উন্নয়ন ভাবনা

আলোকিত ও অগ্রগামী কুড়িগ্রাম

আলোকিত ও অগ্রগামী কুড়িগ্রাম

আলোকিত ও অগ্রগামী কুড়িগ্রাম

প্রজন্মকন্ঠ, উপ-সম্পাদকীয় : কুড়িগ্রাম জেলা বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রংপুর বিভাগের একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। কুড়িগ্রামের মোট আয়তন: ২২৩৬.৯৪ বর্গ কিঃমিঃ। উপজেলা ৯টি, পৌরসভার ৩টি, ইউনিয়ন পরিষদ ৭২টি এবং গ্রামের ১৮৬টি। মোট পাকা রাস্তা : ৪১৪.৯২ কিঃমিঃ এবং কাঁচা রাস্তা ৪২৬৭.৫৬ কিঃমিঃ।

উপজেলাগুলো হল 

  1. উলিপুর উপজেলা
  2. কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা
  3. চর রাজিবপুর উপজেলা
  4. চিলমারী উপজেলা
  5. নাগেশ্বরী উপজেলা
  6. ফুলবাড়ী উপজেলা
  7. ভুরুঙ্গামারী উপজেলা
  8. রাজারহাট উপজেলা
  9. রৌমারী উপজেলা

সংসদীয় এলাকার সংখ্যা ৪টি, নাম ও এলাকা

  1. কুড়িগ্রাম- ১ (নাগেশ্বরী,কচাকাটা, ভুরঙ্গামারী)
  2. কুড়িগ্রাম- ২(রাজারহাট, কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী)
  3. কুড়িগ্রাম– ৩ (উলিপুর,চিলমারী)
  4. কুড়িগ্রাম- ৪ (রৌমারী, রাজিবপুর)

দারিদ্র্যের শীর্ষস্থানটি কুড়িগ্রাম জেলার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সদ্য প্রকাশিত ‘খানা আয় ব্যয় জরিপ-২০১৬’ অনুযায়ী, এই জেলার ৭০ দশমিক ৮৭ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। অথচ ২০১৪ সালের জরিপে এই জেলায় দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের হার ছিল ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। চিলমারীর মতো উপজেলায় তা ৭৭ শতাংশ। কিন্তু গোটা দেশে দারিদ্র্যের হার ২০১৪ সালের ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে চলতি বছর তা ২৪ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছে। তবে কুড়িগ্রামের কেন এই উল্টো যাত্রা ?

কুড়িগ্রামের উন্নয়ন ভাবনা, উন্নয়নের সুষম বন্ঠন ও সার্বিক উন্নয়ন

কুড়িগ্রাম জেলার সার্বিক উন্নয়নে পরিকল্পনা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ন বিষয়। যেকোন কাজের প্রায় ৪০% সম্পাদন করা সম্ভব সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে, কুড়িগ্রামের সার্বিক উন্নয়নে, উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুষম বন্ঠনের ও সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে কুড়িগ্রামের সামগ্রিক উন্নয়নের প্রায় ৪০% অর্জন করা সম্ভব। সম্পদ ও উন্নয়ন সংশ্লিষ্টত প্রতিষ্ঠানের সুষম বন্ঠন একটি জেলার উন্নয়নে কিভাবে ভুমিকা রাখে তার অন্যতম উদাহারন বৃহত্তর রংপুর বিভাগের অন্যতম জেলা নিলফামারী। নিলফামারীতে জেলা সরকারি কলেজ জেলা সদরে হলেও EPZ জেলা সদর থেকে প্রায় ৭/৮ কিলোমিটার দুরে, সৈয়দপুর বিমানবন্দর জেলা সদর থেকে প্রায় ২০/২১ কিলোমিটার এবং EPZ থেকে থেকে বিমান বন্দরের দুরুত্ব প্রায় ১৬ কিলোমিটার, সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাও জেলা সদর থেকে দুরে ফলে এসব প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সে এলাকার মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যেমন সুষম বন্ঠন হয়েছে তেমনি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি জেলা সদরে মানুষের অনাকাঙ্খিত চাপ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।

