রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে ৯৬ ঘণ্টার ধর্মঘট কেন ?

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে ৯৬ ঘণ্টার ধর্মঘট কেন?

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে ৯৬ ঘণ্টার ধর্মঘট কেন?

রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকরা ৯ দফা দাবিতে ধর্মঘট শুরু করেছে৷ ধর্মঘটের কেন্দ্র খুলনা, কারণ, সেখানেই সরকারি বড় পাটকলগুলোর অবস্থান৷ শ্রমিকরা ধর্মঘট চলাকালে ৪ ঘন্টা করে রাজপথ ও রেলপথ অবরোধের কর্মসূচিও দিয়েছেন৷

মোট সরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৭টি৷ এসব পাটকলে কম করে হলেও প্রায় এক লাখ শ্রমিক কাজ করেন৷ অন্যদিকে সরকারি পাটকল একটি ভর্তুকি খাত৷ লোকসানি এই পাটকলগুলো চালু রাখতে এবং শ্রমিক কর্মচারীদের বেতন দিতে সরকারকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দিতে হয়৷ তবে শ্রকিমরা মনে করেন, এই ভর্তুকি এবং লোকসানের জন্য তাঁরা দায়ী নন, কারণ, বিশ্বে পাটপণ্যের চাহিদা আবার বাড়লেও সরকারি পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন হচ্ছে না৷ 

পাটকলগুলো পুরনো মেশিন দিয়ে চলছে, যার ফলে উৎপাদনক্ষমতা শতকরা ৪০ ভাগে নেমে এসেছে৷ আর বিশ্বে পাটের যে আধুনিক পণ্যের চাহিদা, তা বাংলাদেশের সরকারি পাটকলে উৎপাদনের কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না৷ অথচ সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বেসরকারি পাটকলগুলো ব্যবসা করছে৷ পাটকল শ্রমিকদের প্রধান দাবি হলো, ২০১৫ সালের বেতন বোর্ড বাস্তবায়ন৷ আর তা বাস্তবায়ন হলে শ্রমিকদের বেতন প্রায় দ্বিগুন হয়ে যাবে৷

১৫, ১৬, ১৭ ও ১৮ এপ্রিল টানা ৯৬ ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রেখে ধর্মঘট পালন ও এই সময়ে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত ৪ ঘণ্টা রাজপথ-রেলপথ অবরোধের এই কর্মসূচির পর শ্রমিকরা আরো ধারাবাহিক কর্মসূচি দিয়েছেন৷ সেই কর্মসূচির অংশ অনুযায়ী, ২৫ এপ্রিল প্রত্যেক মিলে শ্রমিক সভা হবে৷ ২৭, ২৮ ও ২৯ এপ্রিল আবার টানা ৭২ ঘণ্টার ধর্মঘট এবং প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ৬ ঘণ্টা রাজপথ-রেলপথ অবরোধ৷ তাঁদের ৯ দফা দাবি নিয়ে গত ৬ এপ্রিল ঢাকায় বিজেএমসির প্রধান কার্যালয়ে দ্বি-পাক্ষিক আলোচনা হলেও তা সফল হয়নি৷ এর আগে শ্রমিকরা একই দাবিতে ২, ৩ ও ৪ এপ্রিল দেশের   সব সরকারি পাটকলে টানা ৭২ ঘণ্টা ধর্মঘট ও ৪ ঘণ্টা করে রাজপথ ও রেলপথ অবরোধ কর্মসুচি পালন করেন৷

শ্রমিকদের ৯ দফা দাবির মধ্যে জাতীয় মজুরি কমিশন-২০১৫-র রোয়েদাদ বাস্তবায়ন, পাটক্রয়ে অর্থবরাদ্দ, অস্থায়ী শ্রমিকদের স্থায়ী করা, অবসরপ্রাপ্ত শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বকেয়া পরিশোধ, শ্রমিকদের প্রতি সপ্তাহে মজুরি প্রতি সপ্তাহে পরিশোধ, বকেয়া মজুরি প্রদান অন্যতম৷

উৎপাদন না করে কম মজুরি দিলে হবে না : খলিলুর রহমান

রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকল শ্রমিক (সিবিএ নন-সিবিএ) ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক খলিলুর রহমান খুলনা থেকে টেলিফোনে বলেন, ‘‘মজুরি বোর্ড ২০১৬ সালে বাস্তবায়ন হলেও আমাদের সরকারি পাটকলে হয়নি৷ এটা ওই সময় থেকেই বাস্তবায়ন করতে হবে৷ শ্রমিকদের ১২ থেকে ১৭ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে৷ তা দিতে হবে৷ উৎপাদন না করে আমাদের বসিয়ে রেখে কম মজুরি দিলে হবে না৷ আমাদের গড় মজুরি দিতে হবে৷''

তিনি বলেন, ‘‘পাটকলগুলোতে  প্রয়োজনীয় মেশিন নাই৷ কোনো পাটকলে ৩০ ভাগ আছে৷ সর্বোচ্চ আছে ৪০ ভাগ৷ কিন্তু থাকতে হবে শতভাগ৷ তাহলে উৎপাদনও শতভাগ হবে৷ আর এগুলো আধুনিকায়নও করা হয় না৷ পাট না কিনে উৎপাদন বন্ধ রেখে আমাদের বসিয়ে রাখা হয়৷ আমরা এর অবসান চাই৷''

