বিচারহীনতায় ধুঁকে ধুঁকে জীবন পার

মরে গিয়ে বেঁচে গেছে নুসরাত !

নুসরাত জাহান রাফি

নুসরাত জাহান রাফি

নুসরাত মরে গিয়ে বেঁচে গেছে। বিচারহীনতায় ধুঁকে ধুঁকে জীবন পার করার চেয়ে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া অনেক ভালো। চোখের সামনে খুনী-ধর্ষক আগুন সন্ত্রাসীদের উল্লাস নৃত্য দেখে দেখে বিবেকের আগুনে বার বার পুড়ে মরার চেয়ে নুসরাত একবারই মরে গিয়ে বুদ্ধিমানের কাজ করেছে।

যে দেশে সাংবাদিক সাগর-রুনীর হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ৬৪ বার পেছানোর পর ৬৫ বার পেছানোর আবেদন রেডি রাখা হয়, সে দেশে বেঁচে থাকা মানেই আত্মহত্যা করা। কাজেই নুসরাত মরে গিয়ে অন্তত বিবেকের দাবানল থেকে রেহাই পেয়েছে।

হঠাৎ করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নাজিল হয়েছেন। তিনি একটা মারাত্মক কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন বিচার হচ্ছে না বলেই এমন নৃশংসতা। বলেন কী ? বিচার হচ্ছে না মানে? বিচার তো হতোই। তবে সাক্ষী দুর্বল হলে কি বিচার হয় ? ঘটনা সত্য কিন্তু সাক্ষী দুর্বল। তাই বিচার হচ্ছে না। নুসরাত হত্যারও তাই হবে।

মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এপর্যন্ত বলেই চুপসে যাননি । নুসরাত জাহান রাফির সঙ্গে দুর্ব্যবহারকারী পুলিশ সদসদ্যদের শাস্তির দাবি করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান রিয়াজুল করিম।

বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মর্গের সামনে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, নির্যাতিত নুসরাত থানায় গিয়েছিলেন প্রতিকার পেতে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে থানা পুলিশ তাকে অসম্মান করেছেন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং শাস্তিযোগ্য। শুনেছি, থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া রাষ্ট্রের দায়।

নিহত নুসরাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নুসরাত অন্যায়ের প্রতিবাদ করে গেছেন। সে সাহসী নারীদের কাছে দৃষ্টান্ত। আমরা তার কাছ বেঁচে থাকার, প্রতিবাদ করার শিক্ষা পাই। আজকে ‘নুসরাত দিবস’ ঘোষণা করার প্রয়োজন অনুভব করছি।

চেয়ারম্যান বলেন, অপরাধের সঠিক বিচার হচ্ছে না বলে এমন নৃশংসতা। আমরা দেখেছি, অভিযুক্ত অধ্যক্ষ হাসিমুখে কথা বলছেন। তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই অপরাধীরা এমন সাহস পাচ্ছে। তিনি বলেন, দ্রুত বিচার সম্পন্নের জন্য নতুন আইনের দাবি উঠেছে এবং এটি সময়ের দাবি। তবে আইন করলেই সমাধান নয়। আইনের প্রয়োগ না করতে পারলে মানুষ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবে।

উল্লেখ্য, ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার ছাত্রী ছিলেন নুসরাত জাহান রাফি। এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা নুসরাতকে তার কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করেন- এমন অভিযোগে গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার। ছাত্রীর স্বজনদের অভিযোগ, মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় অধ্যক্ষের পক্ষের লোকজন নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন।

এরপর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন নুসরাত। গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় মারা যান তিনি। তারপর? তারপর শুধু তারপরই থেকে যায়। এরকম অসংখ্য নুসরাতেরা মারা যায়,পুড়ে যায়। ছাই হয়ে যায়।

শুধু আমাদের বিবেক মরে না। বিবেক পোড়ে না।

পাঠকের মন্তব্য