নিলফামারী জেলা সদরে এখনো এক শতক জায়গা ও কুড়িগ্রাম জেলা সদরে এক শতক জায়গার দামে সুস্পষ্ট পার্থক্য লক্ষনীয়। কুড়িগ্রামের চেয়ে নিলফামারীর মানুষ অর্থনীতি ও উন্নয়নের দিক থেকে নিশ্চয় পিছিয়ে না। কারন খোজার দায়িত্ব আপনাদের উপর ছেরে দিলাম। আমরা যদি কুড়িগ্রাম জেলার উপজেলা গুলোর ভৌগলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক অবস্থা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা বিশ্লেষন করি তাহলে দেখা দেখা যায়, কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী ও চর রাজিবপুর উপজেলা ও চিলমারী উপজেলার অর্ধেক(৬টি ইউনিয়নের ৩টি) ব্রহ্মপুত্র নদের কারনে কুড়িগ্রাম সদর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। 

কুড়িগ্রাম জেলা সদরের সাথে উপযুক্ত যোগাযোগের অভাব ও জেলার সামগ্রিক উন্নয়নের সুষম বন্ঠনের অভাবে এ উপজেলা দুটির পাশাপাশি চিলমারী ও উলিপুর উপজেলাও শিক্ষা, স্বাস্থ সেবা, অর্থনীতি,রাজনীতি ও সংস্কৃতিক কর্মকান্ডে ধীরে ধীরে পিছিয়ে পরছে। অন্য দিকে ফুলবাড়ি, নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলা গুলো একই রুটে অবস্থিত। কুড়িগ্রাম সদরেরে সাথে যোগাযেগের ক্ষেত্রে সড়ক পথ এদের একমাত্র অবলম্বন। আমরা যদি ফুলবাড়ি,নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সার্বিক উন্নয়ন পর্যালোচনা করি তাহলে দেখাযায় এ তিনটি উপজেলার উন্নয়নে কুড়িগ্রাম সদর ও সোনাহাট স্থল বন্দর হতেপারে অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। অন্যদিকে প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন চিলমারী,রৌমারী ও চর রাজিবপুর এবং উলিপুর উপজেলার উন্নয়নের টার্নিং পয়েন্ট কি হতে পারে সে বিষয়টি আমাদের ভাবা দরকার। অনেকে মনে করতে পারেন, যেখানে কুড়িগ্রাম উন্নয়নের দিকথেকে পিছিয়ে সেখানে উন্নয়নের সুষম বন্ঠন নিয়ে এমন চিন্তা করাটা হাসাহাসির পর্যায়ে যাবেনাতো। আমি বিশ্বাস করি, কুড়িগ্রামের সার্বিক উন্নয়নের চিত্র আমরা ২০৩০ সালের মধ্যেই দেখতে পারব। 

আমরা যদি এই উন্নয়নের সুষম বন্ঠন করতে পারি-  তাহলে কুড়িগ্রামের কিছু হারানো ঐতিহ্য যেমন ফিরিয়ে আনা যাবে তেমনি নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে, জেলা সদরের অনাকাঙ্খিত চাপ কমে যাবে, কুড়িগ্রামের সার্বিক উন্নয়ন ঘটবে। আর উন্নয়নের সুষম বন্ঠন না হলে জেলার সার্বিক উন্নয়নের সুফল থেকে ৩/৪ টি উপজেলার মানুষ যেমন বঞ্চিত হবে তেমনি অর্থনৈতিক ভাবে এ উপজেলা গুলো পিছিয়ে পরবে। ফলে কুড়িগ্রামে অসম উন্নয়ন দেখা যাবে যা আমাদের করো কাম্য নয়। কুড়িগ্রাম এখন দেশের সবচেয়ে গরিব ও অবহেলিত জেলা এটি যেমন বাস্তব তেমনি কুড়িগ্রামের উন্নয়নে কুড়িগ্রামের উন্নয়নকামি মানুষের সংগঠন গণকমিটির ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্ঠাও চোখে পরার মত।

