রাজশাহী খাদ্য গুদামে অনিয়ম ধামাধাপা দেয়ার উদ্যোগ

রাজশাহী খাদ্য গুদামে অনিয়ম ধামাধাপা দেয়ার উদ্যোগ

রাজশাহী খাদ্য গুদামে অনিয়ম ধামাধাপা দেয়ার উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজশাহী সদর খাদ্যগুদামে সরকারী বিনির্দেশনার (সরকারের নির্ধারণ করে দেয়া মান) বাইরে নিম্ন মানের চাল সরবরাহ ও নিয়ম অমান্য করে স্টেনসিল (সিল) ছাড়াই ৪৪৯ টন চাল গুদামজাত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে তড়িঘড়ি করে নিজেরাই নামেমাত্র তদন্ত সেরেছে রাজশাহী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ। আর তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই গুদামে থাকা চাল কেলেঙ্কারী ঢাকতে শনিবার অভিযুক্ত কর্মকর্তা লেবারদের দিয়ে বস্তাগুলোতে স্টেনসিল করিয়েছেন ও শাহমখদুম রাইস মিল কর্তৃক সরবরাহ করা নিম্ন মানের চালের প্রায় ১৩’শ টি বস্তা (৩৯টন) সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিকে খাদ্য গুদামে এত বড় কেলেঙ্কারি ঘটে গেলেও এখন পর্যন্ত তা জানান হয়নি জেলা প্রশাসককে।

ঠিকাদার চাল মিল কর্তৃক নিম্ন মানের চাল সরবরাহ ও চালের বস্তায় সরবরাহকৃত চাল মিলের লেবেল না থাকাসহ গুদামে চালের বস্তা প্রবেশের সময় প্রয়োজনীয় স্টেনসিল না দেয়ার অভিযোগে রাজশাহী সদর খাদ্য গুদামে অভিযান (তদন্ত) চালান হয়। লোকচক্ষুর আড়ালে গত ২২ মে মঙ্গলবার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) নাজমুল হক ভুঁইয়ার নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।

তদন্ত শেষে তিনি জানান, ৪ নম্বর গোডাউনে সদ্য সরবরাহ করা ৪ হাজার বস্তা নতুন চালের বস্তার মধ্যে ৪ শতাংশ বস্তায় সরকারী বিনির্দেশনার বাইরে নিম্নমানের চাল পাওয়া গেছে। এছাড়া গুদামে প্রবেশের পূর্বেই প্রতিটি বস্তায় চাল মিল ও গুদাম কর্তৃপক্ষের পৃথক স্টেনসিল করানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও গুদামে থাকা কোন বস্তায় তা পাওয়া যায়নি।

তবে সন্দেহে থাকা ৪ হাজার বস্তার সবগুলো পরীক্ষা না করে মাত্র ৫৩২টি বস্তা নামে মাত্র পরীক্ষা করে এর ওপর গড় করে ফলাফলে পৌছান এই তদন্ত কর্মকর্তা। কারণ হিসেবে তিনি জানান, পর্যাপ্ত জনবল ও সময়ের অভাবে গুদামে থাকা প্রতিটি বস্তা ও এর চাল পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

এবিষয়ে গুদামটির ওসি এলসডি মাজেদুল ইসলামকে শোকজ করা হয়েছে। একই সাথে চাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান শাহমখদুম রাইস মিলের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে এবং আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া হবে। রবিবার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) নাজমুল হক ভুঁইয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

তবে যে পদ্ধতিতে ও যাদের দিয়ে এই অভিযান বা তদন্ত পরিচালনা করা হয়েছে তাদের নিয়েই রয়েছে সন্দেহ। একটি পক্ষ অভিযোগ করে বলছে যারা এই দুর্নীতি বা অনিয়মের সাথে জড়িত তারাই এবিষয়টি বা গুদামে থাকা চালের বস্তাগুলোর তদন্ত করছে! ফলে গুদামে থাকা এই বিপুল সংখ্যক চালের দুর্নীতি খোলাশা হওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মিল সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দেয় অভিযোগে জানা যায়, সদর গুদামে এবার ৫৪৯ টন নতুন চাল কেনা হচ্ছে। ২২ মে মঙ্গলবার তদন্তের আগে সদর খাদ্য গুদামের ৪ নম্বর গোডাউনে ৫টি স্তুপে চালের বস্তা সাজিয়ে রাখা ছিল। যার প্রতিটি স্তুপে রয়েছে ৪ হাজার বা তার বেশি বস্তা চাল। যার মধ্যে দুইটি স্তুপে নতুন চাল রয়েছে। আর এই নতুন চালের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রাজশাহীর শাহমখদুম রাইস মিল।

মিলটির ম্যানেজার তানভির সুলতানের দেয়া তথ্য মতে, সদর খাদ্য গুদামে এরই মধ্যে তারা দেড়শ টনের বেশি চাল সরবরাহ করেছে। আর এই নতুন চালের আড়ালে মিল কর্তৃপক্ষ প্রায় ১৩শ বস্তা বা ৩৯টন পুরাতন বা নিম্ন মানের চাল সরবরাহ করেছে। এর সবই হয়েছে গুদামটির সংশ্লিষ্টদের যোগশাযোশে।

সূত্রটি অভিযোগ করে আরো জানায়, গুদামে চাল প্রবেশের পূর্বেই প্রতিটি বস্তায় মিল ও গুদাম কর্র্তৃপক্ষের পৃথক সিল বা স্টেনসিল করান বাধ্যতামূলক নিয়ম রয়েছে। কারণ এই স্টেনসিল দেয়া না থকলে বস্তার চালগুলো ঠিক কবে গুদামে প্রবেশ করেছে বা কোন সময়ের ও কোন মিলের সরবরাহ করা চাল তা নির্ণয় করা সম্ভব হবে না। এ কারণেই গুদাম সংশ্লিষ্ট ও চাল মিল কর্তৃপক্ষের যোগশাযোশেই বস্তার গায়ে এই স্টেনসিল বিষয়টি এড়িয়ে যাওয় হয়। যাতে প্রয়োজন বোধে বা সুবিধা মাফিক পুরাতন চালকে নতুন করে চালিয়ে দেয়া যায় বা দায় এড়িয়ে যাওয়া যায়।

চালের সরবরাহে অনিয়মের বিষয়ে শাহমখদুম রাইস মিলের ম্যানেজার তানভির সুলতান কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। আর সদর গুদামের ওসি এলসডি মাজেদুল ইসলাম জানান, গুদামে চাল সরবরাহে কোন অনিয়ম নেই। কিছু বস্তায় স্টেনসিল করতে মিস করেছিলো শ্রমিকরা। ওগুলোতে স্টেনসিল করা হচ্ছে।

এদিকে রাজশাহী সদর খাদ্য গুদামে চাল নিয়ে এত বড় কেলেঙ্কারি ঘটে গেলেও এখন পর্যন্ত বিষয়টি জানান হয়নি রাজশাহী জেলা প্রশাসককে। জেলা প্রশাসক এসএম আব্দুল কাদের বলেন, এ ঘটনা সম্পর্কে আমরা এখন পর্যন্ত জানা নেই। তবে অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এসব ব্যাপারে রাজশাহী আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সাংবাদিকদের জানান, বিয়টি তদন্ত করতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেন পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাঠকের মন্তব্য