উন্নয়নে বৈষম্য : ১ শতাংশও পাচ্ছে না রংপুর বিভাগ

দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপ্রবণ অঞ্চল রংপুর

দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপ্রবণ অঞ্চল রংপুর

দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপ্রবণ অঞ্চল রংপুর। সবচেয়ে দারিদ্র্যপ্রবণ ১০ জেলার পাঁচটিই রংপুর বিভাগে। এ কারণে উন্নয়ন পরিকল্পনায় এ অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেয়ার দাবি দীর্ঘদিনের। যদিও এর প্রতিফলন সেভাবে নেই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি)।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদন বলছে, এখনো এডিপি বরাদ্দের মাত্র শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ মিলছে রংপুরের বিভাগে। এডিপিভুক্ত মোট প্রকল্পের মাত্র ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ গেছে এই বিভাগে।

বর্তমানে এডিপিতে মোট প্রকল্পের সংখ্যা ১ হাজার ৯৭৮টি। এর মধ্যে মূল প্রকল্প ১ হাজার ৯১৬টি, উপপ্রকল্প ৫৩টি এবং উন্নয়ন সহায়তা থোক প্রকল্প নয়টি। এর মধ্যে রংপুর বিভাগের জন্য প্রকল্প ছিল মাত্র ৪৭টি। অর্থাৎ এডিপিভুক্ত মোট প্রকল্পের মাত্র ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ প্রকল্প গেছে রংপুর বিভাগে। এর বাইরে বেশকিছু প্রকল্প আছে যেগুলোর কাজ দেশের অন্যান্য স্থানের পাশাপাশি এ বিভাগেও চলমান রয়েছে।

প্রকল্প সংখ্যার দিক থেকে ২ শতাংশের কিছু বেশি মিললেও এডিপিতে অর্থ বরাদ্দের দিক থেকে প্রাপ্তির খাতায় আরো পিছিয়ে রয়েছে দেশের সবচেয়ে উত্তরের এ বিভাগ। চলতি অর্থবছর দেশের এডিপিতে মোট বরাদ্দ ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে রংপুর বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ১ হাজার ৭২৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট এডিবি বরাদ্দের মাত্র শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ বরাদ্দ পাচ্ছে বিভাগটি।

এদিকে বরাদ্দে পিছিয়ে থাকলেও এডিপি বাস্তবায়নে সারা দেশের তুলনায় এগিয়ে আছে রংপুর বিভাগ। চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৪৭ দশমিক ২২ শতাংশ হলেও রংপুর বিভাগে এ হার ছিল ৫২ দশমিক ২৮ শতাংশ ।

রংপুর বিভাগের ৪৭টি প্রকল্পের বিপরীতে মোট অনুমোদিত ব্যয় ১২ হাজার ৩৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যা আগামী কয়েক বছরে ব্যয় করতে হবে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ১ হাজার ৭২৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৯০১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

উন্নয়ন বরাদ্দে রংপুর বিভাগ বৈষম্যের শিকার হচ্ছে কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, উন্নয়ন বরাদ্দে জাতীয় গড়ের তুলনায় উত্তরবঙ্গ কিছুটা পিছিয়ে আছে এটা সত্য। এতে লুকানোর কিছু নেই। বরাদ্দের ক্ষেত্রে আমাদের কোনো দুর্বলতা আছে কিনা, সেটা দেখা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে সরকারের নজর আছে। আগামীতে এ অঞ্চলে উন্নয়ন বরাদ্দ আরো বাড়বে। এরই মধ্যে এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা ‘মঙ্গা’ দূর করা হয়েছে। সেখানে কৃষিভিত্তিক, বিশেষ করে ধান-চাল ও ভুট্টাভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার বিষয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ অঞ্চলের মানুষের শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন (এসইজেড) গড়ে তোলার বিষয়ে কাজ করা হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা জরিপের তথ্যমতে, ২০১৬ সালে দেশে শীর্ষ ১০টি জেলার পাঁচটিই রয়েছে রংপুর বিভাগে। এ বিভাগের কুড়িগ্রামে ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ পরিবার দরিদ্র। এছাড়া দিনাজপুরে ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ, গাইবান্ধায় ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ, রংপুরে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং লালমনিরহাট জেলায় ৪২ শতাংশ পরিবার দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত।

কুড়িগ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোস্তাফা তোফায়েল বলেন, বিভিন্ন সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ও দায়িত্বশীলরা এসে আমাদের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু কয়েক দশক ধরে তাদের কোনো প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে এখন সব ধরনের প্রতিশ্রুতিকেই আমাদের কাছে সান্ত্বনাবাণী মনে হয়। আমাদের অঞ্চলের মানুষের কাছে উন্নয়নের গল্প এখন কেবল কথার কথা। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন অসম্ভব। কিন্তু সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের কারণে আমরা বরাবরই পিছিয়ে পড়ছি।

সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ক্রিটিক্যাল কনভারসেশনেও দেশে সমহারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে না বলে মত উঠে এসেছে। রংপুর অঞ্চল যে উন্নয়ন-বৈষম্যের সবচেয়ে বড় শিকার, এ বিষয়ে মোটামুটি একমত হয়েছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরাও।

তাদের মতে, উন্নয়নে বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকায় উন্নয়নের গতি ভালোভাবে হচ্ছে না। সব উন্নয়ন এখন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। পাকিস্তান আমলে ছিল ‘এক দেশ দুই অর্থনীতি’। আর স্বাধীন বাংলাদেশ আজ বিভক্ত সমৃদ্ধ ও পশ্চাত্পদ অঞ্চলে। ভৌগোলিকভাবে বলা হচ্ছে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল। পূর্বাঞ্চলের ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট বিভাগে দারিদ্র্য তুলনামূলক কম। আর পশ্চিমাঞ্চলের রংপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষেও রংপুর অঞ্চলে দারিদ্র্যের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি। ২০১৬ সালে এসে দেশ এগিয়ে গেলেও রংপুরের পিছিয়ে থাকার বাস্তবতা অপরিবর্তিত রয়েছে। যদিও বাংলাদেশের খাদ্যে পরনির্ভরতা দূর করার কাজে রংপুর বিভাগের অবদান অনস্বীকার্য। পোশাক কারখানায় কম পারিশ্রমিকে সবচেয়ে বেশি শ্রম বিনিয়োগও রংপুরের। তার পরও সব বঞ্চনা রংপুরের মানুষের জন্য। বাংলাদেশের একটি অঞ্চলের মানুষ যেহেতু বারবার পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে, সেহেতু সরকারের উচিত পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় রংপুরকে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ধরে নিয়ে এর উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা। তথ্যসুত্র- বণিক বার্তা

পাঠকের মন্তব্য