তিনি আরো বলেন, ২০১১ সালের পর থেকে অস্থায়ী শ্রমিকদের আর স্থায়ী করা হচ্ছে না৷ আমাদের দাবি শূন্য পদের বিপরীতে শ্রমিকদের স্থায়ী করতে হবে৷

পাটকলগুলোর যন্ত্রপাতি পুরনো আমালের : গনিজ উদ্দিন মিয়া

খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিল দেশের বড় জুটমিলগুলোর একটি৷ সেখানে সাড়ে ৫ হাজারেরও বেশি শ্রমিক কাজ করেন৷ এই মিলের প্রধান (প্রকল্প সমন্বয়কারী) গনিজ উদ্দিন মিয়া বলেন, ‘‘শ্রমিকদের যে প্রধান দাবি ২০১৫ সালের মজুরি বোর্ড বাস্তবায়ন, তা এরইমধ্যে অন্যান্য সেক্টর কর্পোরেশনে বাস্তবায়ন হয়ে গেছে৷ কিন্তু সরকারি পাটকলে হয়নি৷ এটা বাস্তবায়ন করতে হলে বছরে আরো ১০০ কোটি টাকা বাড়তি লাগবে৷ এখন শ্রমিকরা মাসে গড়ে ১৮  হাজার টাকা করে মজুরি পান৷ মজুরি বোর্ড বাস্তবায়ন হলে তাঁরা প্রায় দ্বিগুন পাবেন৷ আর এই পুরো টাকাটাই সরকারের ভর্তুকি দিতে হবে বিজেএমসিকে৷ কিন্তু সরকার আর ভর্তুকি দিতে চায় না, কারণ, সরকারি পাটকলের সবগুলোই লোকসানি এবং ভর্তুকি দিয়ে চলছে৷''

তিনি বলেন, প্রধানত দু'টি কারণে সরকারি পাটকলগুলো ব্যবসা করতে পারছে না৷ প্রথমত, পাটকলগুলোর যন্ত্রপাতি পুরণো আমলের৷ দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের মানসিকতা৷ তাঁর মতে, ‘‘সরকারি পাটকলে গতানুগতিক চট, বস্তা আর সুতা তৈরি হয়৷ কিন্ত আধুনিক যে পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ছে, তা উৎপাদনের কোনো মেশিন বা ব্যবস্থা নেই সরকারি পাটকলে৷ আর সুতা যা হয় তা-ও নতুন মানের এবং চাহিদার নয়৷ শ্রমিকদের মানসিকতা হলো, তাঁরা সরকারি শ্রমিক, উৎপাদন হোক বা না হোক তাঁরা বেতন পাবেন, লোকসান দেখা তাঁদের বিষয় নয়৷ শিল্পকে লাভজনক করে যে বেতন নিতে হবে এই মানসিকতা কোনো পক্ষের মধ্যেই নেই৷

তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সরকারি পাটকলগুলো আধুনিকায়ন এবং লাভজনক করার কোনো প্রক্রিয়া এখানো দৃশ্যমান নয়৷

বিজেএমসি থেকে জানা গেছে, খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি জুটমিলের শ্রমিক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের ৬৪টি সপ্তাহের বেতন ও মজুরি ৪৪ কোটি ২০ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে৷ এর মধ্যে শুধু শ্রমিকদের মজুরি বকেয়া রয়েছে ৩১ কোটি ১৮ লাখ ৫৮ হাজার টাকা৷ এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিন মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে ১২ কোটি ৩৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা৷

আলীম, কার্পেটিং, খালিশপুর ও দৌলতপুর জুটমিলের ৬ সপ্তাহ এবং ক্রিসেন্ট, ইস্টার্ন, প্লাটিনাম, স্টার ও জেজেআই জুটমিলের শ্রমিকদের ৮ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে৷

শ্রমিকদের দাবী অর্থের সঙ্গে জড়িত, অর্থমন্ত্রী দেশে ফিরলে প্রক্রিয়া শুরু হবে: গোলাম দস্তগীর গাজী
এ নিয়ে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, শ্রমিকদের এই দাবি অর্থের সঙ্গে জড়িত৷ অর্থমন্ত্রী দেশের বাইরে রয়েছেন৷ তিনি দেশে ফিরলে তাঁদের দাবি পুরনের প্রক্রিয়া শুরু হবে৷ তিনি ফিরে না আসা পর্যন্ত শ্রমিকদের অপেক্ষা করতে হবে৷ তাঁর সিদ্ধান্ত ছাড়া তো আর টাকা দেয়া যাবে না৷ তিনি আরেক প্রশ্নের জবাবে বলেন, সরকার পাটকলগুলোতে ভর্তুকি দিয়ে আসছে৷ ভর্তুকি অব্যাহত রাখার চিন্তাভাবনা আছে৷

বিজেএমসি'র চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ নসির বৈঠকে থাকায় কথা বলতে পারেনি৷ সোমবার বিকেলে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে শ্রমমন্ত্রী এবং বিজেএমসি'র চেয়ারম্যানের বৈঠক হওয়ার কথা৷

প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে সরকার দেশের বিভিন্ন খাতের সব শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ করে৷ মিলগুলির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয় বিভিন্ন কর্পোরেশন বা সংস্থাকে৷ জুট মিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি)-কে পাটকলগুলির পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়৷ পাটকলগুলো ধীরে ধীরে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়৷ ক্রমাগত লোকসানের কারণে প্রতিষ্ঠার ৫২ বছরের পর ২০০২ সালের ৩০ জুন বন্ধ করে দেয়া হয় এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজী জুট মিল৷

পাঠকের মন্তব্য