আপনাদের অনেকে হয়ত অবগত আছেন উন্নয়নের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কুড়িগ্রাম সফরের পূর্বে গণকমিটি কুড়িগ্রামের উন্নয়নে তাদের ১০ দফা দাবি নিয়ে বর্তমান জেলা প্রশাসক ও কুড়িগ্রামের সংসদ সদস্যদের সাথে কথা বলেছেন- জেলা প্রশাসক ও সংসদ সদস্যরাও গণকমিটিকে আশ্বস্থ করেছিলেন দাবিগুলো পূরনের বিষয়ে। 

যে দাবিগুলো ছিল...

১. ঢাকা-কুড়িগ্রাম-চিলমারী রুটে 'ভাওয়াইয়া এক্সপ্রেস' চালু করতে হবে।
২. কুড়িগ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৩. চিলমারী টু বাহাদুরাবাদ ও রৌমারী ফেরী সংযোগ পুনরায় চালু করতে হবে।
৪. সোনাহাট স্থলবন্দর দ্রুত চালু করা ও দুধকুমার নদ ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত ড্রেজিং কর।
৫. কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন কর।
৬. কুড়িগ্রামে একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দ্রুত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৭. কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্রের চরে প্রাপ্ত খনিজ সম্পদের পাচার বন্ধ করে কুড়িগ্রামের উন্নয়নে ব্যাবহার করতে
   হবে ও শিল্প স্থাপন কর।
৮. তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের মোহনায় পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ কর পর্যটন শিল্পের বিকাশে ব্যবস্থা গ্রহন করতে    হবে।
৯. চিলমারী-সুন্দরগঞ্জ তিস্তা সেতুর নকশাঁয় রেলপথ যুক্ত করতে হবে।
১০. চরাঞ্চলের বালু ভিত্তিক কাঁচ শিল্প প্রতিষ্ঠা কর। ব্রহ্মপুত্র নদে বাঘাড় মাছের অভয়ারণ্য ও চরভিত্তিক    কালাই এর সুষ্ঠু বাজার নিশ্চিত কর। 

উক্ত আলোচনার পরবর্তিতে জানা যায় বর্তমান সরকার কুড়িগ্রামের উন্নয়নে কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা মাথায় রেখে কাজ করে যাওয়ার চিন্তা করছে।

কুড়িগ্রামের উন্নয়নে কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

১. কুড়িগ্রামে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা। এ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য জেলা প্রশাসক প্রাথমিক ভাবে ধরলা ব্রীজ সংলগ্ন ২০০ একর খাস জমি নির্বাচন করেছেন। তবে এটি এখনো চুড়ান্ত নয়।
২. কুড়িগ্রামের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সরকারি কলেজ ও অনার্স চালু করা, যার প্রকৃয়া চলমান।
৩. গণকমিটির আন্দোলনের ফলে এ বছরের জুন/জুলাইয়ে তিস্তা টু চিলমারী রেল লাইনের সংস্কার করে ঘন্টায় ৬০ কি.মি গতি উপযোগী করে লাইন তৈয়েরি করা ও ডেমু/ আন্তঃনগড় ট্রেন চালু হওয়ার সম্ভবনা।
৪. কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সোনাহাট স্থল বন্দর পুরোপুরি চালু হবে।
৫. ২০১৯ সালের মধ্যে চিলমারী-হরিপুরে দ্বিতীয় তিস্তা ব্রিজের কাজ সম্পন্ন হবে। ফলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যাবে।
৬. কুড়িগ্রামে নতুন করে একটি স্টেডিয়াম তৈয়েরি সম্ভবনা। এছাড়াও ২০৩০ সালের মধ্যেই কুড়িগ্রামের উন্নয়নকামি মানুষ ও গণকমিটির কয়েকটি দাবিও সরকারকে নতুন করে ভাবতে হতে পারে,  ফলে আমি বিশ্বাস করি ২০৩০ সালের মধ্যে কুড়িগ্রামের উন্নয়নের সুফল আমরা পেয়ে যাব।

