অপরাধ : ইয়াবা পাচারে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার বাড়ছে

অপরাধ : ইয়াবা পাচারে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার বাড়ছে

অপরাধ : ইয়াবা পাচারে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার বাড়ছে

ইয়াবা পাচারে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার বাড়ছে। ক্রসফায়ার, গ্রেপ্তার- কিছুই যেন তাদের দমিয়ে রাখতে পারছে না। অল্প শ্রমে ভালো আয়ের আশায় তারা নিজেদের জড়াচ্ছে অপরাধমূলক এ কর্মকাণ্ডে। সমপ্রতি নগর ও জেলার বিভিন্ন থানায় গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের আধিক্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে ওসিরা এমনটাই জানালেন।

তারা জানান, একজন বাঙালিকে দিয়ে যে কাজ করাতে ৫ হাজার টাকা খরচ হয়, সেখানে রোহিঙ্গারা এ কাজ করে দিচ্ছে দেড়/দুই হাজার টাকায়। পাশাপাশি ধরা পড়লে কারা তাদের নিয়োগ দিয়েছে সে সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিস্তারিত কোনো তথ্য দিতে পারে না। ফলে এ সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে মাদক কারবারিরা।
কোতয়ালী থানার ওসি মোহম্মদ মহসিন আজাদীকে বলেন, গত ৮ মে কঙবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের দুই বাসিন্দাকে দুই হাজার ইয়াবাসহ নগরীর ফিশারিঘাট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ দুইজনের মধ্যে হোসেন টেকনাফের লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এফ ব্লকের বাসিন্দা আলী হোসেনের ছেলে আর সুলতান একই ক্যাম্পের আব্দুর রহিমের ছেলে। ফিরিঙ্গিবাজার ব্রিজঘাট এলাকায় চৌকি বসিয়ে সৌদিয়া পরিবহনের একটি বাস থামিয়ে তাদের জিজ্ঞাসবাদ করা হয়। এসময় তারা স্যান্ডেলের ভেতর ইয়াবা থাকার কথা স্বীকার করে। গ্রেপ্তার দুজন কক্সবাজার থেকে সংগ্রহ করা এসব ইয়াবা বিক্রির জন্য ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিল বলে জানিয়েছে।

ওসি মহসিন বলেন, রোহিঙ্গারা ইয়াবা পাচারের সময় ধরা পড়লেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় মূল ক্রেতা ও বিক্রেতারা। গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর তারা মূল হোতাদের ব্যাপারে কিছুই বলতে পারে না। এটা তাদের কৌশল হতে পারে। পাশাপাশি এটাও সত্য যে, তাদের ব্যবহার করা হয় ‘কাট আউট’ পদ্ধতির মাধ্যমে। যে কারণে তাদের হাতে যারা ইয়াবা তুলে দেয় তার সম্পর্কে অল্প কিছু জানলেও, এর ওপরের রাঘব বোয়ালদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতে পারে না তারা। এজন্য তাদের সহজে ব্যবহার করছে এসব ইয়াবা গডফাদাররা।

এ ব্যাপারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের উপ-পরিচালক শামীম আহমেদ আজাদীকে বলেন, মূলত ভয়ের কারণেই তারা তথ্য দিতে চায় না। মূল হোতাদের ব্যাপারে তথ্য না দেওয়ার কারণ, তাদের মেরে ফেলার ভয় দেখায় গডফাদাররা। আবার অনেকেই জানে গ্রেপ্তারের পর তাদেরকে ছাড়িয়ে নেয়া হবে। মূলত আইনশৃঙ্খলা বহিনীর চোখ ফাঁকি দিতেই তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে।

