নারী পোশাককর্মী যৌন হয়রানির শিকার ২২.৪ শতাংশ

বাংলাদেশে ২২.৪% নারী পোশাককর্মী যৌন হয়রানির শিকার 

বাংলাদেশে ২২.৪% নারী পোশাককর্মী যৌন হয়রানির শিকার 

বৈদেশিক আয়ের ৮০ শতাংশ আসে পোশাক শিল্প থেকে। এখানে কর্মরতদের মধ্যে শতকরা ৭০ জন নারী। তবে আতঙ্কের খবর হচ্ছে দেশে তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকদের মধ্যে শতকরা ২২ দশমিক ৪ ভাগ কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। এছাড়াও শতকরা ৩৫ দশমিক ৩ ভাগ নারী কর্মী বলেছেন যে, তারা কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের প্রতি যৌন হয়রানির ঘটনা দেখেছেন বা শুনেছেন।

তৈরি পোশাক শিল্প কারখানায় নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানি : সংগ্রাম ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

ঢাকার মিরপুর ও চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ এলাকার ২২টি পোশাক কারখানায় গবেষণা চালিয়ে এ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এ গবেষণা প্রতিবেদনটি গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে উপস্থাপন করা হয়। যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) ও কর্মজীবী নারী নামের দু’টি বেসরকারি সংস্থা।

এই গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে—তৈরি পোশাক খাতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে এ খাতে নিয়োজিত নারীদের জন্য নিরাপদ কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করা।

গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরা যে ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হয়, এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ৪২ দশমিক ৩৩ শতাংশ হচ্ছে ‘কামনার দৃষ্টিতে তাকানো’। এরপর আছে ‘সংবেদনশীল অঙ্গে কোনোকিছু নিক্ষেপ করা’ যা শতকরা ৩৪ দশমিক ৯২ এবং সংবেদনশীল অঙ্গের প্রতি লোলুপ দৃষ্টিতে তাকানো’ যা শতকরা ৩৩ দশমিক ৮৫ ভাগ। কাজ বোঝানোর বা কথা বলার সময় শরীর স্পর্শ করার কথা বলেছেন শতকরা ২৮ দশমিক ৫৭ নারী শ্রমিক।  এছাড়াও আছে অশোভন অঙ্গভঙ্গি, বাজে গালি দেওয়া, চাকরিচ্যুতির হুমকি এবং পদোন্নতির লেআভ দেখিয়ে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব ইত্যাদি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য শিরিন আখতার বলেন, আমাদের নারী নির্যাতনের বিষয়ে সামাজিকভাবে সচেতন হতে হবে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারের সদিচ্ছা আছে। তিনি বলেন, সার্বিকভাবে নারী নির্যাতন এবং যৌন হয়রানির মামলায় দ্রুত বিচার ও শাস্তি কার্যকর করার দাবিতে আমাদের সমন্বিতভাবে রাজপথে জোড়ালো আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যৌন হয়রানির ফলে নানাধরনের ক্ষতি হয়ে থাকে নারী শ্রমিকের ও কারখানা কর্তৃপক্ষের। নারী শ্রমিক রেগে যান, ভয় পান, অপমানিত বোধ করেন, তাদের কাজে ভুল হয়, উৎপাদনের পরিমাণ কমে যায়, ক্রেতাদের অভিযোগের পরিমাণ বাড়ে, অনেকে পদত্যাগ করে, আত্মহত্যাও করেন কেউ কেউ ।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, সুইডিশ দূতাবাসের সেক্রেটারি ইলভা শালসট্রেন্ড সেকেন্ড। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। সমাপনী বক্তব্য রাখেন কর্মজীবী নারীর সভাপতি ড. প্রতিমা পাল মজুমদার।

কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানি বন্ধ করতে এ সংক্রান্ত হাইকোর্টের নির্দেশ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি আবুল হোসাইন রেডিও তেহরানকে বলেছেন, কোন কোন কারখানায় নামকাওয়াস্তে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি আছে তবে তা কেবল বিদেশি ক্রেতাদের শর্ত পূরণের জন্য। এখানে পাঁচ সদস্য কমিটিতে তিনজন কারখানার বাইরে থেকে নেবার কথা। 

উল্লেখ্য, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমে সংঘটিত বিভিন্ন যৌন হয়রানির ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে কেন রাষ্ট্রীয় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে না এই মর্মে ২০০৮ সালে সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট মামলা করা হয়।

আদালত ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে এ প্রসঙ্গে রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমসহ সব প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ নামে একটি কমিটি গঠনের আদেশ দেয়া হয়।

প্রায় দশ বছর পর, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ গত ২৮ এপ্রিল হাইকোর্টের একটি রিট করে জানতে চেয়েছেন, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আদালতের নির্দেশনা অনুসারে কমিটি গঠন করা হয়েছে কিনা। কোন কোন প্রতিষ্ঠানে এরূপ কমিটি গঠন করা হয়েছে তার একটি তালিকাও চাওয়া হয়েছে এ রিট আবেদনে।

দুই সপ্তাহের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট তালিকা প্রতিবেদন আকারে আদালতে দাখিলের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে রিটে।

এছাড়া, রিটে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ও আইন মন্ত্রণালয়কে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইন করার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য