এখনি সময়

গর্জে ওঠো বাংলাদেশ

নুসরাত-তনু

নুসরাত-তনু

ফেনীর সোনাগাজীতে নিপীড়নের প্রতিবাদ করায় মাদ্রাসা অধ্যক্ষের লোকজনের দেয়া আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়া নুসরাত জাহান রাফির তদন্তে যেন কুমিল্লার কলেজছাত্রী তনুর মতো সময় না লাগে সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন হাইকোর্ট। নুসরাতের মৃত্যুর খবর পত্রিকায় দেখে তা বৃহস্পতিবার আদালতের নজরে আনেন ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। এতে হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এমন মন্তব্য করেন।

আদালত বলেন, যেহেতু বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন, আমরা এ বিষয়ে কোনো আদেশ দিতে চাই না। আমরা শুধু বলব- নুসরাতের ঘটনা তনু বা অন্যদের মতো যেন হারিয়ে না যায়। নুসরাত খুনের বিষয়ে তদন্ত কাজে যেন কোনো গাফিলতি না থাকে।

১৯ বছর বয়সী তনু কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। তনুর বাবা কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে চাকরিরত ছিলেন। ২০১৬ সালের ২০শে মার্চ তনুর মৃতদেহ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে পাওয়া যায়। প্রাইভেট টিউটরের কাছে এক বাসায় পড়তে গিয়ে তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন।

কুমিল্লা শহরের কোতোয়ালী মডেল থানায় অজ্ঞাত আসামীর বিরূদ্ধের তনুর বাবা ইয়ার হোসেন একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ মামলাটি গোয়েন্দাদের কাছে হস্তান্ত করে। ২০১৬ সালের পহেলা এপ্রিল মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তরিত করা হয়। ৪ই এপ্রিলে প্রকাশিত ময়নাতদন্তে বলা হয়, তনুকে ধর্ষণ কিংবা হত্যার কোন আলামত পাওয়া যায় নি। 

উক্ত ময়নাতদন্তে বিতর্কের সৃষ্টি করলে, উচ্চ আদালত পুনরায় ময়নাতদন্তের রায় দেন। প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে তনুর মৃতদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। কুমিল্লার মির্জাপুরে তনুর লাশ দাফন করা হয়।

আদালতের রায়ে দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে করা হলে ধর্ষনের আলামত পাওয়া যায়। ২০১৬ সালের মে মাসে সিআইডির তত্ত্বাবধানে তনুর পরিহিত অন্তর্বাসে প্রাপ্ত বীর্যের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। সিআইডি নিজস্ব গবেষণাগারে তিনজন পুরুষের বীর্যের অস্তিত্ব তনুর অন্তর্বাসে পাওয়া যায়।

ফেনী জেলার সোনাগাজীতে মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহানের দেহে কেরোসিন ঢেলে তাকে হত্যা করার তদন্তভার পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু নিয়মিত তদন্তের বাইরে পিবিআই-এর এই তদন্তের বিশেষত্ব কী ?

পিবিআই প্রধান পুলিশের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার জানান, পিবিআই একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান। পুলিশের মেধা এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা ঘটনার মূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন।

এই ঘটনার জন্য কে বা কারা দায়ী তাদের খুঁজে বের করার জন্য পিবিআইয়ের একটি বিশেষ টিম ইতোমধ্যেই তৎপর হয়েছে বলে তিনি জানান। একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তদন্তের সার্বিক তত্ত্বাবধান করছেন।

পিবিআই প্রধান পুলিশের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, ফেনীর পিবিআই অফিসের কর্মীরা ছাড়াও আশেপাশের কিছু জেলার চৌকশ কিছু অফিসার তদন্তের সাথে জড়িত রয়েছেন। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে সত্য প্রতিষ্ঠা করা, বলছিলেন তিনি এই মামলার সাথে জড়িত সবার সাথে আমরা কথা বলেছি। আরও কিছু লোককে আমরা খুঁজছি।

ঐ ছাত্রীর শরীরের ৮০% শতাংশই আগুনে ঝলসে গিয়েছিল এবং তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল।
মেয়েটির পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে সে কিছুদিন আগে তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলা করেছিল।

এরপর ঐ অধ্যক্ষের সমর্থকরা নুসরাত জাহানকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করে। পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেন, এই ঘটনায় যে মামলাগুলো হয়েছে, তারপর বেশ ক'জন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

নুসরাত অন্যায়ের প্রতিবাদ করে গেছেন। সে সাহসী নারীদের কাছে দৃষ্টান্ত। 

উল্লেখ্য, ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার ছাত্রী ছিলেন নুসরাত জাহান রাফি। এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা নুসরাতকে তার কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করেন- এমন অভিযোগে গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার। ছাত্রীর স্বজনদের অভিযোগ, মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় অধ্যক্ষের পক্ষের লোকজন নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন।

এরপর থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন নুসরাত। গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় মারা যান তিনি। তারপর? তারপর শুধু তারপরই থেকে যায়। এরকম অসংখ্য নুসরাতেরা মারা যায়,পুড়ে যায়। ছাই হয়ে যায়।

 

পাঠকের মন্তব্য