অগ্রণী ব্যাংক থেকে ২৫৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ 

অগ্রণী ব্যাংক

অগ্রণী ব্যাংক

অগ্রণী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে ঋণের টাকা পরিশোধ না করে জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে ২৫৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে নুরজাহান গ্রুপের মাররীন ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও তিন ব্যাংক কর্মকর্তাসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় দুদকের সহকারী পরিচালক নিয়ামুল আহসান গাজী বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। বুধবার দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

আসামিরা হলেন— ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মাররীন ভেজিটেবল অয়েল লিমিটেডের চেয়ারম্যান টিপু সুলতান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহমেদ, অগ্রণী ব্যাংকের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) ও আগ্রাবাদ শাখার সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক বেলায়েত হোসেন, সাবেক সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার রমিজ উদ্দিন এবং সাবেক সিনিয়র অফিসার ত্রিপদ চাকমা।

দুদক জানায়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে অগ্রণী ব্যাংকের চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখাসহ বিভিন্ন শাখা থেকে ঋণের টাকা পরিশোধ না করে জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে ২৫৮ কোটি ৫৬ লাখ ১৬ হাজার ৩৭৩ টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যা দুদকের অনুসন্ধানে প্রমাণ হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, অগ্রণী ব্যাংকের আগ্রাবাদ (জাহান ভবন) থেকে চট্টগ্রামের নূরজাহান গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মাররীন ভেজিটেবল অয়েলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহমেদ ২০১১ সালের ১০ মার্চ ঋণের আবেদন করেন। আবেদনে মালয়েশিয়া অথবা ইন্দোনেশিয়া থেকে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন ‘ক্রুড পামওলিন’ আমদানির জন্য ২০ শতাংশ মার্জিনে ১২০ দিন মেয়াদে প্রায় ৩২৭০ কোটি ৪ লাখ টাকার ঋণপত্র এবং মার্জিন অবশিষ্ট ২৬১ কোটি ৬৩ লাখ টাকার টিআর ঋণ মঞ্জুরের কথা বলা হয়। ব্যাংকের ওই শাখার তৎকালীন সিনিয়র অফিসার ত্রিপদ চাকমা ও সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার রমিজ উদ্দিন এ–সংক্রান্ত ঋণ প্রস্তাব তৈরি করেন। ওই ঋণ প্রস্তাব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ক্রেডিট কমিটির সুপারিশ বা মতামতের আলোকে অনুমোদন দিলে অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে মঞ্জুরিপত্র দেওয়া হয়।

সেই মঞ্জুরিপত্রে মাররীন ভেজিটেবল অয়েলস লিমিটেডের অনুকূলে ২০১১ সালের ১৩ অক্টোবর থেকে ২০১২ সালের ২৩ মার্চ পর্যন্ত আটটি টিআর (ট্রাস্ট রিসিট) ও তিনটি পিএডি (পেমেন্ট অ্যাগেইনস্ট ডকুমেন্ট) ঋণ বাবদ মোট ২৮০ কোটি ৭২ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৩ টাকা বিতরণ করে অগ্রণী ব্যাংক। ঋণপত্রের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট শাখায় মোট ১১টি আমদানি দলিল গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান আটটি আমদানি দলিলের প্রয়োজনীয় মার্জিন ব্যাংকের শাখায় জমা করে মূল দলিল দিয়ে আমদানি করা মালামাল খালাস করে। কিন্তু তিনটি আমদানি বিলের মূল দলিল ব্যাংকের শাখায় সংরক্ষিত থাকা অবস্থায় প্রতারণার মাধ্যমে জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে ৯৮ কোটি ২৭ লাখ টাকার মালামাল চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে ছাড় করে। ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান মার্জিন ও অন্যান্য খাতে মোট ২২ কোটি ১৬ লাখ ২২ হাজার টাকা জমা দেয়। বাকি ২৫৮ কোটি ৫৬ লাখ ১৬ হাজার ৩৭৩ টাকা আত্মসাৎ করে।

রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে দুদক বলছে, নূরজাহান গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মাররীন ও জাসমীর ভেজিটেবল অয়েলসের কাছে অগ্রণী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় ২০১১ সালের ১ মে পর্যন্ত ২৩৩ কোটি ৫১ লাখ টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ অনাদায়ি ছিল। নতুন ঋণ অনুমোদনের মঞ্জুরিপত্রের ১ নম্বর শর্তে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় টিআর ঋণের মেয়াদোত্তীর্ণ দায় পরিশোধ সাপেক্ষে ঋণসুবিধা কার্যকর করার শর্ত ছিল। কিন্তু তা প্রতিপালন না করেই ২৮০ কোটি ৭২ লাখ ৩৮ হাজার ৩৭৩ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়।

এ ছাড়া ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনের গাইডলাইনে সহায়ক জামানত হিসেবে সহজেই নগদায়নযোগ্য তরল সম্পদ অথবা কেবল শহর এলাকায় অবস্থিত স্থাবর সম্পত্তি (ক্রেডিট সুবিধার পরিমাণের দ্বিগুণ মূল্যের সম্পত্তি) জামানত রাখার নির্দেশনা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। জামানত হিসেবে শুধু টিআরের সমপরিমাণ চেক (অগ্রিম তারিখ সংবলিত) গ্রহণ করেই ওই ঋণ দেওয়া হয়। কিন্তু গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে প্রয়োজনীয় টাকা না থাকায় চেক নগদায়ন করে ঋণের টাকা আদায় করা সম্ভব হয়নি।

এজাহারে বলা হয়েছে, ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে কোনো সহায়ক জামানত না থাকা এবং ওই ঋণের টাকা আদায় করতে না পারায় সরকারের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের কর্মকর্তারা পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজে অথবা অন্যকে আর্থিকভাবে লাভবান করার অসৎ উদ্দেশ্যে কাজ করেছেন। প্রয়োজনীয় বিধি-বিধান অনুসরণ না করেই মাররীন ভেজিটেবল অয়েলস লিমিটেডের অনুকূলে ঋণ বিতরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে যথাযথভাবে দায়িত্ব (আমদানি করা মালামালের ওপর নিবিড় তদারকি, স্টক পরিদর্শন) পালন করেননি। এ কারণে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান ওই টাকা পরিশোধ না করে প্রতারণা, জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে ২৫৮ কোটি ৫৬ লাখ ১৬ হাজার ৩৭৩ টাকা আত্মসাৎ করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

পাঠকের মন্তব্য