‘হালুয়া-রুটি’র ভাগ সকলের ভাগ্যে সমবন্টন হোক

‘হালুয়া-রুটি’র ভাগ সকলের ভাগ্যে সমবন্টন হোক

‘হালুয়া-রুটি’র ভাগ সকলের ভাগ্যে সমবন্টন হোক

কামাল পাশা চৌধুরী : শব ই বরাত বা শবে বরাত, যাই বলুন, ছোট বেলা থেকেই এর একটা বিশেষ আকর্ষণ ছিল। তখন থেকেই জেনে এসেছি এই রাতে মানুষের বরাত খুলে যায়।আমাদের তখন রাতে বাইরে বের হওয়ার বয়স হয়নি। কিন্তু এই রাতে রাতভর ছিল অবারিত দরোজা। নামাজের উছিলায় বন্ধুরা মিলিত হতাম এক জায়গায়। তার পর বরাতে অনেক কিছুই জুটতো। বিশেষ করে সেই মৌসুমের নানা রকম কাঁচা-পাকা ফল। আম আমড়া কামরাঙ্গা জাম্বুরা ডাব-নারিকেল, কত কি ।সৌভাগ্যের রাত তো।

একবার শবে বরাতে আমার ফুফু এক ডেগচি মুরগির মাংস আর চালের রুটি বানিয়ে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন সে গুলো মসজিদে পৌঁছে দেয়ার। বন্ধুরা মিলে চললাম এই তবারক নিয়ে। রাস্তায় এক বিজ্ঞ বন্ধু বললো, আচ্ছা, সবাই বলে শিশুরা নাকি ফেরেস্তা, আমরা এখন শিশুদের চেয়ে বেশ বড়, সুতরাং সে বিচারে আমরা সিনিয়র ফেরেস্তা।তাই এই গোস্ত-রুটি মসজিদে না দিয়ে একটু কষ্ট করে আমরা খেয়ে নিলে ফুফুর অধিক ছোওয়াব নিশ্চিত করা যায়।অন্য বন্ধুরাও এই প্রস্তাবে তাদের জ্ঞানগর্ভ সম্মতি জ্ঞাপন করলো।অতপর আমরা ফুফুর কল্যানার্থে এই কষ্টটুকু স্বীকার করলাম এবং আহারাদি শেষে ডেগচি দু’টি কলের পানিতে ভালভাবে ধুয়ে ফিরিয়ে দিয়ে আসলাম।ফুফু ভিষণ খুশি। তিনি বললেন,আজ নামাজ শেষে মোনাজাতে আমদের জন্য প্রাণ খুলে দোয়া করবেন।এমন সুপক্ক মাংস-রুটি ভোজনের তৃপ্তি সাথে ফুফুর দোয়া, এমন ‘বুলন্দ নসীব’ শবে বরাত ছাড়া কি সচরাচর জুটে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার হল ছিল স্যার এ এফ রহমানের এক্সটেনশন বিল্ডিং, নিউমার্কেটের পিছনে।সামনেই আজিমপুর কবরস্থান। শবে বরাত রাতে সন্ধ্যা থেকেই নীলক্ষেত থেকে কবরস্থানের উত্তর গেট পর্যন্ত বসতো ভিক্ষুকের লাইন।একবার গুনেছিলাম, রাত বারোটার দিকে ছিল সাড়ে বারোশ’।বারোটার পরে শহরের অন্য এলাকার ভিক্ষুকও এসে যোগ দেয়। সব মিলে এই রাতে এখানে দেড় দুই হাজার ভিক্ষুক সমবেত হয়। শবে বরাতকে উপলক্ষ করে বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ আসে এখানে ভিক্ষা করতে। সে সময় প্রায়ই গভীর রাতে ঘুরে ঘুরে তাদের দেখতাম, কথা বলতাম। এই রাতে ঢাকার মুসলমানগণ নামাজ পড়া শেষ করে বা নামাজের আগে আজিমপুর গোরস্থানে যায় প্রয়াত স্বজনদের জন্য দোয়া করতে। দোয়া শেষে সবাই সাধ্যমত দান-খয়রাত করেন।প্রত্যেক ভিক্ষুক ৫থেকে ১৫ হাজার টাকার মত আয় করেন এই এক রাতে (এটা ১৯৮০-৮৫-৮৬সালের দিকের হিসাব)।

তাই দেখা যায় শবে বরাত অনেকের বরাতেই কিছু যোগ করে।নানা রকম পায়েস মিষ্টি হালুয়া রুটিতে বাড়ির শিশুরা উল্লসিত হয়। প্রতিবেশি খুশি হয় আপ্যায়নে। দোকানির ব্যবসা ভাল হয়। আটা, ময়দা, বেসন, বুটের ডাল, গুড়, চিনি, আগর, মোমবাতি বিক্রী হয় দেদার।

পুরান ঢাকার বেকারী গুলি বানায় নানা রকম বিশাল আকৃতির পাউরুটি।কুমীর কচ্চপ এসব নানা প্রাণির আকৃতির রুটিও তৈরী হয়।শিশু-কিশোর মেতে উঠে আতশবাজি খেলায়। এর মাঝে বেশি জনপ্রিয় ‘মরিচ বাতি’র যুদ্ধ।এই ছোট্ট আতশ কাঠিটি আগুন দিয়ে ছেড়ে দিলে আগুনের ফুলকি ছড়াতে ছড়াতে উন্মাদের মত লাফাতে থাকে, অনেকের গায়ে গিয়েও পড়ে এই বাতি।তখনই সেটা হয় ভিষন আনন্দের খোরাক।এই মরিচ বাতির লাফানোর পিছনে কাজ করে মাথায় লাগানো একটা জৈবিক স্প্রীং। এই স্প্রীংটি বানানো গয় গরুর চিকন নাড়ি শুকিয়ে।তাই বালকের দল একমাস আগে থেকেই কশাইয়ের দোকানে লাইন ধরে গরুর উপযুক্ত নাড়িটি সংগ্রহের জন্য।
যাই হোক, 

ধর্মবেত্তারা নাকি আজ শবে বরাত নিয়ে বিতর্কে মেতেছেন।তাঁরা মেতে থাকুন বিতর্কে। শবে বরাত তাদের বরাতে আরও বিতর্ক নাজেল করুক।আমি লিখতে বসে আমার স্ত্রীর বানানো উত্তম বুটের হালুয়া থেকে খাঁটি ঘি-এর খুশবাই পাচ্ছি। আসুন আমরা শবে বরাতে নিশ্চিন্তে হালুয়া-রুটি খাই। আর প্রার্থনা করি ‘জাতীয় হালুয়া-রুটি’র ভাগ সকলের ভাগ্যে সমবন্টন হোক।

ফেসবুক স্ট্যাটাস লিংক : কামাল পাশা চৌধুরী 

পাঠকের মন্তব্য