শেষ ইচ্ছে পূরণ হলো না সুবীর নন্দীর, কি সেই শেষ ইচ্ছা ?

‘শেষ ইচ্ছে পূরণ হলো না সুবীর নন্দীর’

‘শেষ ইচ্ছে পূরণ হলো না সুবীর নন্দীর’

একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রয়াত কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দীর শেষ ইচ্ছে পূরণ হলো না। এমনটাই মনে করছেন হবিগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষ।

হবিগঞ্জে বসবাস করা এই শিল্পীর বন্ধু-স্বজনরা জানান, সুবীর নন্দীর শেষ ইচ্ছে ছিল মৃত্যুর পর যেন তার শেষকৃত্য হয় হবিগঞ্জে। কিন্তু মৃত্যুর পর তার পরিবারের সিদ্ধান্তে ঢাকার বরদেশ্বরী কালীমন্দির ও শ্মশানে শেষকৃত্য হওয়ার স্থান বেচে নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হবিগঞ্জের মানুষ।

প্রয়াত সুবীর নন্দীর বাল্যবন্ধু ও বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা রফিক বলেন, ‘সুবীর নন্দী পেশাগত কারণে ঢাকায় অবস্থান করলেও সুযোগ পেলেই হবিগঞ্জে চলে আসতো। হবিগঞ্জের একাধিক অনুষ্ঠানে সুবীর প্রকাশ্যে বলেছিলেন, শেষ ইচ্ছে হচ্ছে মৃত্যুর পর যেন আমাকে আমার মাটি হবিগঞ্জের শ্মশানঘাটে শেষকৃত্য করা হয়। কিন্তু তার শেষ ইচ্ছেটা পূরণ হলো না। কী কারণে তার (সুবীর নন্দীর) মরদেহ হবিগঞ্জে আনা হলো না, জানি না।’

হবিগঞ্জ সুর বিতানের সাধারণ সম্পাদক আবুল ফজলও একই মন্তব্য প্রকাশ করেন।

এদিকে হবিগঞ্জের কৃতি-সন্তান সুবীর নন্দীর মৃত্যুর সংবাদে এখানকার সংগীত জগতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকেই তাকে শেষবারের মতো দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলেও হবিগঞ্জে লাশ না আনার কারণে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন তারা। অনেকেই জানান, সুবীর নন্দী তার কর্মের মাধ্যমে আজীবন বেঁচে থাকবেন হবিগঞ্জ তথা বাংলাদেশর মানুষের হৃদয়ে। কিন্তু মৃত্যুর পর এই শিল্পীকে হবিগঞ্জের মানুষ শেষ বিদায় জানাতে পারলো না, এটাই তাদের কাছে বড় আফসোসের বিষয়। 
   
এর আগে সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দীর মরদেহ সিঙ্গাপুর থেকে বুধবার (আজ) সকালে ঢাকায় এসে পৌঁছায়। সেখান থেকে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গ্রিন রোডের বাসায়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সর্বস্তরের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় বেলা ১১টার দিকে। বেলা ১২টার দিকে সুবীর নন্দীর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বিএফডিসিতে। এরপর নেওয়া হয় চ্যানেল আই-এ।

পরে বেলা ৩টার দিকে রাজধানীর সবুজবাগের বরদেশ্বরী কালিমাটা মন্দির ও শ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

একুশে পদকপ্রাপ্ত এই সংগীতশিল্পী মঙ্গলবার (৭ মে) ভোর সাড়ে চারটার দিকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে মারা যান।

টানা ১৬ দিন রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) লাইফ সাপোর্টে ছিলেন সুবীর নন্দী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৩০ এপ্রিল ঢাকার সিএমএইচ থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় একুশে পদকপ্রাপ্ত এই সংগীতশিল্পীকে। সেখানে দফায় দফায় হার্ট অ্যাটাক হয় তার।

গত ১৪ এপ্রিল রাতে সিলেট থেকে ঢাকায় ফেরার পথে ট্রেনে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন সুবীর নন্দী। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ও কন্যা। রাত ১১টার দিকে তাকে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে হার্ট অ্যাটাক করেন এই নন্দিত শিল্পী। এরপর তাকে দ্রুত লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও হার্টের অসুখে ভুগছিলেন সুবীর নন্দী।

সুবীর নন্দীর জন্ম ১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে। তার পিতার নাম সুধাংশু নন্দী এবং মাতার নাম পুতুল রানী। পিতা সুধাংশু নন্দী ছিলেন একজন মেডিকেল অফিসার। সুবীর নন্দীর গ্রামের বাড়ি বানিয়াচং উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নন্দী পাড়ায়। ১৯৭১ সালে হবিগঞ্জে তার নেতৃত্বেই প্রথম পরিবেশিত হয় জাতীয় সংগীত।

১৯৬৩ সালে তৃতীয় শ্রেণী থেকেই গান গাওয়া শুরু করেন ছোট্ট সুবীর। এরপর ১৯৬৭ সালে তিনি সিলেট বেতারে গান করেন। তার গানের ওস্তাদ ছিলেন গুরু বাবর আলী খান। লোকগানে ছিলেন বিদিত লাল দাশ।

সুবীর নন্দী গানের জগতে আসেন ১৯৭০ সালে ঢাকা রেডিওতে প্রথম রেকর্ডিংয়ের মধ্যদিয়ে। প্রথম গান ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’। গানটি লিখেছেন মোহাম্মদ মুজাক্কের এবং সুরারোপ করেন ওস্তাদ মীর কাসেম।

শহীদ মিনারে সর্বস্তরের শ্রদ্ধা৪০ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গেয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি গান। বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রে গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন ১৯৭৬ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত ‘সূর্যগ্রহণ’ চলচ্চিত্রে। ১৯৮১ সালে তার একক অ্যালবাম ‘সুবীর নন্দীর গান’ ডিসকো রেকর্ডিংয়ের ব্যানারে বাজারে আসে। তিনি গানের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ব্যাংকেও কর্মরত ছিলেন।

সুবীর নন্দী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন পাঁচবার। সংগীতে অবদানের জন্য এ বছর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক পান তিনি।

তার গাওয়া উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে- আমার এ দুটি চোখ, বন্ধু হতে চেয়ে, আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি, চাঁদের কলঙ্ক আছে, দিন যায় কথা থাকে, একটা ছিল সোনার কন্যা, হাজার মনের কাছে, কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো, পাহাড়ের কান্না, বন্ধু হতে চেয়ে তোমার প্রভৃতি।

পাঠকের মন্তব্য