এদিকে রোহিঙ্গাদের কীভাবে টোপ দেওয়া হয় সে সম্পর্কে আজাদীকে বিস্তারিত জানায় ইতঃপূর্বে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হাতে ধরা পড়া টেকনাফ নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পের বাসিন্দা ইয়াসমিন আক্তার (২১)। সে জানায়, এক স্থানীয় নেতা তাকে এই মাদক বহনে প্ররোচিত করেছে। ইয়াসমিনকে শর্ত দেয়, যদি সে নিয়মিত ইয়াবা পরিবহনে রাজি থাকে তবে তার ১৩ বছর বয়সী ভাইকে ভালো চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। তার কোলের দুই শিশুকে (একটির বয়স দেড় বছর, অন্যটি ৯ মাস) ভালোভাবে লালন পালনের জন্য কিছু টাকাও দেয়া হবে। ফলে সুন্দর ভবিষ্যতের লোভে বাধ্য হয়ে সে প্রস্তাবে রাজি হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের কমপক্ষে ৮০টি পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে ইয়াবা। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার চালান দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাচারে জড়িত এমন ৮০৪ জনের নাম পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এদের ৪০ জন মিয়ানমারের নাগরিক। তারা হলো, মিয়ানমারের সাবেক নাসাকা সেক্টর-১-এর আবদুল গফুর, খায়নখালীর রশীদ, নাসাকা সেক্টর-৭ এলাকার ইব্রাহিম, মংডু থানার শফি, হেতেলাপাড়ার সাদেক, আমতলা থানার আবদুল করিম, মৌলভী ছিদ্দিক আহমেদ, মহিবুল্লাহ, করিম, আবু আহমদ, পোয়াখালীর কামাল, শফি, সাইদুল, শাহ আলম, বুজি জহির, ছোট বুজুর্গর বিল এলাকার আবদুল মোতালেব, নয়াপাড়ার হামিদ হোসেন, ওই এলাকার সৈয়দুল আমিন, ইউসুফ, গজুবিল এলাকার কালা সোনা, আলম, মংডু থানার গোনাপাড়ার রশীদ, সংসমার জোবায়ের আহমেদ, গোনাপাড়ার হারুন, সুদাপাড়ার আলী মোহাব, ফয়েজিপাড়ার মো. সৈয়দ, নাপিতের ডেইলের নুরু, গোনাপাড়ার জোহার, মগপাড়ার অং সং, ফয়েজিপাড়ার সৈয়দ করিম, একই এলাকার জয়নাল ওরফে জইন্যা, জুলাপাড়ার আসাদুল্লাহ, একই এলাকার হেফজুর রহমান ও আরেফ আলী।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, জেলা গোয়েন্দা পুলিশের তৈরি করা ইয়াবা ব্যবসায়ী ও চালানকারীদের যে তালিকা রয়েছে, তাতে ১৩ জন নেতৃস্থানীয় রোহিঙ্গা শরণার্থীরও নাম রয়েছে।

নগরীতে বিভিন্ন সময় ইয়াবাসহ রোহিঙ্গা নাগরিকরা ধরা পড়লেও দেখা গেছে, রাঘব বোয়ালরা বরাবরের মতো অধরা-ই রয়ে গেছে। ২১ জানুয়ারি স্টেশন রোড থেকে ৫০০ পিস ইয়াবাসহ রোহিঙ্গা শরনার্থী ফাতেমা বেগমকে ও বাকলিয়া মেরিনার্স সড়ক থেকে ২ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবাসহ রোহিঙ্গা শরণার্থী তৈয়বা খাতুনকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার করে। পরদিন ২২ জানুয়ারি সকালে নগরীর ডবলমুরিং থানার দেওয়ান হাট এলাকা থেকে শাকের (২৪) নামে এক রোহিঙ্গা যুবককে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তার থেকে আড়াই হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।

১৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গোপসাগরে অভিযান চালিয়ে এক লাখ ইয়াবাসহ ৪ রোহিঙ্গাকে আটক করে র‌্যাব। এ সময় একটি ফিশিং বোটও জব্দ করা হয়। র‌্যাব জানিয়েছে, জব্দ করা ইয়াবার মূল্য আনুমানিক ৫ কোটি টাকা। আটককৃতরা রোহিঙ্গারা হলো- কঙবাজারের উখিয়ার থাইংখালী হাকিমপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এনায়েত উল্লাহ (২৮), করিম উল্লাহ (৩২), রশিদ উল্লাহ (২২) ও হামিদ (২০)। আটককৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মিয়ানমার থেকে ওই চালান চট্টগ্রামে নিয়ে যাচ্ছিল বলে তারা স্বীকার করে। আটককৃতরা মিয়ানমারের নাগরিক এবং গত বছর রাখাইন থেকে পালিয়ে এসে উখিয়ার থাইংখালী হাকিমপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থান করছিল বলে জানা যায়।

১০ এপ্রিল নগরীর কোতোয়ালী থানার ব্রিজঘাট এলাকা থেকে ৫০ হাজার পিস ইয়াবাসহ তিন রোহিঙ্গা নাগরিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ তিনজন হলেন- আবু তাহের (২২), মো. ইসমাইল (২৮) ও মো. মোকারম (২৭)।

পাঠকের মন্তব্য