হাইকোর্টের কার্যতালিকায় চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা 

হাইকোর্টের কার্যতালিকায় চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা 

হাইকোর্টের কার্যতালিকায় চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা 

চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলায় বিচারিক আদালতের দেয়া রায়ের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য হাইকোর্টের কার্যতালিকায় এসেছে। বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি মো. এ এস এম আব্দুল মোবিনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের কার্যতালিকায় মামলাটি ১৪ নম্বর অবস্থানে আছে।

জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আদালতে দায়িত্ব পালনরত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি আটর্নি জেনারেল (ডিএজি) মনিরুজ্জামান (রুবেল) দৈনিক জাগরণকে বলেন, বর্তমানে তালিকার সামনের দিকে থাকা ডেথ রেফারেন্সের অন্য মামলার শুনানি চলছে। আশা করছি রমজানের পর ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানের মামলাটি শুনানির জন্য আদালতে উঠবে।

মামলাটির ডেথ রেফারেন্সের শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন গত ৩ মে নতুন এই বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেন। 

২০০৪ সালের ১ এপ্রিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে চট্টগ্রামের সিইউএফএল ঘাট থেকে আটক করা হয় ১০ ট্রাক অস্ত্র। দেশে ধরা পড়া অস্ত্র চোরাচালানের সবচেয়ে বড় ওই ঘটনার পর ১৫ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এই দেড় দশকেও মামলার নিষ্পত্তি হয়নি।

ঘটনার প্রায় এক দশক পর ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক এসএম মজিবুর রহমান ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায় ঘোষণা করেন। ওই ঘটনায় করা দুটি মামলার মধ্যে একটিতে ঘটনার সময়কার শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী (মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর), তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া এবং দুটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়। ওই বছরেরই ১৬ এপ্রিল মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েক আসামির আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে হাইকোর্ট। এরপর ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও শুনানিই শুরু হয়নি।  

সর্বশেষ গত ৮ জানুয়ারি চাঞ্চল্যকর এই মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনতে অপারগতা জানিয়েছে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চের এক বিচারক। বিচারিক আদালতে এ মামলার বিচারকাজে দায়িত্ব পালন করায় এই অপারগতা জানান বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ। ওই দিন বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লা সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানির জন্য উঠেছিল। তখন বেঞ্চের নেতৃত্ব দেয়া বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ বলেন, বিচারিক আদালতে কয়েকদিন মামলাটি শুনেছি বিধায় অপারগতা প্রকাশ করছি।

ওই দিন আদালত থেকে বের হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নির্মল কুমার দাস গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, এর আগে মামলাটিতে বিচারিক আদালতের বিচারক হিসেবে ভবানী প্রসাদ সিংহ কয়েকদিন বিচারকাজের দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি হাইকোর্টের বিচারপতি হন এবং এখন মামলাটি তার বেঞ্চে শুনানির জন্য ওঠে। তবে তিনি বিচারিক আদালতে মামলার বিচারকাজে নিয়োজিত ছিলেন বিধায় এখন অপারগতা জানিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী এটি প্রধান বিচারপতির দপ্তরে ফেরত যাবে। সেখান থেকে পরবর্তী বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেয়া হবে। এর আগে গত বছরের ২২ মার্চ মামলাটির শুনানির জন্য বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চকে এখতিয়ার দিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। পরে বেঞ্চ পুনর্গঠন হলে বিচারপতি মো. কামরুল হোসেন মোল্লা এই দ্বৈত বেঞ্চে অন্তর্ভুক্ত হন।
প্রসঙ্গত, ওই ঘটনায় দুটি মামলা করা হয়েছিল। এর মধ্যে বিচারিক আদালত থেকে দেয়া চোরাচালান মামলার রায়টি ছিল ২৬০ পৃষ্ঠার এবং অস্ত্র আটক মামলার রায়টি ছিল ২৫৪ পৃষ্ঠার।

চোরাচালানের মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ৫২ আসামির মধ্যে ১৪ জনকে এই সর্বোচ্চ সাজা দেয়া হয়। বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা এই মামলায় একইসঙ্গে এদের ৫ লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়। আর অস্ত্র আইনে করা মামলায় এই ১৪ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। এই মামলায় আসামি ছিলেন ৫০ জন।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল সিইউএফএল ঘাট থেকে আটক করা হয় ১০ ট্রাক ভর্তি অস্ত্রের চালান। এ নিয়ে কর্ণফুলী থানায় ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন ও ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে চোরাচালানের অভিযোগ এনে দুটি মামলা হয়। সিআইডি পুলিশ দুটি মামলা একসঙ্গে তদন্ত করে। এর বিচারও একসঙ্গে শুরু হয়।

বিচারিক আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলে, এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মামলা। এ মামলায় রাষ্ট্রের সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা সাক্ষ্য দিয়েছেন। এমনকী প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা পরিদপ্তরের (এনএসআই) কর্মকর্তারা সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ ধরনের ঘটনা বিশ্বের আর কোথাও ঘটেছে কি না সন্দেহ।

