বাংলাদেশে আইএস এর কোনও অস্তিত্ব নেই

সিটিটিসি ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলাম

সিটিটিসি ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলাম

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) গোড়াপত্তনের পর বিশ্ব মিডিয়ার কল্যাণে বাংলাদেশের মানুষের নজরে আসে এই জঙ্গি সংগঠনটির নাম ও কার্যক্রম। এই সংগঠনের সঙ্গে কোনও বাংলাদেশি জড়িত আছেন কি-না তারও কোনও প্রত্যক্ষ দালিলিক তথ্য প্রমাণ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এখন পর্যন্ত আসেনি। 

বাংলাদেশে আইএস এর উপস্থিতি রয়েছে— এমন খবরে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে দেশ ও সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও সাম্প্রতিক সময়ে বলেছেন, বাংলাদেশে আইএস-এর কোনও অস্তিত্ব নেই। 

গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর কলকাতা বিমানবন্দরে আইএস এর ৪ তরুণকে গ্রেফতার করে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। পুলিশের দাবি, ওই ৪ তরুণ বাংলাদেশে আসার পথে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত ৪ তরুণই ভারতের হায়দ্রাবাদের নাগরিক। এই খবর জানার পর থেকেই বাংলাদেশে আইএস এর খোঁজ পড়ে।

রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে এক আইএস সদস্যের নাগাল পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তার নাম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক সামিউন রহমান ওরফে ইবনে হামদান। ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সামিউনকে গ্রেফতারের পর পুলিশ তাকে আইএস এর সদস্য বলে দাবি করে। সেই থেকেই বাংলাদেশে আইএস এর উপস্থিতির কথা জানা যায়। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে কমপক্ষে ১৫ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। 

গ্রেফতারের পর এসব ব্যক্তিকে আইএস সদস্য বলে দাবি করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিফিং করেন গণমাধ্যমকে তথ্য দেয়া হয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এমন তথ্যের পর দেশজুড়ে আতঙ্ক শুরু হয়। বাড়ানো হয় নজরদারিসহ নানামুখী অভিযান। তারপর থেকে থেমে থাকেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। বরং একের পর এক আইএস সদস্য গ্রেফতারের পর সাধুবাদও পায় পুলিশ-র‌্যাব। 

দেশে আইএস সদস্য রয়েছে— এমন প্রশ্নের উত্তরে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম  (সিটিটিসি) ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে আইএস এর কোনও সদস্য নেই। যদি কেউ বলে থাকেন, সেটি সম্পূর্ণ ভুল তথ্য। এটা করছে এক শ্রেণির গুটি কয়েক সন্ত্রাসী ও বিকৃত রুচির মানুষ। 

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় ইতালিয়ান নাগরিক ও রংপুরে জাপানি নাগরিক খুনের ঘটনায় আইএস প্রসঙ্গ সামনে চলে আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়, বিদেশি খুনের সাথে আইএস জড়িত। যদিও ওয়েবসাইটটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ সাইটটির পরিচালক ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্ট বলে জানা গেছে।

অতীতে আইএস নিয়ে অতি উৎসাহী বক্তব্য দিলেও এবার পিছু হটেছে পুলিশ। উল্টো গণমাধ্যমের কাছে এখন পুলিশ দাবি করছে, ‘এ ধরনের কোনও বক্তব্য বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি তারা দেননি।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি-মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘‘আইএস সদস্য আটক করা হয়েছে, আমরা কখনোই এমন দাবি করিনি। আমরা বলেছি, আইএসের সদস্য সন্দেহে আটক করেছি। সদস্য সংগ্রহের সময় পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে।’’  

তিনি বলেন, আইএস এর সদস্য হতে হলে আগ্রহীকে সরাসরি সিরিয়ায় যেতে হবে এবং আইএসের প্রধানের বায়াত পেলেই সদস্য হতে পারবেন। একই দাবি করেছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এডিসি) ও জঙ্গি বিশ্লেষক মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, আমরা যাদের আগে আটক করেছি, তাদের আইএস সন্দেহে আটক করা হয়েছে। তাদের সরাসরি আইএস সদস্য দাবি করা হয়নি। ছানোয়ার হোসেন বলেন, তবে বাংলাদেশের অনেকেই আইএসকে সমর্থন করেন। সিরিয়ায় যাওয়ার চেষ্টাও করেছেন। এ ছাড়া তারা বিভিন্ন প্রচারণা চালিয়েছেন।

