কোপা আমেরিকার জন্য ২৩ সদস্যের ব্রাজিল দল ঘোষণা

কোপা আমেরিকার জন্য ২৩ সদস্যের ব্রাজিল দল ঘোষণা

কোপা আমেরিকার জন্য ২৩ সদস্যের ব্রাজিল দল ঘোষণা

কোপা আমেরিকায় আটবার শিরোপা জিতেছে ব্রাজিল। সর্বশেষ জিতেছে সেই ২০০৭ সালে। ব্রাজিল দলে রোনালদো, রোনালদিনহো, রিভালদোদের সূর্য তখন অস্তমিত। তাও সেবার ব্রাজিলের কোপা জিততে বিশেষ সমস্যা হয়নি। সে দলে ছিলেন রবিনহো, দানি আলভেস, মাইকন ও জিলবার্তো সিলভার মতো তারকারা। গত ১২ বছরে কোপার শিরোপা আর ব্রাজিলের হাতে ধরা দেয়নি। নবম কোপা জয়ের উদ্দেশ্যে ব্রাজিল কোচ তিতে দল ঘোষণা করেছেন গতকাল। দক্ষিণ আমেরিকায় চিলির আধিপত্য শেষ করে ও আর্জেন্টিনার চোখরাঙানি উপেক্ষা করে নেইমাররা কি কোপার শিরোপা ঘরে তুলতে পারবেন? সে প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে জুলাই মাসের ৭ তারিখে। তার আগে ব্রাজিল দলটা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

গোলরক্ষক : এবার ব্রাজিলের মূল স্কোয়াডে গোলরক্ষক হিসেবে জায়গা পেয়েছেন অ্যালিসন বেকার, এডারসন মোরায়েস ও ক্যাসিও। বিশ্বকাপের ব্রাজিল দলেও এই তিনজনই ছিলেন। ফলে, আবারও কপাল পুড়েছে ভ্যালেন্সিয়ায় খেলা গোলরক্ষক নেতোর। এক-দেড় বছর ধরে ব্রাজিলের গোলবারের নিচে কে দাঁড়াবেন, এ নিয়ে একটা স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা চলছে অ্যালিসন ও এডারসনের মধ্যে। সে লড়াইয়ে সব সময় অ্যালিসনকে নিজের ভোট দিয়ে এসেছেন কোচ তিতে। অনেকটা বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক দুই গোলরক্ষক আমিনুল হক আর বিপ্লব ভট্টাচার্যের মতো। দুজনই ছিলেন প্রায় সমানে সমান, কিন্তু অধিকাংশ সময়ে মূল একাদশের গোলরক্ষক হিসেবে আমিনুলই ডাক পেতেন। সদ্য শেষ হওয়া ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে অ্যালিসনের দল লিভারপুল আর এডারসনের দল সিটির মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর শিরোপা গেছে এডারসনদের ঘরেই। কিন্তু লিগের সেরা গোলরক্ষক হয়েছেন আবার অ্যালিসন। এবার কোপাতেও এই লড়াই চলবে। দলের তৃতীয় গোলরক্ষক হিসেবে জায়গা পেয়েছেন করিন্থিয়ানসের ক্যাসিও। তিতে আগে করিন্থিয়ানসের কোচ ছিলেন, দলটার খেলোয়াড়দের জন্য তাঁর একটা আলাদা আবেগ কাজ করে। ক্যাসিওর দলে থাকার মধ্যে কেউ সেই আবেগের বহিঃপ্রকাশ দেখলে ভুল কিছু দেখবেন না!

দলে আছেন: অ্যালিসন বেকার (লিভারপুল), এডারসন মোরায়েস (ম্যানচেস্টার সিটি), ক্যাসিও (করিন্থিয়ানস)

বাদ পড়েছেন: নেতো (ভ্যালেন্সিয়া), ওয়েভারতন (পালমেইরাস), ব্রাজাও (পারমা)

