ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা ঘোষণা অনৈতিক 

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। এ বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে শোধ করতে না পারা ব্যবসায়ীদের ‘ঋণখেলাপি’ অপবাদ থেকে রক্ষা করার জন্য আরো একটি সুযোগ দিচ্ছে ব্যবসায়ীবান্ধব বর্তমান সরকার।

এ সুযোগে একজন ঋণখেলাপি তার মোট ঋণের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ১২ বছরে ওই টাকা পরিশোধের সুবিধা পাবেন। তাছাড়া, ঋণ নেওয়ার সময় সুদের হার যা-ই নির্ধারণ করা থাক না কেন, এ নতুন সুযোগ নিয়ে খেলাপি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে মাত্র ৭ শতাংশ হারে সুদ দিতে  হবে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গতকাল সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলানগরে নিজের দপ্তরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ঋণখেলাপিদের জন্য এসব সুবিধার কথা জানান।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ব্যাংক খাতের সমস্যা দূর করতে যে কমিটি করে দিয়েছিলেন, সেই কমিটির সুপারিশেই আমরা ঋণখেলাপিদের এর থেকে বেরিয়ে আসার একটি সুযোগ করে দিচ্ছি। এ সিদ্ধান্ত আগামী মে মাস থেকে কার্যকর হবে।


আ হ ম মুস্তফা কামাল

তিনি বলেছেন, কারা ভালো ঋণগ্রহীতা তা নির্ধারণের জন্য একটি অডিট কমিটি করে দেওয়া হবে। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই খেলাপি ঋণ পরিশোধের বিশেষ সুযোগ দেওয়া হবে।

ঋণখেলাপীদের জন্য সরকারের এ বিশেষ সুবিধা প্রদানের ফলে দেশের অর্থিক খাতে আরো নৈরাজ্য ও সার্বিকভাবে ধ্বসের আশংকা ব্যক্ত করেছেন, অর্থনীতির ছাত্র এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।

তিনি রেডিও তেহরানকে জানান, সামান্য অর্থের জন্য যেখানে হাজার হাজার কৃষকের নামে মামলা ঝুলছে সেখানে হাজার-কোটি টাকার ঋণখেলাপিদের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দেয়া অত্যন্ত অনৈতিক পদক্ষেপ। এর ফলে আর্থিক খাতে লুটপাটের রাজত্বই কায়েম হবে।

এর আগে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, যারা সরকারের দেয়া সুবিধা নিতে পারবে না, একেবারেই টাকা পরিশোধ করতে পারবে না, তাদের জন্যও ব্যবস্থা আছে। আমরা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি করব। আমাদের ইনসলভেন্সি আইন তৈরি হচ্ছে। এই আইনের আওতায় ননপারফর্মিং ঋণগুলো সব ওই কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হবে।

অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে আ হ ম মুস্তফা কামাল ব্যাংক খাতের এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এই খেলাপি ঋণকে। সাংবাদিকদের সামনে তিনি এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন যে খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও তিনি বাড়তে দেবেন না।

উল্লেখ্য, খেলাপী ঋণ আদায় করতে না পেরে ২০০২ সালে খেলাপি ঋণ রাইট-অফ বা অবলোপনের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। অর্থ ঋণ আদালত আইন দুই দফায় সংশোধন করা হয়। ২০১৩ সালের শেষভাগে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা বলে এক দফা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু তার পরেও কোনোভাবেই খেলাপি ঋণ কমাতে না পেরে ২০১৫ সালে বড় অঙ্কের ঋণ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এদিকে সম্পদ ব্যবস্থাপনা (অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট) কোম্পানির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায় করার বিকল্প পথ খুঁজছে বর্তমান সরকার। খেলাপি ঋণ আদায়ে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের প্রস্তাব প্রণয়নের জন্য এরই মধ্যে একটি কমিটি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। তিন সদস্যবিশিষ্ট এ কমিটির আহ্বায়ক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের যুগ্ম সচিব মু. শুকুর আলী।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত ১৮ মার্চ ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করার পর সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, দেশে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি নেই। তিনি চান এ ধরনের কোম্পানি হোক এবং তিনি মনে করেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ভালো ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করেন, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের এবারের উদ্যোগটিও নতুন নয়। ২০০১ সালেও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ আদায়ের উদ্যোগ গ্রহণ করে তৎকালীন সরকার। ২০০৩ সালে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের সহযোগিতায় সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পিপলস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস করপোরেশন (পিডিএসসি) লিমিটেড নামের একটি কোম্পানি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম শুরু করে। পরে এ–জাতীয় আরও কোম্পানি গড়ে ওঠে এবং সোনালী, অগ্রণীসহ কয়েকটি ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ের দায়িত্ব দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, সেসময় শুরুর দিকে ভালো সাফল্য আসে। কিন্তু একশ্রেণির অসাধু ব্যাংকার ও ব্যাংকের প্যানেল আইনজীবীদের অসহযোগিতায় কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম বন্ধের পথে। বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেও মামলা পরিচালনার দায়িত্ব ব্যাংকগুলো তাদের হাতেই রাখে। একশ্রেণির আইনজীবী ঋণখেলাপিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে মামলা দীর্ঘায়িত করে ফেলে। 

পাঠকের মন্তব্য