লুৎফুজ্জামান বাবর, মতিউর রহমান নিজামী ও পরেশ বড়ুয়া ছাড়া ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুর রহিম, পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) সাহাব উদ্দিন আহাম্মদ, উপপরিচালক মেজর (অব.) লিয়াকত হোসেন, এনএসআইয়ের মাঠ কর্মকর্তা আকবর হোসেন খান, সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহসিন উদ্দিন তালুকদার, মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কে এম এনামুল হক, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সচিব নুরুল আমিন, অস্ত্র বহনকারী ট্রলারের মালিক হাজি সোবহান, চোরাকারবারি হাফিজুর রহমান এবং অস্ত্র খালাসের জন্য শ্রমিক সরবরাহকারী দ্বীন মোহাম্মদ। এদের মধ্যে পরেশ বড়ুয়া ও নুরুল আমিন পলাতক।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের কথা শুনেও নীরব ছিলেন তৎকলীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) মহাপরিচালক সাদিক হাসান রুমী তাকে অস্ত্র আটকের তথ্য জানিয়েছিলেন।

বিচারক বলেন, এ অস্ত্র ও চোরাচালানের মামলা দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা পরিদপ্তরের (এনএসআই) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন। এসব কর্মকর্তা বিভিন্ন সময় তাদের জবানবন্দিতে এবং যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তারা একে অন্যকে জড়িয়ে যেসব তথ্য দিয়েছেন, তাতে এটা স্পষ্ট যে তাদের সঙ্গে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসামের (উলফা) যোগাযোগ ছিল। তারা এটা স্বীকারও করেছেন। এনএসআইয়ের তখনকার মহাপরিচালক (ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুর রহিম) তাদের সহায়তায় সস্ত্রীক দুবাইয়ে বেড়াতে গিয়েছিলেন বলে স্বীকার করেছেন।

এনএসআইয়ের উপপরিচালক মেজর লিয়াকত স্বীকার করেন, উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়া ও অনুপ চেটিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। তিনি এ বিষয়ে জবানবন্দিও দিয়েছিলেন। অস্ত্র আটকের সময় মেজর লিয়াকত নিজেকে আবুল হোসেন পরিচয় দিয়ে বাধা দিয়েছিলেন বলে স্বীকার করেছিলেন।

রায়ে বলা হয়, ডিজিএফআইয়ের তৎকলীন মহাপরিচালক সাদিক হাসান রুমী সাক্ষ্য দেয়ার সময় জানিয়েছিলেন, তিনি তখনকার প্রধানমন্ত্রীকে ঘটনাটি জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নীরবতা দেখিয়েছিলেন। এ ঘটনাও মামলায় এসেছে।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এ ঘটনা নিয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিলেন। কমিটিতে ৫ জন সদস্য ছিলেন, যাদের ৩ জনই এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তা মেজর জেনারেল ইমামুজ্জামানও সাক্ষ্য দিয়েছেন।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ওই সময় শিল্পমন্ত্রী ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। শিল্পসচিব ছিলেন শোয়েব আহমেদ। তিনি সাক্ষ্য দিতে এসে বলেছিলেন, বিসিআইসি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। তাই সিএফইউএল বিসিআইসির অধীন হওয়ার কারণে এর দায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের। ওই সময় বিসিআইসির চেয়ারম্যান ছিলেন ইমামুজ্জামান। শোয়েব আহমেদ তার সাক্ষ্যে বলেছিলেন, অস্ত্র আটকের ঘটনা তিনি নিজামীকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কোনো পদক্ষেপ না নিতে বলেছিলেন। এ ঘটনা সরকারের সবাই অবহিত আছেন বলেও তিনি (নিজামী) তাকে জানিয়েছিলেন।

আদালত বলেন, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর ঘটনার পর চট্টগ্রামে এসে অস্ত্র পরিদর্শন করেছেন, বৈঠক করেছেন, তদন্ত কমিটি করেছেন। এসব বিষয় এ মামলায় এসেছে। রায়ে বলা হয়, লুৎফুজ্জামান বাবর ও মতিউর রহমান নিজামী আদালতে বারবার বলেছিলেন, তাদের রাজনৈতিক কারণে হয়রানি করার জন্য এ মামলায় জড়ানো হচ্ছে। কিন্তু এ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে তাদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিতে দেখা যায়নি। যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা তাদের অধীন ছিলেন।

পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছে, সাক্ষীদের জবানবন্দির ভিত্তিতে এ মামলায় হাওয়া ভবনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুর রহিমের জন্য উইং কমান্ডার (অব.) সাহাবউদ্দিনের মাধ্যমে টাকা দেয় দুবাইয়ের এআরওয়াই গ্রুপ। এ গ্রুপের আবদুর রাজ্জাক ইউসুফের সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের যোগাযোগ ছিল।

অস্ত্র আটক ও চোরাচালান মামলায় ২০০৪ সালের ১১ জুন প্রথম দফা ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে সিআইডি। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ২৫ আগস্ট সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ মামলা দুটির অধিকতর তদন্ত শুরু হয়। তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ২৬ জুন নতুন করে বাবর, নিজামীসহ ১১ জনকে আসামি করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অস্ত্র আটক মামলায় ৫০ জন এবং চোরাচালান আইনে ৫২ জনকে আসামি করা হয়। ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। অস্ত্র আটক মামলায় ৫৬ এবং চোরাচালান আইনে ৫৩ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন।

পাঠকের মন্তব্য