ডিফেন্ডার : ২৩ জনের এই স্কোয়াডে ডিফেন্ডার আছেন আটজন। মূল একাদশের চারজন ও সেই চারজনের প্রত্যেকের একজন করে বিকল্প নিয়েছেন তিতে। ফলে, দলে দুজন সেন্টারব্যাকের বিকল্প হিসেবে দুজন সেন্টারব্যাক, মূল দলের রাইটব্যাক ও লেফটব্যাকের বিকল্প হিসেবে যথারীতি একজন করে রাইট ও লেফটব্যাক নেওয়া হয়েছে। চারজন সেন্টারব্যাক হিসেবে স্কোয়াডে আছেন থিয়াগো সিলভা, মার্কিনহোস, মিরান্ডা ও এডার মিলিতাও। মিলিতাও ছাড়া বাকি তিনজন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ছিলেন। মিলিতাওর সুসংবাদ পাওয়া যেন শেষই হচ্ছে না। সদ্য শেষ হওয়া মৌসুমে এফসি পোর্তোর হয়ে দুর্দান্ত খেলার পুরস্কারস্বরূপ কিছুদিন আগে রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন তিনি, এবার কোপার স্কোয়াডেও জায়গা করে নিলেন। সেন্টারব্যাক ছাড়াও রাইটব্যাক হিসেবে খেলতে পারেন তিনি। পিএসজির দুই সেন্টারব্যাক মার্কিনহোস আর থিয়াগো সিলভা আছেন দলে। ইন্টার মিলানের মূল একাদশে নিয়মিত জায়গা না পেলেও ব্রাজিল স্কোয়াডে ঠিকই আবারও ঠাঁই হয়েছে বর্ষীয়ান মিরান্ডার। ফলে এবার ইউরোপার সেমিতে খেলা ভ্যালেন্সিয়ার সেন্টারব্যাক গ্যাব্রিয়েল পলিস্তার জায়গা হয়নি। একই দশা ডেভিড লুইজ ও লুইজ ফেলিপেরও। কোপা ইতালিয়া জেতা লাৎসিও স্কোয়াডের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন লুইজ ফেলিপে। আর ওদিকে চেলসির কোচ মরিজিও সারির একাদশের অন্যতম প্রধান নাম লুইজ। মিলিতাওর সতীর্থ পোর্তোর সেন্টারব্যাক ফেলিপেও ডাক পাননি। রাইটব্যাক হিসেবে দলে জায়গা পেয়েছেন যথারীতি দানি আলভেস। বিকল্প রাইটব্যাক হিসেবে দলে আছেন ফাগনার। ক্যারিয়ারের একদম শেষ প্রান্তে এসে গেলেও বর্ষীয়ান আলভেসের প্রতি তিতের নির্ভরতা বিন্দুমাত্রও কমছে না। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে অসাধারণ খেললেও তখন বার্সেলোনায় খেলা রাইটব্যাক আলভেসের চেয়ে ইন্টার মিলানের মাইকনকে বেশি খেলাতেন তৎকালীন ব্রাজিল কোচ দুঙ্গা। সে সময়ে পাওয়া সেই অবজ্ঞার হিসাব যেন এখন কড়ায়-গন্ডায় নিচ্ছেন আলভেস! যে কারণে দলে সুযোগ পাচ্ছেন না প্রতিভাবান তরুণ কিছু রাইটব্যাক। যেমন রিয়াল বেতিসের এমারসন। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে নিয়মিত না খেলার মাশুল দিয়েছেন দানিলো। 

আলভেসকে রাখলেও লেফটব্যাক হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদের মার্সেলোকে রাখার সাহস দেখাননি তিতে। কয়েক মাস ধরেই জঘন্য ফর্মে আছেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের মূল একাদশে জায়গা পেতেও গলদঘর্ম অবস্থা হয় এখন তাঁর। তবে দলে ডাক পেয়েছেন নিজের সেরা সময় পার করে আসা ফিলিপে লুইস। আরও আছেন জুভেন্টাসের অ্যালেক্স সান্দ্রো। ফলে, বেশ কিছু তরুণ লেফটব্যাকের কপাল পুড়েছে। দলে ঢুকতে পারেননি সেভিয়ার গিলের্মে আরানা, পোর্তোর অ্যালেক্স তেয়েস ও বেয়ার লেভারকুসেনের ওয়েনডেল। বিশেষ করে পোর্তোর হয়ে এ মৌসুমে দুর্দান্ত খেলেছেন তেয়েস। অনেকেই ভেবেছিলেন, কোপায় জায়গা পাবেন তিনি। কিন্তু হয়নি।

