‘বিদ্রোহী’র আগুনে জ্বলছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহের আগুনে জ্বলছে ক্ষমতাসীন দলটি। আওয়ামী লীগের মুখোমুখি এখন আওয়ামী লীগই। বহিষ্কারের হুমকি, কেন্দ্র থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি বার্তার পরও ‘বিদ্রোহী’ দমাতে কার্যত ব্যর্থ দলটির নীতিনির্ধারকরা। ফলে সরকারের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া নৌকার পালে গতি আনতে সর্বোচ্চ কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। 

উপজেলা নির্বাচনে নৌকার বিপক্ষে কাজ করার শাস্তি পাচ্ছেন মন্ত্রী, এমপিসহ অন্তত ৫০ জন শীর্ষ নেতা। ১৫ দিন সময় বেঁধে দিয়ে শোকজ পাঠানো হচ্ছে তাদের নামে। চলতি সপ্তাহ থেকে কারণ দর্শানোর এই চিঠি পাঠানো শুরু হয়েছে।

উপজেলা নির্বাচনসহ বিভিন্ন কারণে ছন্নছাড়া আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরা। কোন্দল, রেষারেষি ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে। পঞ্চম ধাপে বাকি উপজেলার ভোট হবে ১৮ জুন। এদিকে এবার উপজেলা নির্বাচনে মাঠে বিএনপি নেই। তবু প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। এবারই প্রথম দলীয় প্রতীকে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও প্রতিটি উপজেলায়ই আওয়ামী লীগের শত্রু আওয়ামী লীগ। কোথাও কোথাও একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থীও রয়েছেন। 

বিএনপিসহ অনেকগুলো রাজনৈতিক দল অংশ না নেয়ায় চার ধাপে অনুষ্ঠিত ৪৪৫টি উপজেলার মধ্যে নির্বাচনে ৩৩০টি উপজেলায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের। এর মধ্যে নৌকা হেরেছে ১৩৬ উপজেলায়, যেখানে জিতেছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা। বিদ্রোহী প্রার্থীদের এই জয়ের নেপথ্যে তাদের পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে। এ তালিকায় রয়েছেন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীসহ ৫০ জন। 

শুক্রবার দলের সাংগঠনিক সম্পাদকদের রিপোর্টের ভিত্তিতে তৈরি সংসদ সদস্যদের তালিকা দলের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে জমা দেয়ার পর তাদের শোকজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া আত্মীয় ও একান্ত অনুসারীর হয়ে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেয়ার তালিকায় আছেন ৪১ জন সংসদ সদস্য। 

জানা গেছে, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা হলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন, তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন। 

এর আগে ২০১৩ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে দলের শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে সংসদ সদস্যদের তালিকা তৈরি হলেও পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের ক্ষমা করা হলে এবার দলকে সুসংগঠিত রাখতে ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর জবাব দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। জবাবের ওপর তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বলে জানিয়েছেন একাধিক দায়িত্বশীল নেতা। 

জানতে চাইলে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান বলেন, দোষী যেই হোন না কেন কারণ দর্শানোর জবাব সন্তোষজনক না হলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী শাস্তির মুখোমুখি হবেন তারা। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, দলের শৃঙ্খলাভঙ্গকারীদের জন্য এটি একটি কঠোর বার্তা। কেউ যেন শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে পার না পায়, এটি তাকে সতর্ক করে দেয়া।

এদিকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা অনেকটাই অগোছালো, গা ছাড়াভাবে চলছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে গতি ফিরিয়ে আনতে নির্দেশনা দিয়েছেন সভাপতি শেখ হাসিনা। কাউন্সিলের আগেই অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত তৃণমূলের কোন্দল মিটিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এ জন্য দ্রুত মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি, এডহক কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। এ লক্ষ্যে ৮টি বিভাগে ঘোষিত ৮টি টিম দ্রুত গঠন করে তৃণমূলে মেয়াদোত্তীর্ণ ইউনিটগুলোর সম্মেলন করার নির্দেশনা দেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। 

দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য, প্রেসিডিয়াম সদস্য, বিভাগীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের সমন্বয়ে এ টিম গঠন করা হবে। রোজার ঈদের পরই জেলায় জেলায় সফর করে কাজ শুরু করবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত এসব টিমের নেতারা। সব ইউনিট কমিটির কাউন্সিল শেষে অক্টোবরে দলের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। আর এ লক্ষ্যেই ঘর গোছানোর মিশনে নেমেছে টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকা দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগ।

পাঠকের মন্তব্য