ক্যান্সার জয়ী সাহসী উদ্যোক্তা সুমনার গল্প

ক্যান্সার জয়ী সাহসী উদ্যোক্তা সুমনার গল্প

ক্যান্সার জয়ী সাহসী উদ্যোক্তা সুমনার গল্প

পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে। এক ধরনের মানুষ নিজের নিয়তিকে মেনে নিয়ে যা আছে তাতেই হা হুতাশ করে। আরেক ধরনের মানুষ সংকল্প করে নিজের নিয়তিকে জয় করার। অদম্য স্পৃহা নিয়ে ছুটে সংকল্পের পেছনে। অতীত তখন হার মানে। ভবিষ্যত তাকে বানায় উদাহরণ। সুমনা তেমনি একজন। যিনি নিজের শরীরে ক্যান্সারের মত ঘাতক ব্যাধি নিয়েও শুন্য থেকে উঠে এসেছেন। উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে সফল করেছেন। অনেকের জন্য তৈরি করেছেন কর্মসংস্থান।

রোকেয়া পারভীন সুমনা। দেশে নিজ উদ্যোগে যারা পাটজাত পণ্য প্রস্তুত করছেন তাদের একজন। রাজধানীর শেখেরটেক এলাকায় রয়েছে সুমনা`র বৈচিত্র্য নামের পাট ও চামড়াজাত পন্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। যেখানে সার্বক্ষণিক কাজ করছেন বিয়াল্লিশ জন কর্মী। তবে এ প্রতিষ্ঠানে ভাসমান কর্মীর সংখ্যা অনেক বেশী। মূলত কাজের ধরন অনুযায়ী এখানে কর্মীর সংখ্যা বাড়ে কমে।

বৈচিত্র্যের স্বত্ত্বাধিকারী সুমনা`র জীবনের গল্পটা মোটেও সহজ ছিল না। তাকে প্রতিনিয়ত লড়াই করে করে করে এ পর্যায়ে আসতে হয়েছে। শুধু প্ররিশ্রমই তার সঙ্গী ছিল না, বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নানা অপমান, লাঞ্ছনা তাকে সইতে হয়েছে নিয়মিত। তবে সুমনাকে সবচেয়ে বেশী লড়াইটা করতে হয়েছে ক্যান্সারের সাথে। এখনো সুমনা লড়াই করছেন। একদিকে ক্যান্সার অন্যদিকে তার উদ্যোগ।

সুমনা`র জন্ম সাংস্কৃতিক পরিবারে। বাবা লুৎফুল বারী ( প্রয়াত) ছবি আঁকতেন। বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়েকে চারুকলায় পড়াবেন। কিন্তু সুমনা`র সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। মাত্র ক্লাস সেভেনে পড়া অবস্থায় ( ২০০২ সালে) তার বাবা মারা যান। সংসার সম্পর্কে খানিকটা উদাসীন বাবা মারা যাওয়ার সময় ছেলে মেয়েদের চোখে কিছু স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই রেখে যেতে পারেন নি। সুমনা`র ভাষায়, "বাবা মারা যাওয়ার পরআমরা চার ভাই বোন অথৈ সাগরে পড়লাম। আমার মাও সেই সাগরে ভাসেন। আমরা সেই সাগরে ভাসি"। সুমনা আরো বলেন, " অভাব কাকে বলে জীবন তখন আমাদেরকে তা হাড়ে হাড়ে শিখিয়েছে"।

নানা প্রতিকূল অবস্থার কারণে এসএসসি পাস করার আগেই ( ২০০৫ সাল) বিয়ে হয়ে যায় সুমনা`র। বর মাকসুদুর রহমান মহিম তখন একটি সাধারন চাকরি করেন। খুব অল্প বয়সে নানা প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে লড়াই করতে করতে সংসার শুরু করেন তারা। এ সময় সুমনা একটি সিদ্ধান্ত নেন। পড়াশুনা করতে হবে। তার বরও তাকে উৎসাহ দেয়। সুমনা`র ভাষায়, "আমি বুঝতে পারি সমাজে মানুষের মতো বাঁচতে হলে পড়াশুনা লাগবে। এর কোন বিকল্প নেই।

সুমনা ভর্তি হলেন উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে এসএসসি, সরকারী বাংলা কলেজ থেকে এইচএসসি,আবুজর গিফারী কলেজ থেকে সম্মান অনার্স সম্পন্ন করেন। এই সময় সুমনা প্রচুর টিউশনি করতেন। সুমনা`র ভাষায়, "আমার খরচ চালানোর মতো সামর্থ্য আমার বরের ছিল। কিন্তু সবসময় তার কাছে চাইতে আমার আত্মসম্মানে লাগত। কেন মানুষ অন্যের মুখাপেক্ষী হবে? তাহলে স্বকীয়তা থাকল কোথায়?"
 
