বন্ধ হচ্ছে পোশাক উৎপাদনে অননুমোদিত সাব-কন্ট্রাক্টিং

দেশের তৈরি পোশাক শিল্প

দেশের তৈরি পোশাক শিল্প

দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে সাব-কন্ট্রাক্টিং ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার তাগিদে শিল্পটির জন্য ‘সাব-কন্ট্রাক্টিং গাইডলাইন-২০১৯’ চূড়ান্ত করেছে সরকার। এ নিয়ে এরই মধ্যে একটি প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নতুন এ নীতিমালা অনুযায়ী, রফতানিমুখী পোশাক খাতের কারখানাগুলোর জন্য অননুমোদিত সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের সুযোগ আর থাকছে না। সাব-কন্ট্রাক্টিং কার্যক্রমে যুক্ত হতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্য হতে হবে। পাশাপাশি সাব-কন্ট্রাক্টিং তদারকি বা নিয়ন্ত্রণে তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের এ দুই সংগঠনের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে নীতিমালায়।

আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনসে ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সংঘটিত এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মারা যান ১১২ শ্রমিক। ঘটনার পর জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি সাব-কন্ট্রাক্টের ভিত্তিতে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টের জন্য পোশাক তৈরি করত। ওই সময় সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের জন্য সমন্বিত ও স্বীকৃত কোনো দিকনির্দেশনা বা নীতিমালা ছিল না। ফলে সংশ্লিষ্ট ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে কারখানার কর্মপরিবেশ তদারকিরও কোনো সুযোগ ছিল না। তাজরীনের ঘটনার পরপরই ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে সরকার, মালিক ও শ্রমিকদের ত্রিপক্ষীয় জাতীয় কর্মপরিকল্পনার (ন্যাপ) আওতায় এ-সংক্রান্ত নীতিমালা বা গাইডলাইন তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। এ বিষয়ে খসড়া প্রস্তাব পাঠানোর জন্য বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও ইপিবিকে নির্দেশ দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর ছয় বছর পর সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের ভিত্তিতে শিল্পটির জন্য সাব-কন্ট্রাক্টিং গাইডলাইন-২০১৯ চূড়ান্ত করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

গাইডলাইনটি কার্যকর হওয়াসাপেক্ষে রফতানিমুখী পোশাক খাতের কারখানাগুলোর এখন থেকে অননুমোদিত সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের আর কোনো সুযোগ থাকছে না। পাশাপাশি সাব-কন্ট্রাক্টিং তদারকি বা নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতা বাড়ছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর। গত ২৭ মে প্রজ্ঞাপন আকারে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য এ সাব-কন্ট্রাক্টিং গাইডলাইনটি প্রকাশ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, দেশের তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের কল্যাণ, শ্রম অধিকার ও কারখানার নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষ গৃহীত ‘ন্যাশনাল ট্রাইপ্যাট্রাইট প্ল্যান অব অ্যাকশন অন ফায়ার সেফটি অ্যান্ড স্ট্রাকচারাল ইন্টেগ্রিটি ইন দ্য রেডিমেড গার্মেন্ট সেক্টর ইন বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের জন্য অন্যান্য উদ্যোগের পাশাপাশি বিদ্যমান সাব-কন্ট্রাক্টিং ব্যবস্থাকে অধিকতর স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করার লক্ষ্যে তৈরি পোশাক শিল্পের সাব-কন্ট্রাক্টিং গাইডলাইন-২০১৯ জারি করা হলো। অবিলম্বে এটি কার্যকর হবে।

গাইডলাইনটি অনুসরণের বাধ্যবাধকতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, পোশাকপণ্য নিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে ক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট কারখানার মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। গাইডলাইনটি অনুসরণ করা হলে এ বিরোধের জায়গা কমে আসবে। গাইডলাইনটি অনুসরণ করে কারখানাগুলোর কমপ্লায়েন্স মানদণ্ড রক্ষণাবেক্ষণে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর দায়িত্ব অনেক বেড়ে যাবে। সাব-কন্ট্রাক্টিং প্রক্রিয়াটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগও কমে আসবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব তপন কান্তি ঘোষ এ প্রসঙ্গে বলেন, গাইডলাইনটি সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটিও গঠিত হয়েছে। শিগগিরই কমিটি কাজ শুরু করবে। এ গাইডলাইনের ভিত্তিতে সাব-কন্ট্রাক্টিং প্রক্রিয়ায় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নজরদারিও বাড়বে।

সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের মাধ্যমে রফতানিযোগ্য পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে গাইডলাইনটি প্রযোজ্য হবে জানিয়ে এতে পাঁচটি বিধানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম বিধানে রয়েছে আটটি অংশ। এর মধ্যে প্রথম অংশে বলা হয়েছে, সাব-কন্ট্রাক্টিং প্রতিষ্ঠান বা কারখানাকে নির্ধারিত বিধিমালা অনুসরণ করে সংগঠনের সদস্য হতে হবে এবং সদস্যপদ নিয়মিত হালনাগাদ বা নবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, শুধু কমপ্লায়েন্স প্রতিপালনে সক্ষম কারখানা বা প্রতিষ্ঠানগুলোই সাব-কন্ট্রাক্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারবে।

প্রথম বিধানের তৃতীয় অংশে বলা হয়েছে, রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান কেবল সংশ্লিষ্ট সংগঠনের (বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ) নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সাব-কন্ট্রাক্ট চুক্তি করতে পারবে।

প্রসঙ্গত, দেশের তৈরি পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্যসংখ্যা ৬ হাজার ৮১০টি। এর মধ্যে সরাসরি রফতানি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সক্রিয় কারখানার সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৪০০। অন্যদিকে কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, এ দুই সংগঠনের সদস্য নয় কিন্তু রফতানির সঙ্গে সম্পৃক্ত, এমন কারখানার সংখ্যা প্রায় ৮০০ থেকে এক হাজার। এ কারখানাগুলোর সবক’টিই সাব-কন্ট্রাক্টিং পদ্ধতিতে কাজ করে। নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত এখন থেকে আর এসব কারখানার সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ে কাজ করার কোনো সুযোগ থাকছে না।

চতুর্থ অংশের ভাষ্য অনুযায়ী, সাব-কন্ট্রাক্টিং কার্যক্রমের জন্য একটি লিখিত চুক্তিপত্র থাকতে হবে, যা সংশ্লিষ্ট সংগঠনকে (বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ) পাঠাতে হবে। পঞ্চম অংশে কারখানা ভবনের স্থাপত্য নকশা বা লে-আউট পরিকল্পনা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনুমোদিত হতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রথম বিধানের ষষ্ঠ অংশটি মজুরি-সংক্রান্ত। এতে বলা হয়েছে, সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ে কাজ পাওয়া কারখানায় নিয়োজিত শ্রমিকদের সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি দিতে হবে। বীমা-সংক্রান্ত সপ্তম অংশে সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ে কাজ পাওয়া কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী গ্রুপ বীমার আওতায় আনতে হবে এবং নিয়মিতভাবে প্রিমিয়াম পরিশোধ করে বীমা হালনাগাদ রাখতে হবে।

ক্রেতার কাছ থেকে সরাসরি রফতানি আদেশ পাওয়া কারখানার সঙ্গে সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ে কাজ পাওয়া কারখানার বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে প্রথম বিধানের অষ্টম বা শেষ অংশে। এ অংশে বলা হয়েছে, যদি কোনো বিরোধ দেখা দেয়, তাহলে তা মীমাংসার জন্য যেকোনো পক্ষ সংগঠনের আরবিট্রেশন কমিটিতে আবেদন করলে প্রচলিত আরবিট্রেশন বিধি অনুসরণ করে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। সেক্ষেত্রে বিরোধ অবশ্যই চার মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।

গাইডলাইনের দ্বিতীয় বিধানে তৈরি পোশাক কারখানার সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ে সরকারি তদারকি বা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রতি ছয় মাস পরপর সাব-কন্ট্রাক্টিং প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সম্পর্কিত প্রতিবেদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বস্ত্র সেল ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পাঠাতে হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত বা যুগ্ম সচিবের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের বিষয় পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করা হবে।

তৃতীয় বিধানে বলা হয়েছে, সাব-কন্ট্রাক্টর কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে কমপ্লায়েন্স প্রতিপালনের বিষয়ে রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান নজর রাখবে। কোনো অনিয়ম হলে সঙ্গে সঙ্গে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সাব-কন্ট্রাক্টিং প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনকে অবহিত করতে হবে।

গাইডলাইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটানো হলে দেশের আইন, বিধি ও নির্বাহী আদেশবলে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংগঠন অভিযুক্ত কারখানার উৎপাদন বা রফতানি কাজে প্রদত্ত সেবা সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে পারবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে চতুর্থ বিধানে।

সর্বশেষ বা পঞ্চম বিধানে বলা হয়েছে, সরকার চাইলে যেকোনো সময় গাইডলাইনটি পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন বা বিয়োজন করতে পারবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, গাইডলাইনটিকে আমরা স্বাগত জানাই, কারণ এরই মধ্যে আমরা ডিআইএফইর নির্দেশনা মেনে কারখানা সংস্কারে যাদের অগ্রগতি ৩০ শতাংশের কম, তাদের ইউডি সেবা অব্যাহত রাখা বন্ধ করেছি। গাইডলাইনটি পরিষ্কার হলেও এটি তাত্ক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা জটিল হতে পারে। কারণ ত্রিপক্ষীয় জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (ন্যাপ) এখনো পর্যালোচনাধীন।

পাঠকের মন্তব্য