দলে আছেন: মার্কিনহোস (পিএসজি), থিয়াগো সিলভা (পিএসজি), মিরান্ডা (ইন্টার মিলান), এডার মিলিতাও (রিয়াল মাদ্রিদ/পোর্তো), দানি আলভেস (পিএসজি), ফাগনার (করিন্থিয়ানস), ফিলিপে লুইস (অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ), অ্যালেক্স সান্দ্রো (জুভেন্টাস)

বাদ পড়েছেন: ডেভিড লুইজ (চেলসি), লুইজ ফেলিপে (লাৎসিও), গ্যাব্রিয়েল পলিস্তা (ভ্যালেন্সিয়া), ফেলিপে (পোর্তো), মার্সেলো (রিয়াল মাদ্রিদ), অ্যালেক্স তেয়েস (পোর্তো), গিলের্মে আরানা (সেভিয়া), ওয়েনডেল (বেয়ার লেভারকুসেন), এমারসন (রিয়াল বেতিস), দানিলো (ম্যানচেস্টার সিটি)

মিডফিল্ডার : দলে মিডফিল্ডার হিসেবে জায়গা পেয়েছেন পাঁচজন। বার্সেলোনার আর্থার মেলো, নাপোলির অ্যালান, এসি মিলানের লুকাস পাকেতা, রিয়াল মাদ্রিদের কাসেমিরো ও ম্যানচেস্টার সিটির ফার্নান্দিনহো। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ফর্ম হারালেও কাসেমিরোর প্রতি আস্থা রেখেছেন তিতে। ওদিকে ফার্নান্দিনহোর বয়স হয়ে গেলেও দলে ডাক পেয়েছেন। যেদিন খেলতে পারেন, সেদিন ফার্নান্দিনহো অসাধারণ। সেটা এ মৌসুমে ম্যানচেস্টার সিটি বেশ ভালোভাবে বুঝেছে। কিন্তু যে দিন খেলতে পারেন না, সেদিন দলের হারের কারণ হন তিনি। সেটা ব্রাজিলের চেয়ে ভালো আর কে জানে? গত বিশ্বকাপে কাসেমিরোর নিষিদ্ধ হওয়ার সুবাদে মূল একাদশে জায়গা পাওয়া ফার্নান্দিনহো জঘন্য খেলেছিলেন বেলজিয়ামের বিপক্ষে। ফলাফল, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার থেকেই ব্রাজিলের বিদায়। এবার চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালের দুই লেগে লিওনেল মেসিকে বোতলবন্দী করে রাখা লিভারপুলের মিডফিল্ডার ফাবিনহোকে দলে রাখার প্রয়োজন মনে করেননি তিতে। পুরো মৌসুমে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে তেমন ভালো খেলেননি, ফলে জায়গা পাননি দলটির দুই ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার ফ্রেড ও অ্যান্দ্রেয়াস পেরেইরা। বার্সেলোনার হয়ে ঝলক দেখানো আর্থার মেলো ও এসি মিলানের তরুণ প্রতিভা লুকাস পাকেতার ওপর বড় ভরসা করে কোপায় যাচ্ছেন তিতে। 

দলে আছেন: কাসেমিরো (রিয়াল মাদ্রিদ), লুকাস পাকেতা (এসি মিলান), অ্যালান (নাপোলি), ফার্নান্দিনহো (ম্যানচেস্টার সিটি), আর্থার মেলো (বার্সেলোনা)

বাদ পড়েছেন: ফাবিনহো (লিভারপুল), ফ্রেড (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড), অ্যান্দ্রেয়াস পেরেইরা (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড), রেনাতো অগুস্তো (বেইজিং গুয়ান), পাওলিনহো (গুয়াংঝু এভারগ্রান্ডে), ফেলিপে অ্যান্ডারসন (ওয়েস্ট হাম)