এরপরপরই কারিগরী শিক্ষাবোর্ডের অধীনে ইন্টেরিয়র ডিজাইনের উপর চার বছরের একটি ডিপ্লোমা ডিগ্রী নেন সুমনা। তখন ২০১১ সাল। ২০১২ সালের দিকে যোগদিলেন রাজধানীর একটি ইন্টেরিয়র ডিজাইন ফার্মে। এরমধ্যে কোলে এল সন্তান। সব ভালই চলছিল।

কিন্তু জীবনের গল্প সবসময় মসৃন হয় না। কখনো কখনো ঝড় আসে। সেই ঝড়ে কেউ কেউ লাগাম ধরতে পারে। আবার কেউ কেউ লাগাম ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। সুমনা`র জীবনেও ঝড় এলো। তার থাইরয়েড ক্যান্সার ধরা পড়ল। আসুন, সুমনা`র নিজের মুখেই আমরা সে ঘটনা শুনি।

আমাদের কোল জুড়ে সন্তান আসার কিছুদিন পরেই শরীরে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। আমার ওজন হঠাৎ বেড়ে যেতে থাকে।আগেআমার ওজন ছিল পঞ্চান্ন। তা বেড়ে হয়ে যায় বাহাত্তর। আমার হার্ট খুব দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। অল্পতেই ধড়পড় করত। মনে হতো ভেতরে ভেতরে আমার শরীরটা ভেঙ্গেচুড়ে যাচ্ছে। এরমধ্যেআবার ওজন কমে পঞ্চাশ হয়ে যায়। রাতে জ্বর থাকত। সারা রাত ঘুম হতো না। প্রায় রাত জেগে থাকতাম। একদিনআমি জ্ঞান হারালাম। এরপর যোগাযোগ করি ডাক্তারের সাথে। ডাক্তার কিছু টেস্ট দিলেন। সেই টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে দেখালামআমার চাচীকে। না বললেই নয়,আমার চাচা চাচী দু`জনেই ডাক্তার।আমার চাচী বললেন, তুমি একটা ক্যান্সার টেস্ট কর থাইরয়েডের উপর। এটা পিজি হাসপাতালে ( বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) কর।

তার কথা মতো আমি ক্যান্সার রেডিয়েন্ট টেস্ট করি। সেই রিপোর্ট পাওয়ার পর আমার চাচীর পরামর্শ অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্সার ডিপার্টমেন্টের থাইরয়েড বিভাগের হেড অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন- এর শরণাপন্ন হই।"

ঘাতকব্যাধি ক্যান্সার এর নাম শুনলে ভয় পায় না এমন কেউ নেই। কিন্তু সুমনা যখন জানল তার শরীরে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে তখন তার কেমন লেগেছিল?আমরা সে অভিজ্ঞতার বর্ণনা শুনব স্বয়ং সুমনা`র মুখে।

"আমি যখন রিপোর্ট আনতে যাই আমাকে জিজ্ঞেশ করা হলো আমার ফ্যামিলিতে কীআর কেউ নেই? আমি নিজে কেন রিপোর্ট আনতে গেলাম।আমি বললাম, নিজের সবকাজ তোআমি নিজেই করি। তাই রিপোর্ট নিতেও আমি এসেছি। আমার রিপোর্ট দেখে ডাক্তার বললেন, তুমি আরো কয়েকটা টেস্ট কর। এরপর তোমার ফ্যামিলির অন্য কোন সদস্য নিয়ে আস। তোমার রিপোর্টে সমস্যাআছে।

কিন্তু পরে রিপোর্ট নিয়েআমি নিজেই যাই।আমার বর এমনিতেই মেডিকেল বা ডাক্তার সংক্রান্ত বিষয়গুলো ভয় পায়।আমি তার কাছে বাচ্চাকে রেখে গেলাম।

ডাক্তার সব শুনে বললেন, তোমাকে ট্রিটমেন্টে ফেলতে হবে। তোমার শরীরের এখন যে অবস্থা তোমাকে এখন ট্রিটমেন্ট দেওয়া শুরু না করলে পরে সমস্যা হবে। এরপরআমাকে ডাক্তারদের সাথে বসানো হয়। বসিয়েআমার এ টু জেড ডাটা নেওয়া হয়। যে টেস্টটা করেছিলাম সে সংক্রান্ত কোন একটা রেডিয়েন্টআমার শরীরে পুশ করা হয়। তখনআমি এতোটা অসুস্থ ছিলাম নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছিলাম না। তখন বাসায় ফোন করি। একজন গিয়েআমাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়েআসে। সেদিন থেকেআমি পুরোপুরি বিছানায় পড়ে গেলাম।"

একুশে টেলিভিশন অনলাইনের সাথে আলাপ কালে স্মৃতিকাতর সুমনা বলতে থাকেন, " তারপর থেকে আমার প্রচুর জ্বর হতো। কখনো ১০৪ ডিগ্রী, কখনো ১০৫ ডিগ্রী। কোন অবস্থায় বিছানা থেকে উঠতে পারতাম না। প্রচুর ব্যাথা হতো। ব্যাথার ধরণও ছিল আলাদা। শরীরের কোন না কোন অংশে ( শুধু নির্দিষ্ট একটি জায়গায়) প্রচুর ব্যাথা হতো। সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমি এমনিতে খুব শক্ত মানুষ। কিন্তু সেই ব্যাথা সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিল না। "
 
