাংলাদেশি যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য তারা এখনো সক্রিয় তৎপরতা চালাচ্ছে। 

এ ব্যাপারে তারা সব আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ভঙ্গ করেছে। বাংলাদেশ আজ পাকিস্তান থেকে সব দিক দিয়ে এগিয়ে আছে। তাই যত দিনই অতিবাহিত হোক না কেন, আমরা কিছুই ভুলিনি। আন্তর্জাতিক আইনের কাছে তাদের মাথা নত করতে হবে, যেমনটি তারা করেছিল একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর। পাকিস্তান কর্তৃক নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া ছাড়া অন্য কিছু বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

পাঠকের মন্তব্য