ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূরীকরণে প্রয়োজন গ্রামের পুনরুজ্জীবন

ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূরীকরণে প্রয়োজন গ্রামের পুনরুজ্জীবন

ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূরীকরণে প্রয়োজন গ্রামের পুনরুজ্জীবন

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশই গ্রামে বাস করে। অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশের বাসও গ্রামে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ ও বনাঞ্চল ধ্বংসের মতো বিভিন্ন কারণে হুমকির মুখে রয়েছে গ্রামীণ পরিবেশ; বাড়ছে ক্ষুধার প্রকোপ। এ অবস্থায় ক্ষুধা-দারিদ্র্য দূর করতে হলে গ্রামে পুনরুজ্জীবন জরুরি বলে মত দিয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি)।

গতকাল রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক অনুষ্ঠানে ‘গ্লোবাল ফুড পলিসি রিপোর্ট-২০১৯’ প্রকাশ করে সংস্থাটি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক এ প্রতিবেদনের মোড়ক উন্মোচন করেন।

প্রতিবেদনের মূল ফোকাস ছিল গ্রামের পুনরুজ্জীবন ত্বরান্বিত করা। এতে বলা হয়, ক্ষুধা, অপুষ্টি, ক্রমাগত দারিদ্র্য, সীমিত অর্থনৈতিক সুবিধা ও পরিবেশগত অবনতির চক্রের কারণে গ্রামীণ এলাকা বিশ্বের অনেক দেশের সংকটের কারণ। গ্রামীণ এ সংকট টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার উন্নয়নের জন্য হুমকি। এ অবস্থায় গ্রামে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজের সুযোগ সৃষ্টি, লৈঙ্গিক সমতা অর্জন, পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, জ্বালানি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে এক দশকের মধ্যে গ্রামকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব।

অনুষ্ঠানে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের ওপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইফপ্রির প্রধান কার্যালয়ের মহাপরিচালক শেনজেন ফান। এতে বলা হয়, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশই গ্রামে বাস করে। বর্তমানে বিশ্বে গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার ১৭ শতাংশ এবং শহরে এ হার ৭ শতাংশ। বিশ্বের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশই এখন গ্রামে বাস করে।

প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ায় গ্রামীণ উন্নয়ন এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার নির্দেশক হিসেবে বাংলাদেশকে তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং লৈঙ্গিক সমতার মাধ্যমে বাংলাদেশ গ্রামীণ পুনরুজ্জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। গ্রামীণ সড়কের উন্নয়ন এবং ছেলে ও মেয়ে উভয়ের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বৃদ্ধি বাংলাদেশের অতিদারিদ্র্য ৩ থেকে ৬ শতাংশে কমিয়ে আনতে সাহায্য করবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের উন্নয়নের জন্য গৃহীত কর্মসূচি, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীকে সহায়তা করার মাধ্যমেও এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকার মৌলিক পয়োনিষ্কাশনের সুযোগ এখনো সীমিত। এখনো তা ৪০ শতাংশের মধ্যেই রয়েছে। গ্রামে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব শিশুর খর্বাকৃতির জন্য দায়ী। দেশে এখনো পাঁচ বছরের কম বয়সী এক-তৃতীয়াংশ শিশু খর্বকায়; অন্যান্য দেশের তুলনায় যা অনেক বেশি। গ্রামের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এসব ক্ষেত্রের উন্নয়ন এখনো কঠিন। বাংলাদেশের উচিত ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রামের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন করা। সেই সঙ্গে যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ও আধুনিক-বাণিজ্যিক কৃষি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সর্বোপরি গ্রামে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে গ্রামের মানুষের আয়ের সংস্থান জরুরি।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ইফপ্রির এ-দেশীয় প্রতিনিধি ড. আকতার আহমেদ বলেন, গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সরকারের উচিত গ্রামীণ এলাকার সড়ক, স্বাস্থ্য, পুষ্টির উন্নয়ন ও লৈঙ্গিক সমতার মাধ্যমে উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।

পাশাপাশি গ্রামীণ ও শহরের উন্নয়ন বৈষম্য দূরীকরণ ও গ্রামের প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে ইফপ্রির প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এখনো বিভিন্ন ধরনের বঞ্চনা ও পরিবেশগত অবনতি, কৃষি-সংক্রান্ত সংকট, তরুণ জনগোষ্ঠীর বেকারত্বসহ বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে স্বাস্থ্যকর, কর্মময় জীবনের জন্য বিনিয়োগের মাধ্যমে গ্রামকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার ছিল ‘আমার গ্রাম আমার শহর’। প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে। উন্নয়নচিন্তার মধ্যে গ্রামকে স্থান দেয়া হয়েছে। নাগরিক সব সুযোগ-সুবিধা এবং নাগরিক অধিকার গ্রামেও নিশ্চিত করা হবে। শিগগিরই দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে, যেখানে বর্তমানে ৬০ শতাংশ গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে সব গ্রামকে জেলা-উপজেলা শহরের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। কর্মসংস্থানের জন্য জেলা-উপজেলায় কল-কারখানা গড়ে তোলা হবে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, শহরের মানুষের খাদ্য সরবরাহ করে থাকেন গ্রামের কৃষক। কৃষক বাঁচলে দেশ বাচবে, কৃষককে বাঁচাতে হলে কৃষিপণ্যের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে হবে, এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার খাত হচ্ছে আধুনিক ও বাণিজ্যিক কৃষি, সে লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছে সরকার। উন্নত বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে কৃষিকে অবশ্যই বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর করে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক-বিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মোছাম্মৎ নাজমানারা খানুম। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ইফপ্রির প্রতিনিধি ড. আকতার আহমেদ। আলোচক হিসেবে ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সাত্তার মন্ডল।

পাঠকের মন্তব্য