প্রজন্মকন্ঠ কলাম

অগ্নিকাণ্ড, না হত্যাকাণ্ড ?

বিভুরঞ্জন সরকার

বিভুরঞ্জন সরকার

বিভুরঞ্জন সরকার, উপ-সম্পাদকীয় : একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দেশের মানুষের মনে এক ধরনের ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। কখন কোথায় আগুন লাগবে আর তাতে প্রাণ যাবে কত মানুষের। প্রতিবছর নিয়ম করেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।

অসাবধানতার জন্যই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আগুন লাগে বলে ধারণা করা হয়। তবে মনে রাখা দরকার যে আগুন নিজে কোথাও লাগে না। লাগাতে হয়। আগুন তৈরি করতে হয়। এই তৈরির প্রক্রিয়ায় কারো না কারো ভূমিকা লাগে।

 ‘ভবন যারা বানিয়েছেন তারা ইমারত আইন না মেনে একটি অপরাধ করেছেন আবার হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আরেকটি গুরুতর অপরাধ করেছেন। আমরা দেখতে চাইবো, দুই অপরাধেই তার বা তাদের বিরুদ্ধ যেন আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’ 

বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে যে অগ্নিকাণ্ড সেটাও আপনাআপনি হয় না। যাই হোক না কেন আগুন লাগাটা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কোনো না কারণে আগুন লাগতেই পারে। আগুন মানুষের জন্য অতি প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। আগুন আবিষ্কার মানব সভ্যতা বিকাশের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।

অতি জরুরি এই আগুন আবার মানুষের জীবনে বড় বড় ক্ষতিরও কারণ হয়ে ওঠে কখনও কখনও। তাই কথায় বলে, আগুন নিয়ে খেলতে নেই। আগুনের ধর্মই হলো পুড়িয়ে দেওয়া। এই পোড়ার আবার প্রকারভেদ আছে। কোনো কোনো পোড়া বাঞ্ছিত, আমাদের প্রয়োজনে লাগে। আবার কোনো পোড়া জীবন ও সম্পদ বিনাশ করে।

এই যে বনানীর একটি বহুতল ভবনে আগুন লাগলো, ২৫জন মানুষের মৃত্যু হলো এটি কি কোনো স্বাভাবিক ঘটনা? এটা কি কোনো দুর্ঘটনা? গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, ‘বনানী এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ড কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি হত্যাকাণ্ড'। অনেক বড় কথাই বলেছেন মন্ত্রী।

এখন প্রশ্ন হলো, এই হত্যাকাণ্ড যে বা যারা সংঘটিত করলো তাদের কি আইনের আওতায় আনা হবে, শাস্তি দেওয়া হবে? হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা তো বড় অপরাধ। অপরাধী যদি শাস্তি না পায়, তাহলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা বাড়ে। বনানীর ভবনটি রাজউকের অনুমোদনের বাইরে তৈরি করা হয়েছে। ১৮তলার অনুমোদন নিয়ে ২৩তলা বানানো হয়েছে।

আবার এতবড় ভবনে অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও ছিল না। ফারার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ভবন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে। এত সাহস ভবন মালিক বা মালিকরা পায় কোত্থেকে? পায়, কারণ তারা জানে তাদের টাকা আছে। আর টাকা থাকলে বাংলাদেশে ‘সাত খুন মাফ'। টাকা থাকলে আইন পক্ষে থাকে, ক্ষমতাবানরাও তোয়াজ করে। তাই আইনকে তোয়াক্কা না করার একটি সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী অবশ্য সবাইকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ‘যারা এ কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল তারা যত শক্তিশালী হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে প্রতিষ্ঠানের মালিকের লাইসেন্স বাতিল এবং অতিরিক্ত অতিরিক্ত অংশ ভেঙে ফেলা হবে'। আমরা আশা করবো, মন্ত্রী তার কথা রক্ষায় আন্তরিক হবেন। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয়। আমরা অতীতে অনেক বড় বড় কথা শুনেছি। কিন্তু কাজ হতে দেখিনি। ‘শক্তিশালী’রা অপরাধ করে কিন্তু শাস্তির আওতায় আসে না।

মন্ত্রী আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থার কথা বলে যে দুটি শাস্তির কথা বলেছেন (লাইসেন্স বাতিল এবং ভবনের অননুমোদিত অংশ ভেঙে ফেলা) তা কি খুব কঠোর মনে হচ্ছে? ২৫ জন মানুষের হত্যার শাস্তি কি এতটা লঘু হতে পারে? না।

ভবন যারা বানিয়েছেন তারা ইমারত আইন না মেনে একটি অপরাধ করেছেন আবার হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আরেকটি গুরুতর অপরাধ করেছেন। আমরা দেখতে চাইব, দুই অপরাধেই তার বা তাদের বিরুদ্ধ যেন আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মন্ত্রী নিজে একজন আইনজীবী এবং সজ্জন ব্যক্তি। তার সময়ে অন্তত কোনো ব্যাপারে যেন ‘বজ্রআঁটুনি ফস্কা গেরো’ না হয়।

রাজউকের কর্মকাণ্ড নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক প্রশ্ন আছে। রাজউকের কর্মকর্তারা কারো কারো বেলায় অতি কঠোর আবার কারো কারো বেলায় অতি নরম বলে অভিযোগ আছে। এই যে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ঢাকা শহরে গায়ে গায়ে লাগিয়ে সুউচ্চ ভবন তৈরি হচ্ছে -সেগুলো রাজউকের চোখে পড়ে না কেন?

কোনো ভবনে কোনো অঘটন ঘটলে রাজউক বাণী দেয় – এই ভবনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল না! তো, আগে কেন টনক নড়েনি? কেন অনুমোদনহীন একটি ভবন মালিকের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? এফ আর টাওয়ার কেন এত বছর রাজউক বা অন্য সব দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের নজরের বাইরে থাকলো?

আমরা অতীত নিয়ে নাড়াঘাটা করতে চাই না। আমরা হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসি না। আমরা সামনে তাকাতে চাই। আমরা ভঙ্গুর উন্নয়ন চাই না, টেকসই উন্নয়ন চাই। আমরা চাই আমাদের এই রাজধানীতে আরো উচ্চ ভবন নির্মিত হোক এবং সেটা অবশ্যই আইন ও বিধিবিধান মেনে। প্রতিটি ভবনে যেন সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। একজন মানুষেরও অকাল অকারণ মৃত্যু প্রত্যাশিত নয়।

কেউ হয়তো বলতে পারেন, আগুনে মৃত্যুর সংখ্যা তো কমে আসছে! নিমতলীতে মারা গিয়েছিলেন ১২৪ জন, চকবাজারে ৭১জন আর বনানীতে ২৫ জন। এভাবে মৃতের সংখ্যা দিয়ে যারা সাফল্য-ব্যর্থতা নিরূপণ করেন তাদের প্রতি করুণা দেখানো ছাড়া আর কিছু করার নেই।

আমরা চাইবো আমরা সবাই দায়িত্ব সচেতন হবো, আমাদের কারো দায়িত্বহীনতা, অবহেলা, অসতর্কতা যেন একজনের মানুষেরও প্রাণনাশের কারণ না হয়। দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণার জীবন নয়, আমাদের কাম্য আনন্দময় সুখ সমৃদ্ধির জীবন।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট।

পাঠকের মন্তব্য