যেভাবে শ্রীলঙ্কায় আত্মঘাতী বিস্ফোরণ চালায় এক হামলাকারী

শ্রীলঙ্কায় ব্রেকফাস্টের লাইনে দাঁড়িয়ে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ

শ্রীলঙ্কায় ব্রেকফাস্টের লাইনে দাঁড়িয়ে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ

সিন্নামোন গ্র্যান্ড। কলম্বোয় বিদেশি পর্যটকদের পছন্দের আন্তানা এই বিলাসবহুল পাঁচতারা হোটেল। ঘড়ির কাঁটা সকাল সাড়ে আটটা পেরিয়েছে। ভিড়ে ঠাসা হোটেলের রেস্তরাঁ। ব্রেকফাস্টের জন্য ততক্ষণে লম্বা লাইন পড়ে গিয়েছে। তার মধ্যে ইতিউতি চলছে গল্পের আসর। হঠাৎ করেই বিস্ফোরণ। এক লহমায় ছারখার চারপাশ। হোটেলের এক ম্যানেজার জানিয়েছেন, ব্রেকফাস্টের লাইনে দাঁড়িয়ে আত্মঘাতী বিস্ফোরণ চালায় এক হামলাকারী। 

ভুয়ো ঠিকানা দিয়ে হোটেলে এসে উঠেছিল সে। জানিয়েছিল, ব্যবসার কাজে কলম্বো এসেছে। গতকাল রাতে হোটেলে চেক-ইন করেছিল। নাম জানিয়েছিল মহম্মদ আজম মহম্মদ। ব্রেকফাস্টের লাইনে খাবার নেওয়ার ঠিক আগে বিস্ফোরণ ঘটায় ওই হামলাকারী। সম্ভবত তার কোমরে বিস্ফোরক বাঁধা ছিল। এই আত্মঘাতী হামলাকারীর সঙ্গেই মৃত্যু হয় হোটেলের বহু অতিথির।

হামলার ছক থেকে থেকে স্পষ্ট বেছে বেছে নিশানা বানানো হয়েছে বিদেশি পর্যটকদের পছন্দের হোটেলগুলিকে। কলম্বোর সেন্ট অ্যান্টনি’স চার্চেও সারা বছর বিদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। সরকারি সূত্রে খবর, রবিবারের ধারাবাহিক বিস্ফোরণে অন্তত ৩৫ জন বিদেশি পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশ পর্যটকই আমেরিকা, ব্রিটেন ও নেদারল্যান্ডসের নাগরিক। নিহতের তালিকায় রয়েছেন দুই চীনা নাগরিকও। শ্রীলঙ্কার মন্ত্রী হর্ষ ডি সিলভার বক্তব্য, হতাহতের তালিকায় রয়েছেন বহু বিদেশি।

ইস্টার সানডের প্রার্থনায় স্থানীয়দের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকরাও ভিড় করেছিলেন চার্চগুলিতে। একের পর এক বিস্ফোরণে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই কলম্বো ন্যাশনাল হাসপাতাল চত্বরে যেন মৃত্যুর মিছল শুরু হয়ে যায়। ক্রমাগত অ্যাম্বুলেন্সের আনাগোনা। রক্তান্ত মানুষের ভিড়। স্বজনহারা মানুষের কান্নায় ভেসে যেতে শুরু করে চারপাশ। হাসপাতালের মুখপাত্র ডাঃ সামিন্দি সামারাকুন বলেন, ৩০০ জনের বেশি মানুষকে ভর্তি করা হয়েছে। শুধুমাত্র এই হাসপাতালেই ন’জন বিদেশির মৃত্যু হয়েছে। এরপর নিগোম্বো ও বাত্তিকালোয়া থেকেও মৃত্যুর খবর আসতে শুরু করে। প্রতি মুহূর্তে লাফিয়ে বাড়তে থাকে মৃতদের সংখ্যাটা। পাশাপাশি ট্যুর অপারেটরদের আশঙ্কা, যেভাবে বিদেশি নাগরিকদের নিশানা বানানো হয়েছে তাতে শ্রীলঙ্কার পর্যটন ক্ষেত্র বড় ধাক্কা খেতে চলেছে।

শ্রীলঙ্কার সংবাদমাধ্যমগুলির খবর, নেগোম্বো হাসপাতাল থেকে অন্তত ৭৪ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। এখানে সেবাস্তিয়ান’স চার্চে বিস্ফোরণের পর আক্রান্ত বহু মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। গুরুতর জখম বহু মানুষ। হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ১১৩ জন। ফাদার এডমন্ড তিলকরত্নে বলেন, প্রার্থনা শেষ হওয়ার ঠিক পরেই বিস্ফোরণ ঘটে। তিনি অন্তত ৩০টি দেহ চার্চের আশপাশে পড়ে থাকতে দেখেছেন। প্রার্থনার সময় চার্চে ছিলেন অন্তত হাজার খানেক মানুষ। 

একই অবস্থা কলম্বোর অ্যান্টনি’স চার্চেও। ভেঙে পড়েছে চার্চের ছাদ। কাচ, টালি ও কাঠের টুকরোয় ভরে গিয়েছে চারপাশ। চার্চের মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে নিথর দেহ। দলা পাকানো মাংসপিণ্ড ও রক্তের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে।

বিস্ফোরণের জেরে হাসপাতালগুলিতে রক্তাক্ত মানুষের ভিড় বাড়তে থাকায় বেলা থেকেই রক্তের প্রয়োজন তুঙ্গে ওঠে। এই অবস্থায় যাতে রক্তের জোগানে সমস্যা না হয়, সেজন্য এগিয়ে আসেন বহু স্থানীয় মানুষ। উদ্ধারের কাজেও ঝাঁপিয়ে পড়েন তাঁরা। কলম্বোর আর্চ বিশপ দাবি তুলেছেন, দোষীদের কঠোরতম শাস্তি দিতে হবে।

পাঠকের মন্তব্য