ফরোয়ার্ড : দলের সবচেয়ে বড় তারকা নেইমারকে ঘিরেই সাজানো হয়েছে স্কোয়াডের আক্রমণভাগ। নেইমার ছাড়াও ব্রাজিলের আক্রমণভাগে ডাক পেয়েছেন রবার্তো ফিরমিনো, গ্যাব্রিয়েল জেসুস, ফিলিপ কুতিনহো, ডেভিড নেরেস, রিচার্লিসন ও এভারতন। লিভারপুলের আক্রমণভাগের অন্যতম কান্ডারি ফিরমিনো এবারও দলের চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে যাওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ওদিকে সার্জিও আগুয়েরোর দাপটে ম্যানসিটির মূল একাদশে জায়গা না পেলেও কোপার দলে ঠিকই আছেন গ্যাব্রিয়েল জেসুস। আয়াক্সের হয়ে স্বপ্নের মতো এক মৌসুম কাটানো ডেভিড নেরেস আছেন দলে। মৌসুমের শুরুতে ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে এভারটনে নাম লিখিয়ে চোখ কপালে তোলা ফরোয়ার্ড রিচার্লিসন গোটা মৌসুমে বুঝিয়েছেন নিজের মূল্য। আছেন তিনিও। দুঃস্বপ্নের মতো মৌসুম কাটানোর ফলে অনেকে ভেবেছিলেন কোপায় হয়তো জায়গা হবে না বার্সেলোনা তারকা ফিলিপ কুতিনহোর। কিন্তু তাঁকে স্কোয়াডে রেখেছেন তিতে। ফলে কপাল পুড়েছে কুতিনহোর সতীর্থ মালকমের। চোটে পড়া রিয়াল মাদ্রিদের তরুণ তারকা ভিনিসিয়ুসও নেই দলে। গত কয়েক বছর ধরে গ্রেমিওর হয়ে আলো ছড়ানো উইঙ্গার এভারতনকে ডাকা হয়েছে। দলে জায়গা পাননি উইলিয়ান, ডগলাস কস্তা, লুকাস মউরা প্রমুখ। এবার টটেনহামকে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে তোলার অন্যতম কারিগর লুকাস মউরাকে দলে না দেখে বিস্মিত হয়েছেন অনেকে।

দলে আছেন: রবার্তো ফিরমিনো (লিভারপুল), নেইমার জুনিয়র (পিএসজি), গ্যাব্রিয়েল জেসুস (ম্যানচেস্টার সিটি), ডেভিড নেরেস (আয়াক্স), ফিলিপ কুতিনহো (বার্সেলোনা), রিচার্লিসন (এভারটন), এভারতন (গ্রেমিও)

বাদ পড়েছেন: লুকাস মউরা (টটেনহাম), উইলিয়ান (চেলসি), ডগলাস কস্তা (জুভেন্টাস), ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (রিয়াল মাদ্রিদ), মালকম (বার্সেলোনা)

মূলত, দলকে ৪-৩-৩ ছকে খেলাবেন তিতে, এমনটাই মনে হচ্ছে। গোলবারের নিচে অ্যালিসন, তাঁর সামনে সেন্ট্রাল ডিফেন্সে জুটি বাঁধবেন মার্কিনহোস ও মিরান্ডা। রাইটব্যাক হিসেবে দানি আলভেস, বাঁ দিকে অ্যালেক্স সান্দ্রো। তিন মিডফিল্ডার হিসেবে আর্থার মেলো, কাসেমিরো ও লুকাস পাকেতার খেলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। আক্রমণভাগে থাকবেন নেইমার, কুতিনহো ও গ্যাব্রিয়েল জেসুস। স্ট্রাইকার হিসেবে ক্লাবে যত বাজেই খেলুন না কেন, জেসুসকে সব সময়েই পছন্দ তিতের।

দলের অধিনায়ক কে হবেন, এখনো খোলাসা করেননি তিতে। কিছুদিন আগে এক দর্শককে মারতে গিয়েছিলেন নেইমার, ইনস্টাগ্রামে উয়েফাকে গালাগাল করে নিষিদ্ধও হয়েছেন। ফলে, নেইমারের ওপর অধিনায়কত্বের ভার দেওয়াটা কতটুকু সমীচীন হবে, এখনো বুঝে উঠতে পারেননি তিতে। 

পাঠকের মন্তব্য