নরেন্দ্র মোদী না রাহুল গান্ধী, সাফ জানাল আওয়ামী লীগ

নরেন্দ্র মোদী না রাহুল গান্ধী, সাফ জানাল আওয়ামী লীগ

নরেন্দ্র মোদী না রাহুল গান্ধী, সাফ জানাল আওয়ামী লীগ

ভারতে সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন চলছে৷ অন্যতম প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনকে কেমন চোখে দেখছে৷ নতুন সরকার গঠনের পরে কেমন হবে নয়াদিল্লি-ঢাকার কূটনৈতিক অবস্থান৷ বাংলাভাষী পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি, ভারতের কেন্দ্রীয় অবস্থান এসব নিয়েই সাক্ষাতকার দিলেন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমেদ৷ 

এর তরফে প্রশ্নগুলি সাজিয়েছেন দেবময় ঘোষ ও প্রসেনজিৎ চৌধুরী৷ সাক্ষাতকার নেওয়ার বিষয়ে সাহায্য করেছেন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য জসিম উদ্দিন আকন্দ রনি৷

প্রশ্ন : ১৭তম লোকসভা নির্বাচন ভারতে৷ প্রতিবেশী রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ৷ বাংলাদেশের সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ৷ এই রাজ্যের ভোট রাজনীতি কতটা প্রভাব ফেলে বাংলাদেশে ?

ড. শাম্মী আহমেদ : আমি মনে করি, ভারতের নির্বাচন সেদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, সমগ্র ভারতে বাংলাদেশের সাথে ঐতিহ্যগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল আছে ভবিষ্যতে থাকবে। তাছাড়া আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সব কিছুই প্রায় এক ও অভিন্ন। সুতরাং যেই ক্ষমতায় আসুক আমাদের সাথে ভারতের সম্পর্ক অটুট থাকবে।

প্রশ্ন : পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় না অন্য কেউ ? আওয়ামী লীগ কেমন ভাবছে

ড. শাম্মী আহমেদ : আমি আগেই বলেছি, পশ্চিমবঙ্গে যেই ক্ষমতায় আসুক আওয়ামীলীগের সাথে সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণই হবে। আওয়ামী লীগ মনে করে, পারস্পরিক সহযোগিতা আর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দিয়ে অনেক কিছুই অর্জন করা সম্ভব। আমরা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে বিশ্বাসী, কারো সাথে বৈরিতা নয়।

প্রশ্ন : নরেন্দ্র মোদী না রাহুল গান্ধী, ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাকে চাইছেন ?

ড. শাম্মী আহমেদ : দেখুন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা নির্ধারণ করবে ভারতের জনগণ। ভারতের জনগণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যাকে নির্বাচিত করবে বাংলাদেশ তার সাথেই অতীতের মতো আন্তরিকতার সাথে সুন্দর স্বাভাবিক সম্পর্ক সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

প্রশ্ন : বাঙালি নেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ রয়েছে, দুই বাঙালি মহিলা প্রধানমন্ত্রী থাকলে উপমহাদেশের রাজনীতিতে কতটা প্রভাব পড়বে ?

ড. শাম্মী আহমেদ : বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে বিশ্বের নারী উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত হয়েছেন। ভারতে যদি কোনো নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হোন সেটা উপমহাদেশের জন্য গৌরবের। আমি বিশ্বাস করি, নারী অধিকার আদায়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মতো তিনিও ভূমিকা রাখতে পারবেন।

প্রশ্ন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সফল তিস্তা চুক্তির মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ ভারতের লোকসভা নির্বাচন পরবর্তী পর্বে তিস্তা চুক্তির সফল রূপায়ণে মমতার কী ভূমিকা আশা করছে আওয়ামী লীগ ?