পুলিশের এই দুই কর্মকর্তা এমন দাবি করলেও, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের জনসংযোগ বিভাগ থেকে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে গ্রেফতার কয়েক যুবককে আইএস সদস্য বলেও দাবি করা হয়।

অপরাধ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দাবি, বাংলাদেশে আইএস এর কার্যক্রম না থাকলেও আইএসকে ঘিরে পুলিশ বিভিন্ন সময় যে অতি উৎসাহী বক্তব্য দিয়েছে তা জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। পুলিশ আইএস সন্দেহে আটক অব্যাহত রাখলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, দেশে আইএস এর অস্তিত্ব নেই। 

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘‘গত বছর ৩ অক্টোবরও আইএস সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ। পুলিশ বলছে, তারা আইএস এর সঙ্গে যুক্ত। আবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, দেশে আইএস এর কোনও অস্তিত্ব নেই। এতে তো আমি নিজেই বিভ্রান্ত। এটা নিশ্চয়ই বিভ্রান্ত করার মতো কথা।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘আমার কাছে মনে হয় না দেশে আইএস এর উত্থান হয়েছে। বাংলাদেশে ঘটনা ঘটিয়ে তাদের লাভটা কী? তাদের তো একটা প্যাটার্ন আছে। তারা ছোটো-খাটো সন্ত্রাসী সংগঠন নয়। তাদের সঙ্গে পুরো ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড যুদ্ধ করছে। তারা একটি স্টেটও বানিয়েছে। তাদের প্রায় ৪০ হাজার যোদ্ধা বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ করছে। তাহলে বাংলাদেশে দু’জনকে হত্যা করে তাদের লাভটা কী? এ ছাড়া এটা প্রচারও করা হচ্ছে না। আইএস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকলে, তাহলে তাদের নিজের ওয়েবসাইটেই প্রকাশ করতো। কিন্তু তারা তা করেনি।’’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের শিক্ষক জিয়া রহমান বলেন, ‘‘বাংলাদেশের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কেউই আইএস এর পক্ষ থেকে সবুজ সংকেত পায়নি।’’ তিনি বলেন, ‘‘কেউ যদি আইএস এর সদস্য হতে চায়, তাহলে তাকে আইএস প্রধান আবুবক্কর আল বাগদাদীর কাছে বায়াত (আনুগত্যের শপথ) নিতে হয়। আমার মনে হয় না, বাংলাদেশের কেউ বাগদাদীর কাছে বায়াত নিয়েছেন।’’

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যমে শাখার পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘বাংলাদেশে কখনওই আইএস সদস্য আটক করা হয়নি। যাদের আটক করা হয়েছে, তারা যোগদানের চেষ্টা করেছে। এ অপরাধে তাদের আটক করা হয়েছে। বাংলাদেশে আইএস এর কোনও অস্তিত্ব নেই। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, বাংলাদেশে আইএস-এর তৎপরতা নেই। আমিও তাদের সঙ্গে একমত। আসলে বাংলাদেশে আইএস এর কোনও অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়নি।’’

বাংলাদেশের জঙ্গি বিষয়ক গবেষক এবং মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, ‘‘বাংলাদেশে যে আইএস-এর তৎপরতা আছে, তা তথ্য রয়েছে। বাংলাদেশের পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থা গত ৪ বছরে আইএস সদস্য বলে অনেককে আটক করেছে। এছাড়া সংবাদমাধ্যমেও তারা এ সংক্রান্ত খবর, তথ্য প্রচার করেছে। এমনকি বাংলাদেশি নাগরিকদের সিরিয়ায় গিয়ে আইএস-এ যোগদানের তথ্যও আমরা জানি। সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে পুলিশের বক্তব্যসহ খবর প্রচার হয়েছে।’’

নূর খানের মতে, শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন, আইএসসহ জঙ্গি দমনে যেকোনও দেশেরই সহায়তা নিতে পারে বাংলাদেশ সরকার। তবে খেয়াল রাখতে হবে কেউ যেন এর সুযোগ নিতে না পারে।

পাঠকের মন্তব্য