মাশরাফিকে নিয়ে যা লিখলেন সেই বরখাস্ত হওয়া ডাক্তার

মাশরাফিক

মাশরাফিক

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল) শেষে স্বল্প সময়ের ছুটি পেয়ে নিজের নির্বাচনী এলাকা নড়াইলে ছুটে যান সাংসদ মাশরাফি বিন মুর্তজা। তবে পরিবার নয়, নিজ এলাকার উন্নয়নকাজের তদারকিতে সেখানে যান তিনি। সেই তদারকিতে অগ্নিমূর্তি হয়ে আবির্ভূত হন বাংলাদেশ ওয়ানডে অধিনায়ক।

নড়াইল আধুনিক সদর হাসপাতালে ঝটিকা সফর করেন মাশরাফি। ওই সময় পুরো হাসপাতালে মাত্র একজন চিকিৎসকের উপস্থিতি দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। জানতে পারেন কয়েকজন চিকিৎসক বিনাছুটিতে বাইরে আছেন। পরে ফোন করে তাদের কাছে অনুপস্থিতির কারণ জানতে চান। পরে ওই হাসপাতালের চার চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়।

এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। মাশরাফির অনুরোধেই সেই চার চিকিৎসকের শাস্তি স্থগিত করা হয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন বরখাস্ত হওয়া চিকিৎসক শামছুল আলম। তার লেখাটি পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো :

মাশরাফি সাহেব যখন আমাকে ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, চুপ করে আছেন, কথা বলছেন না কেন ?

ফাইজলামি করছেন ? চুপ করেছিলাম কারণ আমি ভাবছিলাম, আমি হয়তো বলতে পারতাম ,আপনার হাসপাতালে রোগী অজ্ঞান করার কোন ডাক্তার নেই ,থাকলেও অপারেশন টেবিলের লাইট কাজ করে না, সেলাই করার জন্য সুতা পাওয়া যায় না ,কর্মচারীরা গোপনে সবকিছু বাইরে বিক্রি করে দেয় .কত কথা বলতে পারতাম কিন্তু না ,আমি কিছুই বলিনি।আমি আসলে ভাবছিলাম।

ভাবছিলাম মায়ের কথা, রোগীর লোকজনও দুর্ব্যবহার করলে আমি মায়ের কথাই ভাবি কারণ আমার মা চেয়েছিলেন আমি ডাক্তার হই,বড় হয়ে সার্জন হই। আমি যখন অনেক ছোট, সে সময়, মায়ের গলায় থাইরয়েড ক্যানসার হয়েছিল, এলাকার ডাক্তার বলেছিলেন ,মা আর বেশিদিন বাঁচবেন না, ভালো মন্দ যা খেতে চায় কিনে দিতে। কিন্তু বাবা আমার হাল ছেড়ে দেন নি। জায়গা -জমি বিক্রি করে, মাকে নিয়ে গেলেন ঢাকা শহরের বড় সার্জন দেখাতে। মায়ের অপারেশন হলো, মা বেঁচে গেলেন। আল্লাহ আমাদের মাকে আরো কিছুদিনের জন্য ফিরিয়ে দিলেন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে মায়ের এক কথা, আমাকে বড় হয়ে ডাক্তার হতে হবে, বড় সার্জন হতে হবে।

তারপর শুরু হলো আমার জীবন যুদ্ধ ,পাড়ার ছেলেরা যখন ফুটবল-ক্রিকেট নিয়ে ব্যস্ত সেই সময়ে আমি মন ভরে খেলতে পারিনি, আমার জীবন অন্য জীবন। অবশেষে একদিন ডাক্তারি পড়তে ভর্তি হলাম। এনাটমি ফাইনাল পরীক্ষায় সঠিক করে মূত্রনালির রক্ত চলাচল বলতে পারিনি বলে ফেল করলাম। জীবনে আমার প্রথম সাপ্লি, সবকিছু আবার শুরু থেকে পড়ো, সে কি কষ্ট, যে জানে শুধু সেই বুঝবে কিন্তু আমি হাল ছেড়ে দেইনি।

একদিন ডাক্তারি পাশ করলাম, ট্রেনিং শেষ করলাম, এফ সি পি এস পাশ করে সার্জন হলাম। এই পর্যন্ত আসতে আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে ,আমার জীবন থেকে চলে গিয়েছে দীর্ঘ পনের বছর। এফসিপিএস প্রথম পর্ব পরীক্ষার সময় আমার বড় মেয়ের জন্ম হলো ,কিন্তু আমি পাশে থাকতে পারিনি। দ্বিতীয় পর্বের সময় বউ জন্ডিসে অসুস্থ হলো। বাচ্চা দুইটা অসুস্থ মাকে সব সময় বিছানায় দেখে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলো। সারাক্ষণ বাবার পথ চেয়ে বসে থাকতো কিন্তু আমার সময় ছিল না।

আমাদের আবেগকে অনেক সময় বিসর্জন দিতে হয়। চুপ করে থাকতে হয়। সার্জারি ট্রেনিং এর সময় একদিন একটা অপারেশন করার সময় হঠাৎ আমার ছুরিটা একটু ঘুরে গিয়ে রোগীর একটা রক্তনালী কেটে গিয়েছিলো ,তাই দেখে আমার স্যার প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলেন,আমার হাতে একটা যন্ত্র দিয়ে আঘাত করে বলেছিলেন, ছাগল কোথাকার ,এইভাবে কেউ ছুরি ঘুরায়? আর একটু হলেতো রোগিই মারা যেত।

 
তারপর অপারেশন শেষে স্যার আমাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন, কিরে! বকা দিয়েছি বলে মন খারাপ করেছিস? আমি চুপ করে ছিলাম, কি করবো, চুপ করে থাকাই আমার স্বভাব। তারপর স্যার বললেন, তবে যেভাবে তুই মাথা ঠান্ডা রেখে আর্টারি ফোরসেফ দিয়ে ব্লিডিংটা বন্ধ করলি, সেটা দেখার মত ছিল, ব্রাভো মাই সন।


সেদিন আমি জেনেছিলাম ,কথায় কেউ বড় হয়না ,মানুষ বড় হয় কাজে। এমপি সাহেব, আপনি রাগ করে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনাকে আমি কি করবো? আমার জন্য আপনাকে কিছুই করতে হবে না, আল্লাহ চাইলে আমাকেও আপনার মত একটা ছোট বলের পিছনে দৌড়ে জীবনটা শেষ করতে হতো কিন্তু সেটা তিনি চান নি। তিনি চাইলে আমিও মানুষের রাজা হতাম ,মনিব হতাম ,চার পাশে হাজারো ক্রীতদাস নিয়ে ঘুরতাম কিন্তু আমার মা,আল্লাহর কাছে সেটা চায় নি। আমিও আপনার মত খেলি তবে মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ে খেলা। এই খেলায় হতাশার কোন সুযোগ নেই, এখানে হার-জিত বলে কিছু নেই। এখানে পুরোটাই শুধু পুন্য, এই কারণেই আমাদের পথ কখনো শেষ হয় না। একটা কথা বলে রাখি আপনি, আমার কিংবা আমাদের ভাগ্য পরিবর্তন করেন না কারণ মানুষ তার নিজের গল্প শুধু নিজেই লিখে না।

পাঠকের মন্তব্য