ড. শাম্মী আহমেদ : আওয়ামী লীগ আশা করে, সকল অমীমাংসিত বিষয় গুলো প্রাধান্য দিয়ে দ্রুত সময়ে সমস্যা গুলো নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখা। তিস্তা চুক্তি সহ সকল জনগুরুত্বপূর্ণ চুক্তি বাস্তবায়ন করে দুদেশের সম্পর্ক আরো গতিশীল করা।

প্রশ্ন : পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা বাড়িয়েছে বিজেপি৷ তাদের বক্তব্য-নাগরিকত্ব (সংশোধনী আইন) পাশ করিয়ে বাংলাদেশী মুসলমানদের ভারতে বেআইনি অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে৷ এনআরসি তো শুধুমাত্র সরকারি কার্য পদ্ধতি, কিন্তু অনুপ্রবেশকারীদের হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিজেপি৷ বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের রাজ্যগুলিতে এই আইন কঠোরভাবে বলবত করা হবে বলছে মোদীর সরকার৷ বাংলাদেশে শাসক দলের বক্তব্য কী ?
 
ড. শাম্মী আহমেদ : আমি মনে করি, ভারতে বাংলাদেশী কোনো অনুপ্রবেশকারী নেই। ভারত বিভাজনের পরবর্তীকালে অনেকেই নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে। এত বছর পরে এসে যদি কেউ এ কথা বলে তাহলে আমাদের কিছু করার নেই।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ সংখ্যালঘু জনতা বিশেষ করে হিন্দুরা বারে বারে আক্রান্ত হয়েছেন৷ আওয়ামী লীগ ধর্ম নিরপেক্ষতার বার্তা দেয়৷ মুজিবুর রহমানের বাংলায় তবুও কেন এই ঘটনা ঘটে ?

ড.শাম্মী আহমেদ : সংখ্যালঘু শব্দটিতে আমার আপত্তি আছে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের সকল নাগরিক সমান ভাবে ধর্ম,বর্ণ, সমান অধিকার ভোগ করে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক জান্তা এবং তাদের দোসরদের মাধ্যমে সংঘটিত দল সমূহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচার শুরু করে। শুধু সংখ্যালঘু নির্যাতন নয়, এই সমস্ত তথাকথিত যারা অগণতান্ত্রিক ভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেছে তারা একই ভাবে আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীদের উপর নির্যাতন করেছে। তবে আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে বিধায় সংখ্যা লঘু নির্যাতন কোনোভাবেই সহ্য করে না। বরং আইনের আওতায় এনে নির্যাতনকারীদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি প্রদান করেছে।

প্রশ্ন : ভারত-বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক৷ শেখ মুজিবুর রহমান ভারতে পূজিত হন ৷ সেক্ষেত্রে ভারতে সাধারণ নির্বাচনের পর যে নতুন সরকার গঠিত হবে, সেই সরকারকে আওয়ামী লীগ কী বার্তা দেবে ?

ড. শাম্মী আহমেদ : দেখুন, বাংলাদেশ আর ভারতের সম্পর্ক একটি ভার্তৃত্বপুর্ণ সম্পর্ক। ১৯৭১ সালের ভারতের অবদান এবং সেই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বাংলাদেশ কখনোই ভুলবেনা।

প্রশ্ন : মুখে শান্তির কথা বলে পাকিস্তান তাদের চিরাচরিত অভ্যাসবশত সন্ত্রাসে মদত দিয়ে চলেছে ৷ জম্মু-কাশ্মীরে এবং অন্যান্য স্থানে জঙ্গি নাশকতায় পাক মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদী সংগঠন-জইশ ই মহম্মদ, লস্কর ই তৈবা, হিজবুল মুজাহিদিনের মতো সংগঠনগুলি ভারতের বিরুদ্ধে ছায়াযুদ্ধ ঘোষণা করেছে৷ সারা বিশ্বে পাকিস্তানের এই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করছে ভারত৷ বাংলাদেশ কি ভারতের পাশে রয়েছে ?

ড. শাম্মী আহমেদ : জঙ্গি মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত, বাংলাদেশ যেকোনো জঙ্গি তৎপরতা কঠোর ভাবে দমন করেছে,এবং করবে। বাংলাদেশের মাটিকে কখনোই জঙ্গি ঘাটি হিসেবে ব্যবহার করতে দেবো না। আমরা শান্তি চাই, বাংলাদেশ শান্তি প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর।

প্রশ্ন : সাম্প্রতিক পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানে জইশ ই মহম্মদের সবথেকে বড় জঙ্গি ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করে এয়ার সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালায় ভারতের বিমান বাহিনী৷ নরেন্দ্র মোদী সরকারের ঘোষিত এজেন্ডা পাক মদতপুষ্ট জঙ্গিবাদে ভারত রক্তাক্ত হলে পাকিস্তানকে উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে, একবার নয় বারবার দেওয়া হবে৷ প্রতিবেশী হিসেবে এই প্রত্যাঘাত বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কী ?