কথা বলতে বলতে হাঁপিয়ে উঠেন সুমনা। বিরতি দিয়ে শুরু করেন, " তারপর এক নিরন্তর লড়াই। ডাক্তার, হাসপাতাল, বাসা। বাসা, হাসপাতাল, ডাক্তার। ওষুধ, টেস্ট, রিপোর্ট। রিপোর্ট, টেস্ট, ওষুধ। এই চক্রে বন্দী হয়ে যায় জীবন। এভাবে টানা দেড় বছর থেকে দু`বছর।আমাকে প্রচুর ধৈর্য্যের পরিচয় দিতে হয়েছে।আমি এমনিতে ছোটবেলা থেকে পোড় খাওয়া মেয়ে। কিন্তু এ সময় সংগ্রামআমার কাছে নতুন রূপে ধরা দেয়। "

সুমনা বলেন, "আমার বাবা ছিলনা বিধায় মাআমাদের নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েছিলেন।আমি বুঝতে পারছিলামআমি মরে গেলেআমার সন্তানের জন্য পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে যাবে। সন্তানের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিই,আমাকে বাঁচতে হবে। লড়াইয়ে জিততে হবে।

সব খারাপ দিকের বিপরীত দিকে একটা ভাল দিকআছে। সুমনা`র ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। ক্যান্সারের সাথে সুমনা যখন লড়াই করছিলেন তখন রাত জাগতেন। রাতের পর রাত ঘুম হতোনা। সময় দিতেন কম্পিউটারে। তখনই ভারতীয় একটি অনলাইন মার্কেট প্লেসেরআদলে নিজে একটি পেজ খোলেন। নাম দেন প্রজাপতি বুটিকস। অনেকটা শখের বশে খোলা। বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটগুলো তখনো এদেশে ব্যবসা করছে। তবেআজকের মতো এতোটা জনপ্রিয় না।

ক্যান্সারের সাথে লড়াই করতে করতে নিজের পেজে মেয়েদের পোশাক সহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রী শুরু করেন। আমেরিকায় বসবাস করেন এমন কয়েকজন বাঙ্গালীর কাছ থেকে নানা ধরনের অর্ডার পান। লাভ হতে থাকে। ব্যবসায়ে উৎসাহ বাড়ে।

সুমনা নিজে নিজে উপলব্ধি করেন তাকে সুস্থ হতে হলে কাজের মাঝে থাকতে হবে। সেই চিন্তা থেকে ২০১৪ সালে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে ড্রেস মেকিং, ব্লক, বাটিক, ডায়িং- এর উপর একটি প্রশিক্ষণ নেন।এর পরপরই এসএমই ফাউন্ডেশনে সাত দিনের একটি চামড়াজাত দ্রব্য উৎপাদনের কোর্স করেন। একই সময়ে তিনি জেডিপিসিতে পনের দিনের কোর্স করেন। সর্বোপরি এসএমই ফাউন্ডেশনে ফ্যাশন ডিজাইনের উপর এক বছরের একটি কোর্স করেন।

একদিকে ক্যান্সারের সাথে লড়াই। অন্যদিকে প্রশিক্ষণ। নিজেকে পরিপূর্ণ করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। নিজের বাসায় মাত্র দুটি সেলাই মেশিন নিয়ে শুরু। একটি সেলাই মেশিন তার নিজের। অন্যটি তার স্বামীর বড় বোনের। পুরনো, অব্যবহৃত চামড়া ও পাট কিনে পন্য উৎপাদন শুরু করলেন। প্রথমে একটি, তারপর দুটি। বর্তমানে সুমনা`র প্রতিষ্ঠিত `বৈচিত্র্য` নামের প্রতিষ্ঠানটিতে নানা ধরনের সত্তরটিরও বেশী পন্য উৎপাদিত হয়।

না, সুমনা`র উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পটি এত সহজ নয়। সুমনা`র ভাষায়, "পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন মেয়েকে নানা রকম লড়াই করতে হয়।আমি বংশালে কাঁচামাল কিনতে গিয়েছিলাম প্রথমবার। অনেক দোকানদার আমার দিকে এমন ভাবে তাকাচ্ছিল,যেন ওরা কখনো মেয়ে দেখেনি। সব জায়গায় কোন না কোন ভাবে বিব্রত করার জন্য অনেকে উঁৎপেতে বসে থাকে। একটা মেয়েকে সেসব মোকাবেলা করেই এগিয়ে যেতে হয়।

সুমনা মনে করেন, যুগ যুগ ধরে এদেশে অধিকাংশ নারী কখনো বাবার পরিচয়ে, কখনো স্বামীর পরিচয়ে বেঁচেছে। নারীকে নিজের পরিচয়ে বাঁচা উচিত। সেজন্যআত্মনির্ভরশীল হওয়ার বিকল্প নেই।

পাঠকের মন্তব্য