কক্সবাজারে ফের সক্রিয় মানব পাচারকারী চক্র

কক্সবাজারে ফের সক্রিয় মানব পাচারকারী চক্র

কক্সবাজারে ফের সক্রিয় মানব পাচারকারী চক্র

কক্সবাজারে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে মানব পাচারকারী চক্র। তবে এবার তাদের টার্গেট মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা। অভিযোগ রয়েছে, উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবির থেকে কৌশলে পালিয়ে দালালের হাত ধরে রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছে। গত শনিবার রাতে এভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টাকালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ৮৭ জন রোহিঙ্গা। আর সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে গত ছয় মাসে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার করেছেন প্রায় ৫০০ রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু।

জানা গেছে, গত বছরের ৬ নভেম্বর প্রথমবারের মতো মানব পাচারকারী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠার প্রমাণ পাওয়া যায়। ওইদিন টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টাকালে ১৪ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে বিজিবি। দালাল চক্র মালয়েশিয়া নেয়ার কথা বলে দুদিন সাগরের এদিক-ওদিক ঘোরানোর পর ‘থাইল্যান্ডের তীরে পৌঁছেছি’ বলে টেকনাফের সৈকতে তাদের নামিয়ে দেয়। পরে বিজিবি তাদের উদ্ধার করে। পরদিন (৭ নভেম্বর) একইভাবে আরো ৩৩ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশুকে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড। এ সময় ছয় দালালকেও আটক করা হয়।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্যমতে, সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টাকালে গত ৬ নভেম্বর থেকে ১৮ মে পর্যন্ত কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৪৮১ জন রোহিঙ্গা ও দুই বাংলাদেশীকে উদ্ধার করেছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। উদ্ধারকৃত রোহিঙ্গাদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলা হওয়ায় কক্সবাজারে মানব পাচারের ঘটনা বেশি। এছাড়া রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কারণে মানব পাচারের ঘটনা বেড়ে গেছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয় থাকায় ধরাও পড়ছে। তিনি বলেন, ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মানব পাচারের ঘটনায় কক্সবাজার জেলায় ৪৩৩টি মামলা হয়েছে। এসব মামলা বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া প্রতি মাসেই মানব পাচারের মামলা হচ্ছে। বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে কক্সবাজার জেলা পুলিশ মানব পাচারকারীদের একটি তালিকাও তৈরি করেছে। বর্তমানে নতুন করে আরো একটি তালিকা তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। পুরনো ও নতুন তালিকা ধরে অভিযান আবার জোরদার করা হবে।

সূত্র জানায়, প্রথম দিকে টেকনাফ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় মানব পাচারকারী চক্র সক্রিয় থাকলেও পরে কক্সবাজার জেলা পেরিয়ে চট্টগ্রাম ও ঢাকার শহরতলী হয়ে দেশের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্ত পর্যন্ত নেটওয়ার্ক বিস্তার করে। এ নেটওয়ার্কের নেতৃত্ব দেয় মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা। পরে স্থানীয় প্রভাবশালীসহ বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ মানব পাচারে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি নেটওয়ার্কটি বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে। এ নেটওয়ার্কের সদস্যরা অপহরণের পর বিদেশে পাচার করে মুক্তিপণ আদায়, থাইল্যান্ডে দাস শ্রমিক হিসেবে বিক্রি, এমনকি খুনও করে থাকে। এ চক্রের খপ্পরে পড়ে শত শত যুবক নিখোঁজ হয়ে গেছে।

জীবনবদলের স্বপ্নে দালালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার ইচ্ছে নিয়ে থাইল্যান্ডে দাসখানায় মারা যায় কক্সবাজারের চকরিয়ার খুটাখালী ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়ার শুক্কুর আহমদ ড্রাইভারের ২৩ বছর বয়সী ছেলে পুতিয়া। তারই মতো মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে একই ইউনিয়নের সেগুনবাগিচা এলাকার শাহ আলমের মেয়ের জামাই আবুল হাশেমসহ খুটাখালী গ্রামের ১৪ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মূলত রোহিঙ্গা দালালরাই সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের এ রুটটি আবিষ্কার করে। অসচ্ছল ও বেকার যুবকদের জীবন বদলে দেয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে নগদ ১০-২০ হাজার ও বাকিতে দেড়-দুই লাখ টাকায় মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার শর্তে সহজেই ফাঁদে ফেলছে। মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিভিন্ন সমুদ্র উপকূল ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথমে ছোট নৌকাযোগে উপকূল থেকে সমুদ্রে বড় জাহাজে তুলে দেয়া হয়। সেই জাহাজ ১০ দিন পর থাইল্যান্ড পৌঁছে দেয়। থাইল্যান্ডে অবস্থানের সময় ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায় করা হয়। মুক্তিপণ পেলে মালয়েশিয়ার জঙ্গলে বিভিন্ন খামারে শ্রমিক হিসেবে পাঠানো হয়। মুক্তিপণ পাওয়া না গেলে তাদেরকে থাইল্যান্ডে দাস শ্রমিক হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয় অথবা দিনের পর দির সেখানে নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি নির্যাতনে মারাও গেছেন অনেকেই। স্থানীয়রা আগের সেই দুঃসহ স্মৃতি ভুলতে না পারলেও এখন রোহিঙ্গারা সহজ টার্গেটে পরিণত হচ্ছে মানব পাচারকারীদের। মিয়ানমারে জোর করে ফিরিয়ে দেয়া হবে, সেখানে গেলে মগেরা কেটে ফেলবে, বিশেষ করে নারীরা মালয়েশিয়া গেলে ভালো বরের সঙ্গে বিয়ে হবে, যুবকদের ভালো চাকরি হবে—এমন প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলছে মানব পাচারকারীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের এক মাঝি (নেতা) জানান, যাদের আত্মীয়স্বজন মালয়েশিয়ায় বসবাস করছে, এ ধরনের রোহিঙ্গারাই মালয়েশিয়া যাওয়ার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। তারা হুন্ডির মাধ্যমে দালালদের কাছে টাকা পাঠায়। আবার যাদের আত্মীয়স্বজন সেখানে নেই, তারাও উন্নত জীবনের আশায় এবং অবিবাহিত নারীরা বিয়ের প্রলোভনে মালয়েশিয়া চলে যেতে চান। এক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন সংস্থা থেকে পাওয়া ত্রাণসামগ্রী বিক্রি করে টাকা জমিয়ে দালালদের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, সড়কে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চেকপোস্ট থাকলেও দালালের হাত ধরে রাতের আঁধারে পাহাড়ি পথে রোহিঙ্গারা পাচারের শিকার হচ্ছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে আসা ঠেকাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক চেকপোস্ট থাকলেও ক্যাম্পগুলো পাহাড়ি এলাকায় হওয়ায় তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন পাহাড়ি পথ মাড়িয়ে রোহিঙ্গারা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে ক্যাম্প এলাকাটিতে কাঁটাতারের বেড়া বা সীমানাপ্রাচীর দেয়ার প্রস্তাবের কথা ভাবছে পুলিশ। এছাড়া ক্যাম্প এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করার পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর টহল আরো জোরদারের বিষয়টি নিয়েও ভাবছে প্রশাসন।

পাঠকের মন্তব্য