দ্বিতীয় শীর্ষ ইয়াবা ডন সাইফুল ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত

দ্বিতীয় শীর্ষ ইয়াবা ডন সাইফুল ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত

দ্বিতীয় শীর্ষ ইয়াবা ডন সাইফুল ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ ইয়াবা কারবারি হাজী সাইফুল করিম পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। এতে তিন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার দিনগত রাত ১টায় কক্সবাজারের টেকনাফ স্থল বন্দরের সীমানা প্রাচীরের শেষ প্রান্তে নাফ নদীর পাড়ে ওই ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে ৯টি এলজি, ৪২ রাউন্ড শর্টগানের তাজা কার্তুজ, ৩৩ রাউন্ড খোসা এবং ১ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।

নিহত ইয়াবা ডন সাইফুল টেকনাফ সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের শিলবনিয়াপাড়া গ্রামের ডা. হানিফের ছেলে। 

সাইফুল ইয়াবার কারণে দেশের সমালোচিত এবং প্রশাসনের মোস্ট ওয়ান্টেড আসামি। তার হাত ধরেই দেশে প্রথম ইয়াবার অনুপ্রবেশ ঘটে।

টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস বলেন, গত কয়েক দিন আগে ইয়াবার একটি বড় চালান ইঞ্জিন চালিত ট্রলারে মিয়ানমার হতে টেকনাফ সদর স্থল বন্দরের সীমানা প্রাচীরের শেষ প্রান্তে নাফ নদীর পাড়ে মজুদ করে। এসব তথ্য হেফাজতে থাকা সাইফুল  পুলিশকে দেয়। উক্ত তথ্যের ভিত্তিতে ইয়াবা উদ্ধারের জন্য ৩০ মে দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে উক্ত স্থানে পৌঁছলে সাইফুল করিমের সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে এসআই রাসেল আহমেদ, কনস্টেবল ইমাম হোসেন, সোলেমান আহত হয়। পরে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ ৫২ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করলে সাইফুল করিম আহত হয়। রাত দেড়টার দিকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করে।

ওসি জানান, সাইফুল করিম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সকল গোয়েন্দা সংস্থার তালিকার ইয়াবা গডফাদার এবং বাংলাদেশের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী।

তিনি আরো জানান, সাইফুল করিমের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানার এফ আই আর নং-১৫/৩৩৬, তারিখ- ৫ মে, ২০১৯; ঘটিকা ধারা- ১৯ (ধ)/১৯(ভ) ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন; টেকনাফ থানার এফ আই আর নং-১৫/৩৩৭, তারিখ- ৫ মে, ২০১৯;  ঘটিকা ধারা- ৩৬(১) এর ১০(গ)/৪১ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮; চট্টগ্রামের ডবলমুরিং মডেল থানার এফ আই আর নং-৫৬, তারিখ- ৩০ এপ্রিল, ২০১৯; ধারা- ৪ (২) ২০১২ সালের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন; তৎসহ ২৬ (২)/২৭ (১) ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইন; টেকনাফ থানার এফ আই আর নং-৪৩/৬৮২, তারিখ- ৯ নভেম্বর, ২০১৮;  ধারা- ১৯(১) এর ৯(খ)/২৫ ১৯৯০ সালের মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন; টেকনাফ থানার এফ আই আর নং-১০, তারিখ- ৩ মে ২০১৯ খ্রি. ধারা- ১৯ (অ)/১৯(ভ) ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইন ; টেকনাফ থানার এফ আই আর নং-১১, তারিখ- ৩ মে ২০১৯ খ্রি. ধারা- ২০১৮ সালের মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬ (১) এর ১০ (গ)/৪১; চট্টগ্রাম সিএমপি হালিশহর থানায় ১৩ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার মামলা নং- ১(৫)১৮, ধারা- ১৯৯০ সলের মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(১) এর ৯ (খ)/২৫/৩৩ (১) এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, টেকনাফে প্রথম দফায় ১০২ জন ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করার পর থেকে সাইফুল করিম আত্মসমর্পণের জন্য যোগাযোগ করেন। দ্বিতীয় দফায় আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে সাইফুল করিমেরও নাম ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবারের বন্দুকযুদ্ধে সাইফুলের মৃত্যুতে সে সুযোগ আর রইল না। আর এর মাধ্যমে দেশের এক ইয়াবা সম্রাটেরও পতন হলো।

দেশে ইয়াবা বিরোধী অভিযানের পর গা ঢাকা দেয় মোস্ট ওয়ান্টেড হাজি সাইফুল করিম। বিশেষ কৌশলে আশ্রয় নেয় সীমান্তবর্তী দেশ মিয়ানমারে। মাস খানেক সময় ধরে ওখানে বেশ নিরাপদে ছিল সরকারের মাদক কারবারির তালিকার শীর্ষ স্থানীয় এই ব্যক্তি। গত ২৫ মে তাকে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন থেকে কৌশলে দেশে আনা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাইফুল করিমের ইয়াবা ব্যবসার বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ছড়ানো ছিল টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত। ঘাটে ঘাটে মোটা অঙ্কের অর্থ দিতেন। বিনিময়ে তার ‘সেইফগার্ড’ হিসেবে কাজ করতেন সুবিধাভোগী প্রভাবশালীরা।

সাইফুল করিম মাত্র ৩৫ বছর বয়সেই ব্যবসা ক্ষেত্রে সফল হন। ২০১৭ সালে খেতাব পান ব্যবসায়িক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) পদবী।
মাত্র এক যুগের ব্যবধানে সিআইপি শিল্পপতি সাইফুল এখন শত কোটি টাকার মালিক। অল্প সময়ের মধ্যে তার এই ফুলে-ফেঁপে ওঠা আলাদিনের চেরাগের নাম ইয়াবা।

সূত্র জানায়, সাইফুলেরই রয়েছে নিজস্ব ইয়াবা সিন্ডিকেট। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএসসি) ও গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় দেশের সবচেয়ে বড় ইয়াবার ডিলার এই সাইফুল করিম।

জানা গেছে, কক্সবাজারের ব্যয়বহুল এলাকা কলাতলী পয়েন্টে হোটেলও নির্মাণ করেছেন তিনি। রয়েছে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় বিস্তৃত তার ব্যবসা। টেকনাফের বাসিন্দা হলেও বাস চট্টগ্রামে। ‘এস.কে. ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী তিনি। গার্মেন্ট, আমদানি-রপ্তানি, কার্গো ও জাহাজের ব্যবসা রয়েছে তার। চট্টগ্রাম শহরের কাজীর দেউড়ি ভিআইপি টাওয়ারে রয়েছে তার একাধিক অভিজাত অ্যাপার্টমেন্ট।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমারের মংডুর প্রস্তুতকারীদের কাছ থেকে দেশে সরাসরি ইয়াবার চালান নিয়ে আসা এবং চট্টগ্রামে নিয়ে পাচার করার শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে সাইফুলের। তাকে আন্তর্জাতিক ইয়াবা কারবারিও বলা হয়।
২০০৭ সালেও সাইফুল করিম স্বল্প বেতনে একটি আড়তে কাজ করতেন। সেই সাইফুল এখন অডেল সম্পদের মালিক। প্রতিষ্ঠা করেছেন এস কে জি গ্রুপ নামে কোম্পানি।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, নিহতের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে রয়েছে।     

পাঠকের মন্তব্য