আমি মনেকরি, কুড়িগ্রামের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষে প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের উপজেলা ভিত্তিক সম বন্ঠনেই উন্নয়নের সুষম বন্ঠন অর্থাৎ কুড়িগ্রামের উন্নয়নকে এক কেন্দ্রিক না করে বিভিন্ন উপজেলায়( অন্যান্ন উন্নয়নকে মাথায় রেখে) ছড়িয়ে দেওয়া। যাতে পশ্চাৎপর উপজেলা গুলো অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে আসতে পারে। কুড়িগ্রামের উপজেলা গুলোর জেলা সদর, রাজধানী ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ সুবিধা, বানিজ্যের সুবিধা ইত্যাদি বিষয় মাথায় রাখার পাশাপাশি জনসংখ্যা, ভৌগলিক অবস্থান,অর্থনীতি,এবং অবকাঠামো গত বিষয় মাথায় রেখে অর্থনৈতিক উন্নয়ন মূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। 

কুড়িগ্রামের সার্বিক উন্নয়নে সোনাহাট স্থলবন্দর ও কুড়িগ্রাম সদরকে দুটি টার্নিং পয়েন্ট বিবেচনা করার পাশাপাশি আমাদের পিছিয়ে পরা রৌমারী, চর রাজিবপুর, চিলমারী ও উলিপুর উপজেলার উন্নয়নে নতুন টার্নিং পয়েন্ট করার বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার। ভূরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরীর উন্নয়নে সোনাহাট স্থল বন্দর কে টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে গড়েতোলা। অপরদিকে রাজারহাট, ফুলবাড়ি ও কুড়িগ্রাম সদরের উন্নয়নে কুড়িগ্রাম সদর কে টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচনায় আনাটা যেমন কার্যকর ভূমিকা রাখবে.তেমনি পিছিয়ে পরা রৌমারী, চর রাজিবপুর, চিলমারী ও উলিপুর উপজেলার উন্নয়নে নতুন টার্নিং পয়েন্টটি বিবেচনায় আনার বিষয়টি আমাদের ভাবা দরকার।

কুড়িগ্রামের অধিকাংশ উপজেলার মানুষের প্রধান পেশা কৃষি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো কুড়িগ্রামের উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও চর রাজিবপুরের মানুষের মাথাপিছু চাষ যোগ্য জমির পরিমান সম্ভবত দেশের সর্বনিম্ন। উলিপুর ও রৌমারীর মানুষের মানুষের মাথাপিছু চাষযোগ্য জমির পরিমান যথাক্রমে ০.০৬ ও ০.০৮ একর আর অবহেলিত চিলমারী ও চর রাজিবপুরের কথা বলার প্রয়োজন বোধ করলাম না। এ সামান্য পরিমার সম্পদ, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নদী ভাঙ্গন, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে, বিপুল সংখ্যক জনসংখ্যা নিয়ে এ উপজেলা গুলো কিভাবে এগিয়ে যাবে এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের সকল উন্নয়নকামি মানুষের কাছে প্রশ্ন রাখছি।

আসুন, কুড়িগ্রামের সার্বিক উন্নয়নে সকলে নিজ ক্ষুদ্রস্বার্থ গুলোকে বিসর্জন দিয়ে কুড়িগ্রামের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করি। আর বর্জ্র কন্ঠে আওয়াজ তুলি কুড়িগ্রামের উন্নয়ন চাই, করতে হবে।

পাঠকের মন্তব্য