ড. শাম্মী আহমেদ : বাংলাদেশের অবস্থান সত্য, সুন্দর, ন্যায়ের পক্ষে।

প্রশ্ন : রাষ্ট্রসংঘ (জাতিসংঘ) নিরাপত্তা পরিষদে আন্তর্জাতিক জঙ্গির তালিকায় মৌলানা মাসুদ আজহার ফেলার বিপক্ষে ভেটো দিয়েছে চিন৷ প্রতিবেশী চিন সন্ত্রাসবাদ নিয়ে এক্ষেত্রে যে ভূমিকা নিয়েছে সেই সম্পর্কে আওয়ামী লীগের অবস্থান কী ?

ড. শাম্মী আহমেদ : দেখুন, আমি আগেও বলেছি, আওয়ামী লীগ শান্তির পক্ষে। আওয়ামী লীগ সংঘাত চায় না,শান্তি চায়। শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের সকল দেশের সাথে একযোগে কাজ করবে এবং শান্তি বজায়ে ভূমিকা রাখবে। জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রগুলো একিভাবে একযোগে সমান গুরুত্ব দিয়ে পারস্পরিক সুসম্পর্ক অটুট রাখবে বলে বিশ্বাস করি।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের মাটিকে ভারতের বিরুদ্ধে কখনও ব্যবহার হতে দেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ তাঁর সরকারের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব রয়েছে৷ সেক্ষেত্রে আগামী দিনে ভারত সরকারের থেকে কী আশা করে আওয়ামী লীগ ?

ড. শাম্মী আহমেদ : বাংলাদেশের সকল সমস্যা ভারত সমান গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করবে। এটা আশা করে বাংলাদেশ।

প্রশ্ন : দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার চিনের আগ্রাসী বিদেশ নীতি চিন্তায় রেখেছে ভারতকে৷ প্রতিবেশী হিসেবে এই অঞ্চলে চিনের ভূমিকাকে কীভাবে দেখছে আওয়ামী লীগ ?

ড. শাম্মী আহমেদ : বাংলাদেশ কখনোই আগ্রাসী নীতিকে সমর্থন করেনা। বাংলাদেশ আশা করে, প্রত্যেক রাষ্ট্র তার নিজস্ব সার্বভৌমত্বের সম্মান বজায় রেখে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সুদৃঢ় সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

প্রশ্ন : ক্রিকেট থেকে চলচ্চিত্র, সঙ্গীত থেকে নাটক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলাম, লালন ফকির থেকে আব্বাস উদ্দিন, আয়ুব বাচ্চু থেকে রূপম ইসলাম, গঙ্গা-পদ্মা, ইলিশ-চিংড়ি- বাঙালির আবেগ, মনন, ঐতিহ্য সংস্কৃতির ধারক ও বাহক পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ৷ এই দুই ভূখণ্ডের মানুষ মনে করেন পেটের খিদে থেকে বুকের প্রাণ তার থেকে বড় হল মুখের ভাষা৷ রাজনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি আগামী দিনে ভারত-বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কোন পর্যায়ে থাকবে বলে মনে করছেন ?

ড. শাম্মী আহমেদ : এটি অনেক আবেগের একটি ব্যাপার, বাংলাদেশ আর ভারত কাছাকাছি দুটি রাষ্ট্র হওয়ায় অনেক কিছুই প্রায় একই ধরনের। ভাষা,আচার আচরণ, খেলাধুলা, রীতি নীতি, সংস্কৃতি, সামাজিক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক প্রায় সবকিছুই সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে এই সব কিছুর সংমিশ্রণ সুন্দর ভাবেই চলমান থাকবে বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে অতীতের মতো সগৌরবে।

পাঠকের মন্তব্য